প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের কাছে ১২৫ বছরের ঐতিহাসিক মসজিদ উচ্ছেদের মুখে: বিদ্যুৎ-পানি বিচ্ছিন্ন, ছয় দিনের নোটিস

১৯৭৭ সালের দিল্লি গেজেটে ওয়াক্‌ফ সম্পত্তি হিসেবে নথিভুক্ত এবং NDMC-র ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রেস কোর্স মসজিদকে ছয় দিনের মধ্যে খালি করার নির্দেশ। প্রশাসনের দাবি, মসজিদটি সরকারি জমিতে অবস্থিত।

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবনের কাছে অবস্থিত প্রায় ১২৫ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক রেস কোর্স মসজিদকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ভূমি ও উন্নয়ন দপ্তর (Land and Development Office বা L&DO) মসজিদ প্রাঙ্গণকে অননুমোদিত বলে উল্লেখ করে ছয় দিনের মধ্যে জায়গাটি খালি করার নোটিস দিয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। মসজিদের ইমামের অভিযোগ, সেখানে বিদ্যুৎ ও জলের সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। ফলে মসজিদটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে

১৯৭৭ সালের গেজেটে ওয়াক্‌ফ সম্পত্তি হিসেবে নথিভুক্ত

রেস কোর্স মসজিদটির ঐতিহাসিক গুরুত্বের পাশাপাশি এর আইনি পরিচয়ও বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। মসজিদ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এবং মুসলিম সংগঠনগুলি দাবি করছে, ১৯৭৭ সালের দিল্লি গেজেটে মসজিদটি ওয়াক্‌ফ সম্পত্তি হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি, এটি নয়াদিল্লি মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিলের (NDMC) ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার তালিকাতেও অন্তর্ভুক্ত বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, L&DO-র বক্তব্য অনুযায়ী, মসজিদটি সরকারি জমিতে অবস্থিত এবং সেই কারণেই প্রাঙ্গণ খালি করার নোটিস জারি করা হয়েছে। ফলে মূল বিরোধটি দাঁড়িয়েছে জমির আইনি অবস্থান, ওয়াক্‌ফ হিসেবে স্বীকৃতি এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে মসজিদটির সুরক্ষা নিয়ে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠছে: কোনও স্থাপনা সরকারি জমিতে অবস্থিত বলে দাবি করা হলে, তার ওয়াক্‌ফ-সংক্রান্ত নথি এবং ঐতিহ্যগত স্বীকৃতির বিষয়গুলি কীভাবে বিবেচনা করা হবে? এই প্রশ্নের নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট নথি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিস্তারিত পর্যালোচনা জরুরি।

রেস কোর্স থেকে লোক কল্যাণ মার্গ—নাম বদলেছে, বদলায়নি মসজিদের পরিচয়

মসজিদটির নামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দিল্লির রাজনৈতিক ইতিহাসও। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন সংলগ্ন এলাকার পুরোনো নাম ছিল রেস কোর্স রোড। পরে সেই রাস্তার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় লোক কল্যাণ মার্গ। তবে ঐতিহাসিক মসজিদটি আজও রেস কোর্স মসজিদ নামেই পরিচিত।

প্রদত্ত ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৮৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী এই এলাকায় বসবাস শুরু করেন। ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের পর নিরাপত্তাজনিত কারণেই নতুন বাসভবনে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তী সময়ে একাধিক প্রধানমন্ত্রী এই সরকারি বাসভবনে থেকেছেন।

১৯৯০ সালের ৩০ মে এই স্থানকে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন হিসেবে ঘোষণা করে গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয় বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। ভি. পি. সিং, চন্দ্রশেখর, পি. ভি. নরসিংহ রাও, অটলবিহারী বাজপেয়ী, এইচ. ডি. দেবগৌড়া, আই. কে. গুজরাল এবং মনমোহন সিংয়ের মতো প্রধানমন্ত্রীদের সঙ্গে এই এলাকার ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে।

তবে এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা মসজিদটির বর্তমান জমি-সংক্রান্ত বিরোধের আইনি সমাধান করে না। বরং এলাকাটির দীর্ঘ ইতিহাস এবং মসজিদের ঐতিহ্যগত পরিচয় সংরক্ষণের প্রশ্নটিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।

বিদ্যুৎ-পানি বিচ্ছিন্ন, নামাজ আদায়ে অসুবিধার অভিযোগ

মসজিদের ইমাম মোহাম্মদ হারুনের অভিযোগ, কর্তৃপক্ষ বিদ্যুৎ ও জলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে এবং মসজিদের প্রবেশপথগুলিও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে মুসল্লিদের নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে অসুবিধা তৈরি হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

মসজিদের প্রতিনিধিদের বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে সেখানে নিয়মিত নামাজ আদায় হয়ে আসছে। মসজিদটি যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে এবং বিদ্যুৎ ও জলের বিলও নিয়মিত পরিশোধ করা হয়েছে বলে তাঁদের দাবি।

তবে পরিষেবার বিল পরিশোধের বিষয়টি নিজে থেকেই জমির মালিকানা বা স্থাপনার আইনি বৈধতা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করে না। একইভাবে, সরকারি জমি-সংক্রান্ত দাবি থাকলেও মসজিদের ঐতিহাসিক মর্যাদা এবং ওয়াক্‌ফ-সংক্রান্ত নথি উপেক্ষা করা উচিত কি না, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন।

ছয় দিনের নোটিস ঘিরে উচ্ছেদের আশঙ্কা

মসজিদের ইমামের বক্তব্য অনুযায়ী, ছয় দিনের মধ্যে প্রাঙ্গণ খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই সময়সীমার কারণে মসজিদটি ভেঙে ফেলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আম আদমি পার্টির নেতা ও দিল্লি ওয়াক্‌ফ বোর্ডের প্রাক্তন চেয়ারম্যান আমানতুল্লাহ খানও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

২০ অক্টোবর প্রকাশিত The New Indian Express-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমানতুল্লাহ খান মসজিদটি ভেঙে ফেলার সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। এদিকে, জমিয়ত উলামা-ই-হিন্দের একটি প্রতিনিধি দল কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজুর সঙ্গে দেখা করে মসজিদ এবং সংলগ্ন কবরস্থান রক্ষার জন্য হস্তক্ষেপের আবেদন জানিয়েছে। 

প্রতিনিধি দলটি মসজিদটির ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছে। মসজিদটির আইনি অবস্থান নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত উচ্ছেদ বা ধ্বংসের মতো পদক্ষেপ স্থগিত রাখার আবেদনও জানানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও আইনি অধিকার—দুইয়েরই গুরুত্ব

রেস কোর্স মসজিদকে ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে। একটি ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থাপনার জমি নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে তার নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে কোন নথিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে? ওয়াক্‌ফ হিসেবে গেজেটভুক্ত হওয়া এবং ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির আইনি তাৎপর্য কী? আর সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলিকে তাঁদের বক্তব্য ও নথি পেশ করার যথেষ্ট সুযোগ দেওয়া হয়েছে কি?

এই প্রশ্নগুলির উত্তর দিতে হলে সরকারি জমির রেকর্ড, ১৯৭৭ সালের গেজেট বিজ্ঞপ্তি, NDMC-র ঐতিহ্য তালিকা এবং উচ্ছেদের নোটিস—সবকিছুই বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

মসজিদটি যদি সত্যিই ঐতিহাসিক ওয়াক্‌ফ সম্পত্তি হিসেবে নথিভুক্ত হয়ে থাকে, তবে সেই স্বীকৃতির আইনি প্রভাব কী, তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে স্পষ্ট হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে, জমি নিয়ে সরকারের দাবি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অধিকার—দুই দিকই প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী বিবেচনা করা উচিত।

উপসংহার

দিল্লির রেস কোর্স মসজিদকে ঘিরে বিতর্ক কেবল একটি জমি খালি করার নোটিসের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস, ধর্মীয় উপাসনার অধিকার, ওয়াক্‌ফ সম্পত্তির আইনি পরিচয় এবং ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সংরক্ষণের প্রশ্ন।

একদিকে প্রশাসন মসজিদটিকে সরকারি জমিতে অবস্থিত অননুমোদিত স্থাপনা বলে দাবি করছে; অন্যদিকে মসজিদ-সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলি ১৯৭৭ সালের গেজেট এবং ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি তুলে ধরছে। এই বিরোধের নিষ্পত্তি হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট নথির স্বচ্ছ পর্যালোচনা, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া এবং সব পক্ষের বক্তব্য বিবেচনার মাধ্যমে।

প্রায় ১২৫ বছরের পুরোনো একটি ঐতিহাসিক মসজিদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের আগে তার ইতিহাস, নথিপত্র এবং আইনি অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্টতা নিশ্চিত করা জরুরি।

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter