জান্নাতের সর্দারনী, বিশ্বনারীর নেত্রী সাইয়্যিদা ফাতিমার পর্দা এবং আজকের মুসলিম নারীরা
ঐতিহাসিক বর্ণনানুসারে, ইসলামের পুণ্যময় সূচনার প্রায় পাঁচ বছর পূর্বে মহান মর্যাদাশালী উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদিজা (রাযিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা)-এর পবিত্র গর্ভ থেকে নবুওয়তের জ্যোতির্ময় গৃহে সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম)-এর সর্বাধিক স্নেহধন্য কন্যা, দুই জাহানের রাজকুমারী হযরত ফাতিমা (রাযিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা)-এর শুভ জন্ম লাভ করেন। তাঁর এই ধরাধামে আগমন কেবল একটি সাধারণ পারিবারিক আনন্দোৎসব ছিল না; বরং তা ছিল সমগ্র মানবতার জন্য এক ঐশী রহমত এবং ইসলামের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এক আলোকোজ্জ্বল অধ্যায়ের পুণ্যময় সূচনা।
পুণ্যময় নাম ‘ফাতিমা’-এর অন্তর্নিহিত রূহানিয়াত
তাঁর সম্মানিত ও বরকতময় নাম রাখা হয় “ফাতিমা”। এই নামটি নিছক কোনো সাধারণ নাম নয়; বরং এর গহীনে লুকিয়ে আছে এক গভীর আধ্যাত্মিক মহিমা, ঐশী তাৎপর্য এবং স্রষ্টার প্রদত্ত বিশেষ সম্মান। ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, “ফাতিমা” শব্দটি আরবি “ফাতম” (فطم) মূলধাতু থেকে উদ্ভূত হয়েছে, যার আভিধানিক অর্থ হলো ‘বিচ্ছিন্ন করা’, ‘দূরে সরিয়ে দেওয়া’ বা ‘আলাদা করে রাখা’।
এই নামকরণের নেপথ্যে এক সুমহান প্রজ্ঞা ও ঐশী প্রতিশ্রুতি নিহিত রয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁর অশেষ রহমতে হযরত ফাতিমা (রাযি.)-কে, তাঁর সম্মানিত ও পবিত্র বংশধরদের এবং যারা তাঁর প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা ও গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করে—তাদের সকলকে জাহান্নামের লেলিহান আগুন থেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখবেন বলে এক অভূতপূর্ব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এই অনন্যসাধারণ ও বিশেষ মর্যাদার কারণেই তাঁর নাম নির্ধারণ করা হয়েছে “ফাতিমা”। অর্থাৎ, তিনি হলেন সেই মহীয়সী ও পুণ্যবতী ব্যক্তিত্ব, যাঁর সঙ্গে আধ্যাত্মিক সম্পর্ক, অকৃত্রিম ভালোবাসা ও আনুগত্য একজন মুমিনকে পরকালীন কঠিন শাস্তি থেকে চিরমুক্তির সুনিশ্চিত আশ্বাস প্রদান করে। তাঁর নামের পবিত্র অক্ষরের মাঝেই যেন লুকিয়ে আছে মুক্তি, সতীত্ব এবং আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের এক সুমধুর বার্তা।
এই নামের সুগভীর তাৎপর্য সম্পর্কে স্বয়ং নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম) উম্মাহর সামনে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন:
إنما سميت فاطمة لأن الله فطمها ومحبيها عن النار
অনুবাদ: তিনি ইরশাদ করেছেন যে, ফাতিমা নাম রাখার মূল কারণ হলো—আল্লাহ তাআলা স্বয়ং তাঁকে এবং যারা তাঁকে অন্তর থেকে ভালোবাসে, তাদের সকলকে জাহান্নামের আগুন থেকে চিরমুক্তি দান করবেন।
এই সুসংবাদবাহী বাণীটি প্রখ্যাত হাদিসগ্রন্থ “কানযুল উম্মাল”-এ (খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ৫০, হাদিস নং ৩৪২২২) অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। এই বিবরণ থেকে দ্ব্যর্থহীনভাবে বোঝা যায় যে, হযরত ফাতিমা (রাযি.) শুধু নবীজির আদরের কন্যাই ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন পবিত্রতা, অটুট ঈমান, সুগভীর তাকওয়া ও আল্লাহভীতির এক প্রোজ্জ্বল প্রতীক এবং তাঁর সমগ্র জীবন ছিল আদর্শ নারীজীবনের সর্বোত্তম ও নিখুঁত নমুনা।
মাহশরের ময়দানে অকল্পনীয় মর্যাদা ও ঐশী সম্মান
দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনে তিনি ছিলেন পর্দা, বিনম্রতা ও নিষ্কলুষ চরিত্রের এক উৎকৃষ্ট আদর্শ। তাঁর পবিত্র জীবন ছিল নফসের উপর আত্মসংযম, কঠোর আল্লাহভীতি এবং রবের ইবাদতে পরিপূর্ণ এক জীবন্ত কাব্য। তিনি সর্বদা নিজেকে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে সংরক্ষিত ও আবৃত রেখেছেন।
ইমাম হাকিম নিশাপুরি (রহ.) তাঁর বিশ্ববিখ্যাত হাদিসগ্রন্থ 'আল-মুস্তাদরাক আলাস সহীহাইন' (المستدرك على الصحيحين)-এ অত্যন্ত সহীহ সনদের মাধ্যমে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন, যেখানে নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন:
يَا مَعْشَرَ الْخَلَائِقِ غُضُّوا أَبْصَارَكُمْ حَتَّى تَمُرَّ فَاطِمَةُ بِنْتُ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
অনুবাদ: কিয়ামতের দিন একজন ফেরেশতা বা ঘোষক উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করবেন— “হে মাহশরের ময়দানের লোকসকল! তোমরা তোমাদের দৃষ্টি অবনত করো, যতক্ষণ না মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কন্যা ফাতিমা এই পথ অতিক্রম করেন।”
এই ঐশী ঘোষণাটি কোনো সাধারণ পার্থিব সম্মান নয়; বরং এটি এক মহান ও সতী নারীর লজ্জাশীলতা, পবিত্রতা ও সুউচ্চ মর্যাদার পরম স্বীকৃতি। এই দুনিয়ার অত্যন্ত সামান্য ও নশ্বর জীবনে যে মহীয়সী নারী কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এত কঠোরভাবে পর্দা অবলম্বন করেছেন, আখিরাতের অনন্ত জীবনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁকে এমন অভাবনীয় সম্মান দান করবেন যে, সমগ্র মানবসমাজকে তাঁর সম্মানে মাথা ও দৃষ্টি নত করতে বলা হবে। যখন তিনি সেই ভয়াবহ দিনে পুলসিরাত অতিক্রম করবেন, তখন মাহশরের সেই সুবিশাল সমাবেশে তাঁর সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার্থে এই বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হবে। নিসন্দেহে, এটি তাঁর জন্য দয়াময় আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অতুলনীয় ও শ্রেষ্ঠ পুরস্কার।
একই গ্রন্থের অপর একটি স্থানে (হাদিস নং ৪৭২৮) উল্লেখ আছে যে, কিয়ামতের দিন এক ঘোষক পর্দার আড়াল থেকে ঘোষণা করবেন— “হে মাহশরের লোকেরা! তোমরা তোমাদের দৃষ্টি নত করো, যাতে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কন্যা ফাতিমা পর্দাসহ অতিক্রম করতে পারেন।” এটি অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, যিনি দুনিয়ায় নিজের লজ্জাশীলতা ও পর্দা রক্ষায় এত বেশি সচেষ্ট ছিলেন, আখিরাতে আল্লাহ তাঁকে এমন অনন্য সম্মান দান করবেন যা সমগ্র মানবজাতির সামনে তাঁর মর্যাদাকে আরও সহস্রগুণ উজ্জ্বল করে তুলবে।
সমকালীন মুসলিম নারী ও পর্দার অবক্ষয়
বাংলায় একটি প্রবাদ রয়েছে, "চকচক করলেই সোনা হয় না"। বর্তমান যুগে আমরা অত্যন্ত বেদনার সাথে দেখতে পাচ্ছি যে, মুসলমান সমাজ নানা দিক থেকে চরম অবক্ষয় ও দুর্বলতার সম্মুখীন হচ্ছে। এই নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অবক্ষয়ের পেছনে বহুবিধ কারণ বিদ্যমান থাকলেও, নারীদের মাঝে ইসলামী পর্দা ও লজ্জাশীলতার চর্চা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়াও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
দুঃখজনকভাবে, অনেক ক্ষেত্রে খোদ ইসলামী সমাজের ভেতরেই আজ মুসলিম নারীদের মাঝে 'হায়া' (লজ্জাশীলতা) ও পর্দার চিরায়ত সংস্কৃতি ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে। পর্দা বা বোরকার নাম হয়তো ব্যবহার করা হচ্ছে, কিন্তু কখনও এমন ধরনের পোশাক পরা হচ্ছে যা প্রকৃতপক্ষে শালীনতার পরিবর্তে শারীরিক আকর্ষণ ও প্রদর্শনকেই সমাজে বাড়িয়ে তোলে। এর অনিবার্য ফলে পোশাকের একটি বাহ্যিক রূপ বজায় থাকলেও তার যে মূল ও অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য, তা সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হয়ে যায়।
আজকের এই ভোগবাদী সমাজে বহু মুসলিম নারী আদর্শ হিসেবে এমনসব ব্যক্তিত্বদের গ্রহণ করছেন, যারা ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের পরিবর্তে সম্পূর্ণ পাশ্চাত্য বা তথাকথিত স্বাধীনচেতা সংস্কৃতিকে অন্ধভাবে অনুসরণ করেন। অথচ একজন সত্যিকারের মুসলিম নারীর আদর্শ হওয়া উচিত এমন এক মহীয়সী ব্যক্তিত্ব, যিনি এই ধোঁকার দুনিয়ায় বসবাস করেও সর্বদা আখিরাতের অনন্ত জীবনের চিন্তা করেছেন। যিনি মহান আল্লাহর প্রতিটি বিধানকে জীবনের প্রতিটি স্তরে ও ক্ষেত্রে নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করেছেন; যাঁর কাছে রবের ইবাদত ছিল নিজের প্রাণের চেয়েও অধিক প্রিয়; এবং যিনি লজ্জাশীলতা ও আত্মমর্যাদায় ছিলেন সর্বদাই অনন্য ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এই সমস্ত মহৎ গুণাবলির পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন আমরা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখতে পাই হযরত ফাতিমাতুয্যাহরা (রাযিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা)-এর জ্যোতির্ময় জীবনে।
নারীর সর্বোত্তম অলংকার: লজ্জাশীলতা ও সতীত্ব
হযরত ফাতিমা (রাযি.)-এর জীবন আমাদের সামনে এক মুসলিম নারীর প্রকৃত ও নির্ভুল আদর্শচিত্র তুলে ধরে—কীভাবে অটল ঈমান, নিরবচ্ছিন্ন ইবাদত, সুমহান চরিত্র, কঠোর পর্দা ও সংসারের যাবতীয় পারিবারিক দায়িত্ব একসাথে অত্যন্ত সুন্দরভাবে ধারণ করা যায়। তিনি শুধু একজন আদর্শ কন্যা নন, একজন উত্তম স্ত্রী নন, একজন মমতাময়ী মা নন—তিনি ছিলেন তাকওয়া (আল্লাহভীতি) ও পবিত্রতার এক জীবন্ত ও ভাস্বর দৃষ্টান্ত। তাঁর অন্তরের পর্দানিষ্ঠা ও লজ্জাশীলতার একটি ঘটনা আমাদের জন্য অত্যন্ত শিক্ষণীয়। একবার রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে স্নেহভরে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে আমার কন্যা, একজন নারীর জন্য সর্বোত্তম গুণ কী?” উত্তরে তিনি অত্যন্ত প্রজ্ঞার সাথে বললেন:
خَيْرٌ لِلْمَرْأَةِ أَنْ لَا تَرَى رَجُلًا وَلَا يَرَاهَا رَجُلٌ
“নারীর সর্বোচ্চ গুণ হলো—সে যেন কোনো পরপুরুষকে না দেখে এবং কোনো পরপুরুষও যেন তাকে না দেখে।”
এই অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত উত্তরের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে এক সুগভীর দর্শন ও তাৎপর্য। এখানে শুধু চোখের বা দৃষ্টির সংযমের কথা বলা হয়নি, বরং সার্বিক শালীনতা, নফসের আত্মরক্ষা ও চারিত্রিক দৃঢ়তার এক বিশাল শিক্ষা নিহিত আছে। প্রখ্যাত আলেম ও কবি ইমাম আহমদ রযা খান (রহ.) তাঁর এক বিখ্যাত ও কালজয়ী কবিতায় ফাতিমা (রাযি.)-এর এই পবিত্রতাকে স্মরণ করে ইরশাদ করেন—
جس کا آنچل نہ دیکھا مہ و مہر نے
اس ردائے نزاہت پہ لاکھوں سلام
“যাঁর ওড়না চাঁদ-সূর্যও কখনও দেখেনি,
সেই পবিত্রতার চাদরের ওপর লাখো সালাম।”
এই অমর কবিতার মাধ্যমে তিনি হযরত ফাতিমা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর অনুপম পর্দানিষ্ঠা, সীমাহীন লজ্জাশীলতা ও পবিত্রতার সর্বোচ্চ মর্যাদাকে সাহিত্যের ভাষায় তুলে ধরেছেন। এখানে “চাঁদ-সূর্যও দেখেনি” কথাটি আক্ষরিক বা বাস্তব অর্থে ব্যবহৃত হয়নি; বরং এটি সাহিত্যের একটি গভীর ও সুনিপুণ রূপক। অর্থাৎ তাঁর যাপিত জীবন ছিল এমন নিশ্ছিদ্র পর্দাবেষ্টিত, এমন লজ্জাশীল ও সুরক্ষিত যে, পৃথিবীর আলোও যেন তাঁর পবিত্রতার সীমানাকে অতিক্রম করতে পারেনি। এটি তাঁর চরিত্রের স্ফটিকস্বচ্ছতা, আত্মসম্মান এবং গভীর আল্লাহভীতির এক উজ্জ্বল প্রতীক। “রিদায়ে নাযাহাত” অর্থাৎ পবিত্রতার চাদর—এই অপরূপ শব্দচয়নের মাধ্যমে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, তাঁর পর্দা কেবল বাহ্যিক কোনো পোশাক ছিল না; বরং তা ছিল অন্তরের অকৃত্রিম পবিত্রতা, চিন্তার স্বচ্ছতা এবং চরিত্রের নির্মলতার এক নিখাদ প্রতিফলন। তাই তাঁর সেই পবিত্র ওড়নার ওপর “লাখো সালাম” জানানো মানে মূলত তাঁর সুমহান জীবনাদর্শকে বিনম্র শ্রদ্ধা ও সম্মান জানানো।
আরেক স্থানে ইমাম আহমদ রযা খান (রহ.) বুকভরা গভীর ভালোবাসায় বলেন—
اُس بتولِ جگر پارۂ مصطفٰی
حُجلہ آرائے عفّت پہ لاکھوں سلام
“মুস্তফার কলিজার টুকরা সেই বাতূল,
পবিত্রতার শোভিত কক্ষে তাঁর প্রতি লাখো সালাম।”
এখানে ব্যবহৃত “বাতূল” শব্দের অর্থ হলো এমন এক পবিত্রা নারী, যিনি নিজেকে দুনিয়ার সমস্ত পঙ্কিলতা ও অপবিত্রতা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও পবিত্র রাখেন। “জিগর-পারা-এ-মুস্তফা” অর্থাৎ প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হৃদয়ের টুকরা—এই অনন্য উপাধি তাঁর প্রতি নবীজির অগাধ ও গভীর স্নেহ এবং তাঁর সুউচ্চ মর্যাদারই প্রকাশ। আর “হুজলা আরায়ে ইফ্ফত” দ্বারা অত্যন্ত চমৎকারভাবে বোঝানো হয়েছে যে, তাঁর লজ্জাশীলতা ও সতীত্ব এমন এক উচ্চতায় ছিল, যেন পবিত্রতার আসর স্বয়ং তাঁর দ্বারা সুশোভিত হয়েছে।
ইন্তেকালের প্রাক্কালে পর্দার ভাবনা: এক অনন্য দৃষ্টান্ত
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ইন্তেকালের পর জান্নাতের সর্দারনী, হযরত সাইয়্যিদা ফাতিমাতুয্যাহরা (রাযিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা)-এর কোমল হৃদয়ে প্রিয় নবীর বিচ্ছেদের শোক এতটাই গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল যে, তাঁর পবিত্র ঠোঁটের হাসি চিরতরে প্রায় বিলীন হয়ে যায়। পিতার প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা ছিল সীমাহীন; তাই নবীজির ইন্তেকালের পর তাঁর জীবনের সমস্ত আনন্দ যেন নিভে যায়। ইতিহাসে বর্ণিত আছে যে, নবীজির ওফাতের মাত্র ছয় মাস পর, ১১ হিজরির ৩ রমজান, মঙ্গলবার রাতে তিনি এই নশ্বর ইহলোক ত্যাগ করেন। তাঁর বিরহী অন্তরে ছিল কেবল প্রিয় পিতার সঙ্গে পুনর্মিলনের এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা; তাই মৃত্যুকে তিনি কোনো ভয়ের বস্তু হিসেবে নয়, বরং পরম সাক্ষাতের এক মধুর আহ্বান হিসেবেই গ্রহণ করেছিলেন।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইন্তেকালের পূর্বে শোকাহত জীবনে তাঁকে মাত্র একবারই হাসতে দেখা যায় এবং এই ঘটনার পেছনেও লুকিয়ে রয়েছে তাঁর লজ্জাশীলতা ও পর্দানিষ্ঠার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি অত্যন্ত চিন্তিত ছিলেন—কারণ সারা জীবন তিনি অত্যন্ত যত্নের সাথে নিজেকে পরপুরুষের দৃষ্টি থেকে আড়াল করে রেখেছেন; কিন্তু মৃত্যুর পর যখন তাঁর জানাজা কাঁধে বহন করা হবে, তখন তাঁর কাফনঢাকা দেহের বাহ্যিক অবয়ব যেন কোনোক্রমেই কারও নজরে না পড়ে। এই গভীর ভাবনা তাঁর অন্তরের পরিশুদ্ধ পবিত্রতা ও 'হায়া'র গভীরতার এক অকাট্য প্রমাণ বহন করে। এমনকি তাঁর ইন্তেকালের পরও যেন তাঁর পর্দা সর্বোচ্চভাবে রক্ষা পায়—এই বিষয়ে তিনি যে গভীর চিন্তা প্রকাশ করেছিলেন, তা তাঁর চরিত্রের সূক্ষ্মতা ও আত্মসম্মানের এক উজ্জ্বলতম প্রমাণ।
এই উৎকণ্ঠার সময় হযরত আসমা বিনতে উমাইস (রাযিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা)—যিনি হযরত আবু বকর (রাযি.)-এর স্ত্রী ছিলেন—একটি চমৎকার সমাধান প্রস্তাব করেন। তিনি ফাতিমা (রাযি.)-কে বলেন, হাবশায় (বর্তমান আবিসিনিয়া) তিনি দেখেছেন যে, জানাজার ওপর গাছের ডাল বেঁধে এক ধরনের ডোলির মতো কাঠামো তৈরি করা হয় এবং তার ওপর একটি বড় কাপড় টেনে দেওয়া হয়, যাতে মৃতদেহের গঠন বা অবয়ব বাইরে থেকে একেবারেই বোঝা না যায়। এরপর তিনি নিজে উদ্যোগী হয়ে খেজুর গাছের ডাল এনে তা দিয়ে একটি সুন্দর কাঠামো তৈরি করে কাপড় দিয়ে ঢেকে হযরত ফাতিমা (রাযি.)-কে দেখান। নিজের পর্দার এই চমৎকার ব্যবস্থা দেখে তিনি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন এবং দীর্ঘ এক শোকাবহ সময় পর তাঁর পবিত্র মুখে এক চিলতে স্বস্তির হাসি ফুটে ওঠে। পরবর্তীতে তাঁর জানাজা ঠিক সেই পদ্ধতিতেই আচ্ছাদিত করে অত্যন্ত মর্যাদার সাথে বহন করা হয়। এই শিক্ষণীয় ঘটনাটি প্রখ্যাত গ্রন্থ “জযবুল কুলুব” (অনূদিত সংস্করণ, পৃষ্ঠা ২৩১)-এ সবিস্তারে উল্লেখ রয়েছে।
ইবাদতের রূহানিয়াত ও মাতৃসত্তা
হযরত সাইয়্যিদা ফাতিমা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর পবিত্র জীবন ছিল সর্বদা মহান আল্লাহর স্মরণে পরিপূর্ণ। তাঁর জীবনের প্রতিটি ক্ষুদ্র মুহূর্ত—ঘরের প্রাত্যহিক কাজ, সন্তানদের লালন-পালন, স্বামীর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য, পারিবারিক দায়িত্ব—সবকিছুর মধ্যেই মিশে ছিল ইবাদতের এক ঐশী রং। তিনি শুধু প্রচলিত নামাজ-রোজাতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং প্রতিনিয়ত আল্লাহর জিকির, কুরআন তিলাওয়াত, তাসবীহ ও তাহলিলে তাঁর রূহ মগ্ন থাকত। দুনিয়ার শত কাজ তাঁর আল্লাহস্মরণে কখনোই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি; বরং তাঁর হাতের প্রতিটি কাজই যেন ইবাদতের রূপ নিত।
তাঁর ইবাদতের প্রতি এই তীব্র আগ্রহ ও একাগ্রতার একটি অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী ঘটনা প্রখ্যাত সাহাবী হযরত সালমান ফারসি (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, একবার নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নির্দেশে তিনি হযরত ফাতিমা (রাযি.)-এর খিদমতে উপস্থিত হন। সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন, শিশু ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে আছেন, আর স্নেহময়ী মাতা তাঁদেরকে পাখা করে বাতাস দিচ্ছেন। একই সঙ্গে তাঁর পবিত্র জিহ্বায় অবিরাম ধারায় কুরআনের তিলাওয়াত অব্যাহত রয়েছে। এই ঐশ্বরিক দৃশ্য দেখে হযরত সালমান ফারসি (রাযি.)-এর অন্তর কোমল হয়ে যায় এবং আবেগে তাঁর চোখে অশ্রু নেমে আসে। (উৎস: সফীনা-এ-নূহ, দ্বিতীয় অংশ, পৃষ্ঠা ৩৫) ।
রাতজাগরণে ইবাদতকারী সাইয়্যিদা ফাতিমা (রাযিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা) সম্পর্কে তাঁরই প্রিয় সন্তান হযরত ইমাম হাসান (রাযিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু) বর্ণনা করেন—তিনি তাঁর সম্মানিত মাতাকে বহুবার দেখেছেন যে, তিনি ঘরের নির্দিষ্ট নামাজের স্থানে (মিহরাবে) একাগ্রচিত্তে সারারাত নামাজে দাঁড়িয়ে থাকতেন, এমনকি এভাবেই রবের প্রেমে ভোর হয়ে যেত। (উৎস: মাদারিজুন নবুওয়াহ, অনূদিত সংস্করণ) । এই বর্ণনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার কথা নয়; এটি তাঁর ইবাদতপ্রিয় হৃদয়ের সুগভীরতার অকৃত্রিম পরিচয় বহন করে। যখন চারপাশ ঘোর নিস্তব্ধ, পৃথিবীর মানুষ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন তিনি তাঁর মহান আল্লাহর দরবারে দাঁড়িয়ে কান্না, বিনম্র দোয়া ও তিলাওয়াতে পুরো রাত কাটিয়ে দিতেন। তাঁর কাছে রজনী ছিল দয়াময় আল্লাহর সঙ্গে নিবিড় ও একান্ত সম্পর্ক গড়ার এক বিশেষ সময়।
তিনি তাহাজ্জুদের জায়নামাজে দাঁড়িয়ে শুধু নিজের জন্যই নয়, অন্যদের জন্যও দুহাত তুলে দোয়া করতেন—উম্মতের সার্বিক কল্যাণ, মুসলমানদের মঙ্গল এবং আত্মীয়স্বজনের হিদায়াতের জন্য অশ্রুসিক্ত হয়ে প্রার্থনা করতেন। রাতের তাহাজ্জুদ নামাজ ইসলামে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ এক নফল ইবাদত; এটি ফরজ নয়, কিন্তু যারা আল্লাহর বিশেষ নৈকট্য কামনা করেন, তাদের জন্য এটি একটি শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। হযরত ফাতিমা (রাযি.)-এর জীবন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় যে, দুনিয়ার সমস্ত দায়িত্ব নিখুঁতভাবে পালন করেও আল্লাহর সঙ্গে সুগভীর আধ্যাত্মিক সম্পর্ক বজায় রাখা পুরোপুরি সম্ভব। দিনের বেলা তিনি ছিলেন একজন আদর্শ গৃহিণী ও অত্যন্ত স্নেহময়ী মা; আর রাতের বেলা জায়নামাজে তিনি হয়ে উঠতেন এক নিবেদিত ইবাদতগুজার বান্দি।
বাংলায় একটি চমৎকার প্রবাদ রয়েছে, "বৃক্ষ তোমার নাম কী, ফলে পরিচয়।" সন্তানেরা সর্বদা মায়ের আমল ও চরিত্র থেকেই গভীর প্রেরণা পায়—ইমাম হাসান (রাযি.) নিজেই তাঁর মায়ের গভীর ইবাদতের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন। সুবহানাল্লাহ! কত সুন্দর একটি ফার্সি কবিতায় এই সত্যটি প্রতিধ্বনিত হয়েছে—
چو زھرا باش از مخلوق رو پوش
کہ در آغوشِ شبیرے بہ بینی
“ফাতিমার মতো হও, সৃষ্টিজগত থেকে নিজেকে আড়াল করো,
তাহলে তোমার কোলে শাব্বীরের মতো সন্তানকে দেখতে পাবে।”
এখানে “শাব্বীর” বলতে বোঝানো হয়েছে কারবালার ময়দানের মহানায়ক হযরত ইমাম হুসাইন (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে, যিনি ছিলেন সাহস, অটল সত্যনিষ্ঠা ও চরম আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল ও ভাস্বর প্রতীক। কবির মূল বক্তব্য হলো—যদি কোনো নারী হযরত সাইয়্যিদা ফাতিমাতুয্যাহরা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর মতো তাকওয়াবান, পর্দানিষ্ঠ ও লজ্জাশীলা হতে পারেন, তবে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর কোলেও ইমাম হুসাইন (রাযি.)-এর মতো নেককার, বীর ও মর্যাদাবান সন্তান দান করতে পারেন। অর্থাৎ একজন মায়ের চরিত্র, তাঁর ঈমান ও দৈনন্দিন জীবনাচার একটি সন্তানের সুন্দর গঠনে অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, একজন মায়ের অন্তরের পবিত্রতা, ইবাদতের প্রতি তাঁর ভালোবাসা, আল্লাহভীতি ও নৈতিক দৃঢ়তা সন্তানের ব্যক্তিত্ব নির্মাণে সবচেয়ে মৌলিক ভূমিকা রাখে। হযরত ফাতিমা (রাযি.)-এর জীবন ছিল এমনই এক পবিত্র ও কালজয়ী আদর্শ, যার পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন আমরা তাঁর সন্তানদের জীবনে—বিশেষ করে ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর মহৎ চরিত্রে দেখতে পাই।
উপসংহার ও শিক্ষণীয় দিকসমূহ
হযরত সাইয়্যিদা ফাতিমা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর এই মুবারক ও নূরানি জীবন থেকে আমরা আমাদের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনের জন্য বহু মূল্যবান শিক্ষা লাভ করি। তিনি ছিলেন—
* ইবাদতে নিবেদিত প্রাণ: রবের স্মরণে সর্বদাই সজীব।
* দুনিয়ার চাকচিক্যের প্রতি অনাসক্ত: আখিরাতমুখী এক প্রশান্ত আত্মা।
* স্বামীর প্রতি অনুগত ও সহানুভূতিশীলা: দাম্পত্য জীবনের শ্রেষ্ঠ আদর্শ।
* সন্তানদের উত্তম আদর্শে গড়ে তোলায় সচেষ্ট: এক সফল ও মমতাময়ী মা।
* লজ্জাশীলতা ও পর্দানিষ্ঠায় অনন্য: সর্বোপরি সতীত্বের এক অনবদ্য শিখর।
তাঁর পবিত্র জীবনের একটি অত্যন্ত বিশেষ ও অনুকরণীয় দিক হলো—এই নশ্বর দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার পরও তাঁর প্রধান চিন্তা ছিল তাঁর পর্দা ও সতীত্ব রক্ষা। এটি নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে, হায়া ও শালীনতা তাঁর জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল, এটি কেবল কোনো প্রথাগত সামাজিক রীতি ছিল না। তাঁর কাছে পর্দা ছিল মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি প্রধান মাধ্যম এবং এক নারীর আত্মমর্যাদার শ্রেষ্ঠ প্রতীক। হযরত ফাতিমা (রাযি.)-এর এই জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ইসলামী সমাজের প্রকৃত শক্তি কেবল বাহ্যিক জৌলুস বা উন্নতিতে নয়; বরং তা পরিবার, চরিত্র ও নৈতিকতার এক দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত।
যদি আজকের মুসলিম নারীরা তাঁর এই সুমহান জীবনাদর্শকে সামনে রেখে নিজেদের জীবন ও চরিত্র গড়ে তোলেন, তবে আমাদের সমাজে আবারও শালীনতা, পবিত্রতা ও নৈতিকতার এক স্নিগ্ধ সুবাতাস প্রবাহিত হবে। হযরত সাইয়্যিদা ফাতিমা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর সীরাত আমাদের এই অমোঘ শিক্ষাই দেয় যে, একজন মুমিন নারীর জীবন কেবল বাহ্যিক শালীনতায় আবদ্ধ নয়; বরং তা অন্তরের ইবাদত, রাতের নিভৃত কান্না এবং আল্লাহর প্রতি এক সুগভীর ভালোবাসায় পরিপূর্ণ হওয়া উচিত।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সমাজের সমস্ত মুসলিম নারীদের জান্নাতের সর্দারনী, বিশ্বনারীর নেত্রী হযরত ফাতিমা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর পবিত্র আদর্শ পরিপূর্ণরূপে অনুসরণ করে জীবন যাপন করার তাওফিক দান করুন। আমীন, ইয়া রব্বাল আলামীন।