অপর এক যুদ্ধ: গাজার আড়ালে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি আগ্রাসনের নীরব দহন

সমগ্র বিশ্ব যখন গাজার ধ্বংসস্তূপ আর লাশের মিছিলে স্তম্ভিত, যখন মানবতার আর্তনাদ আর বারুদের গন্ধে আকাশ বাতাস ভারী—ঠিক সেই মুহূর্তেই লোকচক্ষুর অন্তরালে, সংবাদের শিরোনামহীন এক গভীর অন্ধকারের অতল গহ্বরে ফিলিস্তিনের বুকে চলছে ভিন্ন এক যুদ্ধ। এ যুদ্ধ কেবল কামানের গোলার নয়, এ এক ধীরলয় অথচ নিশ্চিত অস্তিত্ব বিনাশের আয়োজন। অধিকৃত পশ্চিম তীরে (West Bank) জায়নবাদী ইসরায়েল তার পূর্ণ সামরিক শক্তি এবং ঔপনিবেশিক হিংস্রতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, যার একমাত্র লক্ষ্য—ফিলিস্তিনিদের জীবনকে প্রতিটি মুহূর্তে শ্বাসরুদ্ধকর করে তোলা।

রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, "যেথায় থাকে সবার অধম দীনের হতে দীন, সেইখানে যে চরণ তোমার রাজে"—আজ ফিলিস্তিনের প্রতিটি ধূলিকণায় সেই লাঞ্ছিত মানবতার কান্না মিশে আছে। কিন্তু এই কান্নার ধ্বনি বিশ্ববিবেকের দুয়ারে পৌঁছায় না। গাজার যুদ্ধের আড়ালে পশ্চিম তীরে যে নীরব কসাইখানা তৈরি হয়েছে, তা আজ আমাদের ঈমানী চেতনার সামনে এক বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অদৃশ্য যুদ্ধের মানচিত্র: অপারেশন এবং প্রতারণা

আমেরিকা যখন যুদ্ধবিরতির নামে বিশ্বমঞ্চে নাটকীয় অভিনয়ে ব্যস্ত, গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনকে দীর্ঘায়িত করার নীল নকশা বুনছে, ঠিক তখনই পশ্চিম তীরে চলছে এক ভয়াবহ সমান্তরাল যুদ্ধ। বিগত দুই বছরে, তথাকথিত "সন্ত্রাসবাদ দমন"-এর ধুয়া তুলে ইসরায়েল তাদের আগ্রাসনের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা একে নাম দিয়েছে "কাউন্টার ইনসার্জেন্সি অপারেশন" বা বিদ্রোহ দমনের অভিযান।

কিন্তু ভাষার এই মারপ্যাঁচ মূলত সত্যকে ধামাচাপা দেওয়ার এক নিপুণ কৌশল মাত্র। কাজী নজরুল ইসলাম যেমন বলেছিলেন, "মিথ্যা শুনিনি ভাই, এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই"—অথচ আজ সেই মানুষের হৃদয় ও বসতভিটা গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে মিথ্যে অজুহাতে। 'অপারেশন আয়রন ওয়াল', 'অপারেশন সামার ক্যাম্পস' কিংবা 'অপারেশন ফাইভ স্টোনস'—নামগুলো শুনলে মনে হতে পারে এগুলো হয়তো সাময়িক কোনো সামরিক পদক্ষেপ। কিন্তু বাস্তবে এগুলো হলো ফিলিস্তিনি জনপদকে জনশূন্য করার এক দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন জালিমদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন:

وَقَدْ مَكَرُوا مَكْرَهُمْ وَعِنْدَ اللَّهِ مَكْرُهُمْ وَإِنْ كَانَ مَكْرُهُمْ لِتَزُولَ مِنْهُ الْجِبَالُ

(সূরা ইব্রাহিম, আয়াত: ৪৬)

অনুবাদ: তারা তাদের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল, কিন্তু তাদের ষড়যন্ত্র আল্লাহর জানা ছিল, যদিও তাদের ষড়যন্ত্র এমন ছিল যা পাহাড়কেও টলিয়ে দিতে পারত।

হেবরন (আল-খলিল), জেনিন বা তুলকারেম—কোথাও আজ আর শান্তি নেই। এই অভিযানগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ২৫০৬ সালের (প্রতিবেদনের সময়কাল অনুযায়ী) শুরু থেকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী পশ্চিম তীরে যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, তা ১৯৬৭ সালের পর ফিলিস্তিনিদের জন্য সবচেয়ে বড় বাস্তুচ্যুতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় ৫০,০০০ ফিলিস্তিনিকে তাদের পৈত্রিক ভিটা থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। জেনিন ও তুলকারেমের শরণার্থী শিবিরগুলোকে তারা ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে, যেন সেখানে কোনোদিন কোনো প্রাণের স্পন্দন ছিল না।

ভীতির অবকাঠামো ও রূহানি বিনাশ

ইসরায়েলের এই যুদ্ধের কৌশল কেবল সামরিক বিজয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ—একটি 'সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার'। তারা চায় এমন এক পরিবেশ তৈরি করতে, যেখানে ফিলিস্তিনিদের মনে প্রতিরোধের বা 'মুকাওয়ামা'-র কোনো চিন্তাও যেন স্থান না পায়। তাদের লক্ষ্য হলো পশ্চিম তীরের ভৌগোলিক ও সামাজিক কাঠামোকে এমনভাবে বদলে ফেলা, যাতে সেখানে কোনো স্বাধীন সত্তার বিকাশ অসম্ভব হয়ে পড়ে।

রাস্তাঘাট, জনবসতি এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে তারা নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারে পরিণত করেছে। গত জানুয়ারিতে পশ্চিম তীরের প্রধান সড়কগুলোতে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা (Settlers) বিশাল সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দিয়েছিল। তাতে বড় বড় হরফে লেখা ছিল: "ফিলিস্তিনে কোনো ভবিষ্যৎ নেই"। এটি কেবল একটি বাক্য নয়, এটি ছিল ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্বের প্রতি এক সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা।

কিন্তু মুমিনের বিশ্বাস তো পাথরের চেয়েও শক্ত। আল্লাহ তায়ালা বলেন:

وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنْتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ

(সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ১৩৯)

অনুবাদ: তোমরা হীনবল হইও না এবং চিন্তিতও হইও না; তোমরাই বিজয়ী হবে, যদি তোমরা মুমিন হও।

প্রতি সপ্তাহে গড়ে নয়জন ফিলিস্তিনি শহীদ হচ্ছেন, ৮৮ জন আহত হচ্ছেন, এবং ১৮০ জন কারাগারে নিক্ষিপ্ত হচ্ছেন। ফিল্ড ইন্টারোগেশনের নামে ডজন ডজন মানুষকে অমানুষিক নির্যাতন করা হচ্ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বসতি স্থাপনকারীদের তান্ডব। সপ্তাহে গড়ে ১০০টি সেটলার অ্যাটাক বা বসতি স্থাপনকারীদের হামলা, ৩০০টি সামরিক অভিযান এবং ১০টি ফিলিস্তিনি ঘরবাড়ি মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া—এটাই এখন পশ্চিম তীরের 'স্বাভাবিক' চিত্র।

একটি খণ্ডিত জাতি ও লুণ্ঠিত সম্পদ

এক ঘণ্টা দূরত্বের পথ পাড়ি দিতে এখন ফিলিস্তিনিদের সময় লাগে তিন থেকে চার ঘণ্টা। চেকপয়েন্ট আর ব্যারিকেডের বেড়াজালে তাদের জীবন আজ স্থবির। এটি কেবল সময়ের অপচয় নয়, এটি একটি জাতিকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার সুগভীর চক্রান্ত। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এখন কেবল মানুষই হত্যা করছে না, তারা নেমেছে প্রকাশ্য লুটপাটে। মানি এক্সচেঞ্জ বা মুদ্রা বিনিময় কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালিয়ে তারা স্বর্ণ ও রৌপ্য লুট করছে। এটি কোনো সাধারণ চুরি নয়, এটি একটি জাতির অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার প্রক্রিয়া, যাতে তারা আর কোনোদিন উঠে দাঁড়াতে না পারে।

রবীন্দ্রনাথের সেই অমোঘ বাণী আজ বড় বেশি প্রাসঙ্গিক: "অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে।" ইসরায়েলি এই লুণ্ঠন ও নিপীড়নের মুখে বিশ্ববিবেকের এই নীরবতা অন্যায়েরই নামান্তর।

একটি বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড মানেই একটি বিচ্ছিন্ন জাতি। পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি শহরগুলো ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে। ইসরায়েলি ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রযন্ত্রের বিশাল উদরে হারিয়ে যাচ্ছে ফিলিস্তিনের মানচিত্র। একে একে গ্রাস করা হচ্ছে তাদের জমি, পানি ও মর্যাদা।

ইসলামি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: আদল ও ইনসাফের লড়াই

এই সংঘাতকে কেবল রাজনৈতিক বা জাতিগত সংঘাত হিসেবে দেখা ভুল হবে। এটি হকের সাথে বাতিলের, ন্যায়ের সাথে অন্যায়ের, এবং মজলুমের সাথে জালিমের চিরন্তন লড়াই। ইসলামী বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গিতে (Worldview), কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ওপর আগ্রাসন কেবল মাটির দখল নয়, বরং তা আল্লাহর জমিনে 'ফাসাদ' বা বিপর্যয় সৃষ্টির শামিল।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন:

وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ قَالُوا إِنَّمَا نَحْنُ مُصْلِحُونَ ۝ أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ الْمُفْسِدُونَ وَلَكِنْ لَا يَشْعُرُونَ

(সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১১-১২)

অনুবাদ: আর যখন তাদেরকে বলা হয়, 'পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না', তারা বলে, 'আমরা তো কেবল শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী।' সাবধান! তারাই বিপর্যয় সৃষ্টিকারী, কিন্তু তারা তা অনুধাবন করে না।

ইসরায়েল তাদের এই আগ্রাসনকে 'নিরাপত্তা' বা 'সন্ত্রাস দমন' বলে যতই বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করুক না কেন, আল্লাহর কিতাবের আলোকে তারা সুস্পষ্ট 'মুফসিদুন' বা বিপর্যয় সৃষ্টিকারী। পশ্চিম তীরে তারা যা করছে, তা ইনসাফ বা ন্যায়বিচারের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ইসলামে 'আদল' (Justice) বা ন্যায়বিচার হলো সমাজের ভিত্তি। যেখানে ইনসাফ নেই, সেখানে শান্তি থাকতে পারে না।

কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বিদ্রোহী সত্তা দিয়ে আমাদের শিখিয়েছেন, জুলুমের বিরুদ্ধে মাথা নত করা মুমিনের কাজ নয়। তিনি লিখেছিলেন, "লাথি মার, ভাঙরে তালা! যত সব বন্দী-শালায়-আগুন জ্বালা, আগুন জ্বালা!" আজ পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিরা সেই আগুনের পরশমণি বুকে ধারণ করে টিকে আছে। তাদের এই প্রতিরোধ বা 'মুকাওয়ামা' কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের জন্য নয়, বরং এটি তাদের ঈমানী দায়িত্ব। কারণ, জুলুম মেনে নেওয়াও এক প্রকার কুফরি।

উপসংহার: অন্ধকারের শেষে ভোরের প্রত্যাশা

গাজার যুদ্ধের ডামাডোলে পশ্চিম তীরের এই 'নীরব যুদ্ধ' হয়তো শিরোনাম হচ্ছে না, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় এই জুলুমের প্রতিটি মুহূর্ত লেখা থাকছে। ফিলিস্তিনিদের এই রক্ত, এই অশ্রু, আর এই দীর্ঘশ্বাস বৃথা যেতে পারে না। নজরুল-রবীন্দ্র চেতনার মেলবন্ধনে আমরা বলতে পারি—রাত্রি যত গভীর হয়, প্রভাত তত সন্নিকটে আসে।

আজকের এই কঠিন সময়ে, আমাদের দায়িত্ব কেবল সংবাদ পাঠ করা নয়, বরং মজলুমের পক্ষে দাঁড়ানো। আমাদের দোয়ায়, আমাদের লেখনীতে এবং আমাদের চেতনায় ফিলিস্তিনের মুক্তি সংগ্রামকে বাঁচিয়ে রাখা। কারণ, আল্লাহ জালিমকে ছাড় দেন, কিন্তু ছেড়ে দেন না।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের ফিলিস্তিনি ভাই-বোনদের ওপর তাঁর বিশেষ রহমত ও সাহায্য (নাসর) বর্ষণ করুন এবং তাদের পদযুগলকে সত্যের পথে অবিচল রাখুন। আমীন।

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter