ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের প্রেক্ষাপটে কাদিমি মসজিদ: ইসলামের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, ধর্মীয় অধিকার ও সমকালীন বিতর্ক
ভূমিকা
ভারত এমন একটি দেশ, যার সভ্যতা, সংস্কৃতি ও সামাজিক কাঠামো বহু ধর্ম, ভাষা এবং ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ, খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের সহাবস্থান ভারতীয় সমাজকে একটি বহুত্ববাদী পরিচয় দিয়েছে। এই বহুত্ববাদ কেবল সামাজিক বাস্তবতা নয়; এটি ভারতের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক আদর্শেরও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কিন্তু যখন কোনো ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থাপনা রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে অপসারণের মুখোমুখি হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে, উন্নয়ন, ধর্মীয় স্বাধীনতা, ঐতিহাসিক ঐতিহ্য এবং ধর্মনিরপেক্ষতার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে?
২০২৬ সালের ৩ নভেম্বর প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, দিল্লির কৃষি ভবন প্রাঙ্গণে অবস্থিত শতাব্দীপ্রাচীন কাদিমি মসজিদ (Qadeemi Masjid) অপসারণের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার দিল্লি হাইকোর্টে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে। সরকারের বক্তব্য, কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক ভবন সরকারি কাজের জন্য নির্ধারিত ধর্মনিরপেক্ষ স্থান। সেখানে স্থায়ী ধর্মীয় স্থাপনা রাখা সরকারি সম্পত্তির ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। অন্যদিকে, মসজিদ পরিচালনাকারী কমিটির দাবি, মসজিদটি বর্তমান সরকারি ভবনগুলোর নির্মাণের আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং দীর্ঘদিন ধরে সরকারি কর্মচারী ও আশপাশের মানুষের নামাজ আদায়ের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
এই ঘটনা শুধু একটি মসজিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক নয়; বরং এটি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা, ইসলামের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
কাদিমি মসজিদের ঐতিহাসিক পরিচয়
দিল্লির কৃষি ভবন প্রাঙ্গণে অবস্থিত কাদিমি মসজিদকে ঘিরে বর্তমান বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর ঐতিহাসিক অস্তিত্ব। 'কাদিমি' শব্দটি আরবি-উর্দু ভাষাগত ঐতিহ্যে প্রাচীন বা পুরোনো অর্থ প্রকাশ করে। মসজিদ পরিচালনাকারী কমিটির দাবি অনুযায়ী, মসজিদটি একশ বছরেরও বেশি পুরোনো এবং স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময় থেকেই সেখানে বিদ্যমান।
ঐতিহাসিক তথ্যের মধ্যে ১৯৪০ সালের ৮ নভেম্বরের একটি চুক্তি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, তৎকালীন প্রশাসন এবং জামা মসজিদ পরিচালনাকারী কমিটির মধ্যে ওই চুক্তির মাধ্যমে জায়গাটি মসজিদ হিসেবে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তবে সরকার মনে করে, এই অনুমতি জমির মালিকানা প্রদান করেনি।
অন্যদিকে, মসজিদ পরিচালনাকারী কমিটি আদালতে জানিয়েছে যে মসজিদটির অস্তিত্ব ১৯৪৫ সালের ঐতিহাসিক নথিতেও পাওয়া যায়। দিল্লি ওয়াক্ফ বোর্ড ১৯৭০ সালে প্রকাশিত দিল্লি প্রশাসনের গেজেটে এটিকে ওয়াক্ফ সম্পত্তির তালিকাভুক্ত করে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কৃষি ভবন নির্মিত হয়েছিল ১৯৫৭ সালে। অর্থাৎ, ১৯৪০ সালের চুক্তির তথ্য সঠিক হলে মসজিদটির ব্যবহার বর্তমান কৃষি ভবনের অস্তিত্বের আগের। পরবর্তী সময়ে সরকারি প্রশাসনিক ভবন নির্মিত হওয়ার ফলে মসজিদটি বৃহত্তর সরকারি কমপ্লেক্সের মধ্যে অবস্থান করতে শুরু করে। এই ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে সাহায্য করে: কোনো স্থাপনার বর্তমান অবস্থান দিয়ে তার সম্পূর্ণ অতীত বিচার করা যায় না। একটি ঐতিহাসিক স্থাপনার উৎপত্তি, প্রশাসনিক অনুমতি, সামাজিক ব্যবহার এবং আইনগত অবস্থান, সবকিছু বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ইসলামে মসজিদের ধর্মীয় ও সামাজিক গুরুত্ব
ইসলামে মসজিদ কেবল নামাজ আদায়ের স্থান নয়; এটি আধ্যাত্মিক শিক্ষা, সামাজিক ঐক্য, নৈতিক উন্নয়ন এবং মানবিক মূল্যবোধের কেন্দ্র।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে:
"وَأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا"
অর্থ: নিশ্চয়ই মসজিদসমূহ আল্লাহর জন্য; অতএব আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে ডেকো না।
, সূরা আল-জিন, আয়াত ১৮।
এই আয়াত মসজিদের মৌলিক ধর্মীয় পরিচয় ও একত্ববাদের শিক্ষা তুলে ধরে। একজন মুসলমানের কাছে মসজিদ ইবাদতের পবিত্র স্থান। এখানে মানুষ সামাজিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সামর্থ্য কিংবা জাতিগত পরিচয়ের পার্থক্য ভুলে একই কাতারে দাঁড়ায়।
ইসলামের ইতিহাসে মসজিদ সামাজিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় মসজিদে নববী প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এমন একটি কেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে ইবাদতের পাশাপাশি শিক্ষা, পরামর্শ, সামাজিক সহযোগিতা এবং জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালিত হতো।
সুতরাং, কোনো মসজিদের গুরুত্ব কেবল তার স্থাপত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি, দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্পর্ক এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা স্মৃতিও জড়িত থাকে।
তবে ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, ধর্মীয় পবিত্রতার পাশাপাশি ন্যায়বিচার, আমানতদারি, শান্তি এবং অন্যের অধিকার রক্ষাও অপরিহার্য। তাই মসজিদ সংরক্ষণের দাবি যেমন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত, তেমনি অন্যের অধিকার ও আইনগত বাস্তবতাকেও সম্মান করা প্রয়োজন।
ইসলামের দৃষ্টিতে ধর্মীয় সহাবস্থান ও ন্যায়বিচার
ইসলাম ধর্মীয় সহাবস্থান এবং ন্যায়বিচারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআনের সূরা আল-মায়িদার ৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:
"اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى"
অর্থ: তোমরা ন্যায়বিচার করো; এটিই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।
এই শিক্ষা থেকে বোঝা যায়, ন্যায়বিচার কেবল নিজের সম্প্রদায়ের জন্য নয়; বরং প্রত্যেক মানুষের প্রতি সমানভাবে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
সূরা আল-বাকারার ২৫৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ধর্মের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই। এই নীতি মানুষের বিবেক, বিশ্বাস ও ধর্মীয় স্বাধীনতার গুরুত্ব প্রকাশ করে।
ভারতের মতো বহুধর্মীয় রাষ্ট্রে এই শিক্ষার সামাজিক তাৎপর্য রয়েছে। মুসলমানদের ধর্মীয় অধিকার যেমন সম্মানিত হওয়া প্রয়োজন, তেমনি অন্যান্য ধর্মের মানুষের অধিকারও সমানভাবে রক্ষা করতে হবে।
অতএব, কাদিমি মসজিদকে কেন্দ্র করে আলোচনার ক্ষেত্রে কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো ইসলামের ন্যায়বিচার ও মানবিকতার শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং প্রয়োজন শান্তিপূর্ণ আলোচনা, ঐতিহাসিক তথ্যের যাচাই এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা।
ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সংবিধানের দৃষ্টিভঙ্গি
ভারতের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করেছে। সংবিধানের প্রস্তাবনায় ভারতকে একটি সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
এখানে ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ হলো রাষ্ট্র কোনো একটি ধর্মকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে না এবং নাগরিকদের ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য করবে না।
সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রত্যেক ব্যক্তিকে বিবেকের স্বাধীনতা এবং ধর্ম পালন, প্রচার ও অনুসরণের অধিকার দিয়েছে। তবে এই অধিকার জনশৃঙ্খলা, নৈতিকতা, স্বাস্থ্য এবং সংবিধানের অন্যান্য বিধানের অধীন।
২৬ নম্বর অনুচ্ছেদ ধর্মীয় সম্প্রদায়কে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অধিকার প্রদান করে, নির্দিষ্ট সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা সাপেক্ষে।
অন্যদিকে, ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদ আইনের দৃষ্টিতে সমতার নিশ্চয়তা দেয়।
কাদিমি মসজিদ সংক্রান্ত বিতর্কে এই সাংবিধানিক বিধানগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে কেন্দ্রীয় সরকার জমির মালিকানা এবং প্রশাসনিক উন্নয়ন প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে। অন্যদিকে মসজিদ পরিচালনাকারী কমিটি ধর্মীয় স্বাধীনতা, ঐতিহাসিক অস্তিত্ব এবং বিকল্প নামাজের জায়গার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।
এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য বোঝা জরুরি: ধর্ম পালনের অধিকার থাকা মানেই কোনো নির্দিষ্ট সরকারি জমিতে চিরস্থায়ীভাবে উপাসনালয় রাখার নিঃশর্ত অধিকার থাকা নয়। আবার জমির মালিকানা সরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকলেই ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় দাবিগুলো বিবেচনা না করে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত, এমন কথাও বলা যায় না।
সুতরাং, এই বিষয়ে আইন, ইতিহাস এবং জনস্বার্থের মধ্যে ন্যায়সংগত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য এবং বর্তমান পরিস্থিতি
২০২৬ সালের নভেম্বর মাসে কাদিমি মসজিদ নিয়ে বিতর্ক নতুন মাত্রা লাভ করে। কেন্দ্রীয় সরকার দিল্লি হাইকোর্টে জানায় যে কৃষি ভবন এবং কেন্দ্রীয় সচিবালয় সরকারি প্রশাসনিক কার্যক্রমের জন্য নির্ধারিত স্থান। সেখানে স্থায়ী ধর্মীয় স্থাপনা রাখা সরকারি সম্পত্তির ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
সরকারের আরও বক্তব্য, কাদিমি মসজিদটি কেন্দ্রীয় ভিস্তা পুনর্নির্মাণ প্রকল্পের অধীনে নির্মিতব্য Common Central Secretariat-এর ৪ ও ৫ নম্বর ভবনের নির্ধারিত স্থানে অবস্থিত। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মসজিদটি অপসারণ প্রয়োজন।
কেন্দ্রীয় সরকারের মতে, ১৯৪০ সালের চুক্তিতে মসজিদ পরিচালনাকারী কমিটিকে কেবল নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে জায়গা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল; জমির মালিকানা দেওয়া হয়নি। সরকার আরও জানিয়েছে, ইন্ডিয়া গেটের কাছে অবস্থিত শাহী মসজিদ জাবতা গঞ্জে বিকল্পভাবে নামাজ আদায়ের সুযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, মসজিদ পরিচালনাকারী কমিটির দাবি, মসজিদটি বহু দশক ধরে কৃষি ভবন এবং আশপাশের সরকারি দপ্তরের কর্মচারীদের নামাজ আদায়ের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তাদের আবেদন হলো, সম্ভব হলে মসজিদটি সংরক্ষণ করা হোক। যদি প্রকল্পের কারণে সেটি বাস্তবিকভাবে সম্ভব না হয়, তাহলে কাছাকাছি উপযুক্ত ও পর্যাপ্ত বিকল্প নামাজের জায়গার ব্যবস্থা করা হোক।
২ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে দিল্লি হাইকোর্টে বিষয়টি নিয়ে শুনানির সময় বিচারপতি অনীশ দয়াল সরকারের আইনজীবীর কাছে জানতে চান, সরকারি কমপ্লেক্সে কোনো সম্প্রদায়ের জন্য প্রার্থনার স্থান রাখার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম রয়েছে কি না। আদালত এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান আরও পরিষ্কার করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরবর্তী শুনানির দিন নির্ধারিত হয়েছে ২৩ নভেম্বর ২০২৬।
এখানে মনে রাখতে হবে, সরকারের বক্তব্য আদালতের চূড়ান্ত রায় নয়। মসজিদ অপসারণের বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া তখনও চলমান ছিল। তাই আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে বিষয়টিকে সম্পূর্ণ নিষ্পত্তি হয়ে গেছে বলে উপস্থাপন করা সঠিক হবে না।
উন্নয়ন বনাম ঐতিহাসিক ঐতিহ্য: ভারসাম্যের প্রয়োজন
আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনায় উন্নয়ন অপরিহার্য। নতুন প্রশাসনিক ভবন, উন্নত অবকাঠামো এবং নাগরিক পরিষেবা দেশের অগ্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু উন্নয়ন কেবল নতুন ভবন নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার ঐতিহাসিক স্মৃতি, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকারও সম্মানিত হয়।
ঐতিহাসিক স্থাপনা একটি জাতির অতীতের সাক্ষী। এগুলোর সঙ্গে মানুষের সামাজিক স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয় জড়িয়ে থাকে। তাই কোনো পুরোনো ধর্মীয় স্থাপনার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের আগে তার বয়স, ঐতিহাসিক গুরুত্ব, আইনগত অবস্থান এবং সামাজিক ভূমিকা যথাযথভাবে পরীক্ষা করা উচিত।
কাদিমি মসজিদের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রথমত, ১৯৪০ সালের চুক্তি এবং ১৯৭০ সালের ওয়াক্ফ গেজেটের আইনগত প্রভাব পরিষ্কারভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, মসজিদটির ঐতিহাসিক অস্তিত্ব ও স্থাপত্যগত গুরুত্ব সম্পর্কে নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ মতামত নেওয়া যেতে পারে।
তৃতীয়ত, উন্নয়ন প্রকল্পের বিকল্প পরিকল্পনা সম্ভব কি না, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
চতুর্থত, যদি অপসারণ অনিবার্য বলে আদালত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মনে করেন, তাহলে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও বাস্তব প্রয়োজন বিবেচনায় বিকল্প নামাজের জায়গার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
এই পদক্ষেপগুলো শুধু মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য নয়; বরং ভারতের বহুত্ববাদী ঐতিহ্য ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
মুসলিম সমাজের দায়িত্ব: জ্ঞান, সংযম ও সাংবিধানিক সচেতনতা
কাদিমি মসজিদ নিয়ে বর্তমান বিতর্ক মুসলিম সমাজের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার বিষয়। ধর্মীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আবেগের পাশাপাশি ইতিহাস, আইন এবং গবেষণাভিত্তিক যুক্তি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
ইসলামের শিক্ষা মানুষকে জ্ঞান অর্জন, সত্য অনুসন্ধান এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানায়। মহানবী (সা.)-এর জীবনেও ধৈর্য, প্রজ্ঞা, শান্তিপূর্ণ আচরণ এবং চুক্তি রক্ষার বহু উদাহরণ রয়েছে।
তাই এই ধরনের বিষয়ে মুসলিম সমাজের উচিত :
- ঐতিহাসিক দলিল ও নথি সংরক্ষণ করা।
- আইন ও সংবিধান সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
- শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মত উপায়ে নিজেদের দাবি উপস্থাপন করা।
- অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতা বজায় রাখা।
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন তথ্য ও উত্তেজনামূলক বক্তব্য প্রচার থেকে বিরত থাকা।
ধর্মীয় অধিকার রক্ষার সংগ্রামকে জ্ঞান, ন্যায়বিচার এবং শান্তিপূর্ণ নাগরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়াই অধিক দায়িত্বশীল পথ।
উপসংহার
দিল্লির কৃষি ভবনের কাদিমি মসজিদকে ঘিরে বর্তমান বিতর্ক ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ঐতিহাসিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। একদিকে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক প্রয়োজন ও উন্নয়ন প্রকল্প রয়েছে; অন্যদিকে রয়েছে একটি শতাব্দীপ্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনার ইতিহাস, মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক ব্যবহার।
ইসলাম আমাদের ন্যায়বিচার, শান্তি, মানবিকতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার শিক্ষা দেয়। একইভাবে ভারতের সংবিধানও ধর্মীয় স্বাধীনতা, সমতা এবং বহুত্ববাদের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই দুই মূল্যবোধের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি না করে বরং ন্যায়সংগত সমাধানের পথ অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
কোনো ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থাপনার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষেত্রে কেবল প্রশাসনিক সুবিধা কিংবা আবেগ, কোনোটিই একমাত্র বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়। প্রয়োজন ঐতিহাসিক তথ্যের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক প্রয়োজনের প্রতি সংবেদনশীলতা।
একটি প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার প্রশাসনিক দক্ষতায় নয়; বরং ভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মানুষের অধিকারকে ন্যায়সংগতভাবে বিবেচনা করার মধ্যেও নিহিত।
সর্বোপরি, ভারতের উন্নয়ন এমন হওয়া প্রয়োজন, যেখানে আধুনিকতার অগ্রযাত্রার পাশাপাশি ইতিহাসের স্মৃতি, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং মানবিক মর্যাদাও সমান গুরুত্ব পায়। কারণ উন্নয়ন একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে, আর ঐতিহ্য তার অতীতকে স্মরণ করিয়ে দেয়। একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের কর্তব্য হলো, এই দুইয়ের মধ্যে ন্যায়সংগত সেতুবন্ধন তৈরি করা।