পশ্চিমের আকাশে নতুন প্রভাত: মিশিগানের সিনেটর আবদুল এল-সাইয়েদ ও এক সভ্যতার আরোগ্যলাভের আখ্যান

প্রভাতের সংবাদ ও দূরদেশের অনুরণন

কার্তিকের এই প্রথম সপ্তাহে বাংলার মাঠে আমন ধানের শিষে সোনার রং ধরেছে। ভোরের শিশিরে হিমের ছোঁয়া লেগেছে, আর নদীর বুকে কুয়াশা ভাসতে ভাসতে দূর বাঁকের দিকে মিলিয়ে যাচ্ছে। এমন এক প্রভাতে আটলান্টিকের ওপার থেকে একটি সংবাদ এসে পৌঁছেছে। আমি আমার পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্যের ছায়ায় বসে সেই সংবাদ বারবার পড়েছি, আর ভেবেছি, ইতিহাস বুঝি এভাবেই নিঃশব্দে বাঁক নেয়। কোনো দামামা বাজে না, কোনো তোরণ গড়া হয় না। একদিন হঠাৎ দেখা যায়, যে নদী এতকাল এক খাতে বইছিল, সে অন্য খাতে বইছে, আর দুই কূলের মানুষ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।

সংবাদটি এই যে, আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে মিশিগান রাজ্যের ভোটাররা আবদুল এল-সাইয়েদকে তাঁদের সিনেটর নির্বাচিত করেছেন। মিশরীয় অভিবাসীর এই সন্তান একসময় চিকিৎসাবিদ্যা পড়েছিলেন, পরে ওয়েন কাউন্টির জনস্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্ব সামলেছেন। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুসারে তিনি রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্সকে হারিয়েছেন, আর মার্কিন সিনেটের ইতিহাসে তিনিই প্রথম মুসলমান সদস্য। বিয়াল্লিশ বছর বয়সী এই মানুষটি আগামী জানুয়ারিতে শপথ নেবেন। যে কক্ষে দুই শতাব্দীরও বেশি সময় কোনো মুসলমানের পায়ের শব্দ শোনা যায়নি, সেখানে এবার তাঁর কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হবে।

আমি কোনো দলীয় রাজনীতির মানুষ নই, ভোটের হিসাবও আমার পেশা নয়। আমি সেই ঐতিহ্যের একজন বিনীত উত্তরসাধক, যার শৈশব কেটেছে বাগদাদের বায়তুল হিকমায়, যৌবন কর্ডোভার গ্রন্থাগারে, আর বার্ধক্য ঔপনিবেশিক অন্ধকারের তলায়। সেই উত্তরাধিকার নিয়ে আমি এই সংবাদকে শুধু একটি নির্বাচনী ফল হিসেবে পড়তে পারি না। আমার কাছে এটি একটি সভ্যতার আরোগ্যলাভের প্রথম লক্ষণ। দীর্ঘ রোগশয্যার পর রোগী যেমন একদিন ভোরে নিজেই উঠে জানালার ধারে দাঁড়ায় আর আলোর দিকে তাকিয়ে থাকে, পশ্চিমা সভ্যতার একাংশও যেন তেমনি নিজের অন্ধ সংস্কারের বিছানা ছেড়ে উঠতে চাইছে। এই প্রবন্ধে আমি সেই আরোগ্যের কথাই বলতে চাই। আমার সম্বল আল জাজিরার ধারাবাহিক নির্বাচনী প্রতিবেদন আর প্রার্থীর নিজস্ব প্রচার-পত্র। আর সম্বল সেই দৃষ্টি, যা ধৈর্য নিয়ে ইতিহাস পড়তে শিখেছে।

পশ্চিমের চক্ষুরোগ: প্রাচ্যবাদের উত্তরাধিকার

যে বিজয়কে আমি আরোগ্যের লক্ষণ বলছি, তার তাৎপর্য বুঝতে হলে আগে রোগটার স্বরূপ চেনা দরকার। এডওয়ার্ড সাইদ তাঁর বিখ্যাত বইয়ে যাকে প্রাচ্যবাদ নাম দিয়েছিলেন, আমি তাকে বলি পশ্চিমের চক্ষুরোগ। এটি এমন এক দৃষ্টিবিভ্রম, যাতে আক্রান্ত চোখ প্রাচ্যকে কখনো পূর্ণ মানুষের আবাসভূমি হিসেবে দেখে না। সে দেখে রহস্যের পর্দায় ঢাকা এক দূর ভূখণ্ড, যেখানে মানুষ যুক্তির নয়, আবেগের দাস, সভ্যতার নয়, বর্বরতার বাহক। এই দৃষ্টিতে মুসলমান কখনো ব্যক্তি নয়, সে সব সময়ই একটি 'সমস্যা', একটি 'বিপদ', একটি 'প্রশ্নচিহ্ন'। তার নাম শুনলে শ্রোতার মনে সন্দেহের ছায়া নামে, তার প্রার্থনার ভঙ্গি দেখলে কেউ কেউ ষড়যন্ত্রের গন্ধ পায়।

এই রোগের শিকড় কয়েক শতাব্দী পুরোনো। ক্রুসেডের স্মৃতি থেকে উপনিবেশবাদের যুক্তিজাল পর্যন্ত, প্রতিটি যুগে পশ্চিম প্রাচ্যকে এমনভাবে গড়েছে, যাতে নিজের আধিপত্য ন্যায্য মনে হয়। 'সভ্য করার ব্রত'-র নামে বন্দর দখল হয়েছে, প্রাচীন গ্রন্থাগার পুড়েছে, আর একটি গোটা ভূখণ্ডের ইতিহাস স্কুলের পাঠ্যবই থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। আজকের দিনেও সেই রোগের উপসর্গ যায়নি। বিমানবন্দরে বাড়তি তল্লাশি, সংবাদের শিরোনামে 'ইসলামি সন্ত্রাস' শব্দের একতরফা ব্যবহার, সিনেমার পর্দায় দাড়িওয়ালা খলনায়ক, সবই সেই পুরোনো চশমার ফল। কিন্তু রোগ যত পুরোনোই হোক, কোনো রোগই অমর নয়। প্রতি যুগেই এমন কিছু মানুষ জন্মান, যাঁরা সেই চশমা খুলে নিজের চোখে জগৎ দেখতে শেখেন। আজ আমেরিকার মিশিগান রাজ্য সেই চশমা খুলে ফেলার সাহস দেখাল ঠিক যেমনটা গত বছর নিউ ইয়র্কে ঘটেছিল, যখন জোহরান মামদানি নিউ ইয়র্ক সিটির প্রথম মুসলিম মেয়র হিসেবে বিজয়ী হয়েছিলেন।। এই সংবাদের গভীরতম অর্থ এখানেই।

নামের উপহাস, বিশ্বাসের বিদ্রূপ: প্রচারের অন্ধকার পর্ব

আল জাজিরার প্রতিবেদন যাঁরা মন দিয়ে পড়েছেন, তাঁরা জানেন, এই বিজয় কতটা অন্ধকার পথ পেরিয়ে এসেছে। নির্বাচনের শেষ সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মিশিগানের এক জনসভায় আবদুল এল-সাইয়েদকে 'জিহাদি' বলেছিলেন। আরও বলেছিলেন, নির্বাচিত হলে তিনি এমন একমাত্র সিনেটর হবেন, যাঁকে সিনেট-কক্ষে ঢোকার আগে মেটাল ডিটেক্টরের ভেতর দিয়ে যেতে হবে। উপ-রাষ্ট্রপতি জে ডি ভ্যান্সও একই সুরে বাক্যবাণ ছুড়েছিলেন। আল জাজিরা ধারাবাহিকভাবে লিখেছে, কীভাবে নির্বাচনের শেষ দুটি জনসভায় ট্রাম্প এল-সাইয়েদ এবং সোমালি বংশোদ্ভূত কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমর, দুজনকেই আক্রমণের লক্ষ্য বানিয়েছিলেন। অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন মনে করিয়ে দেয়, ট্রাম্প আগেও সোমালি অভিবাসীদের নিয়ে কটূক্তি করেছেন, আর সোমালিরা মূলত মুসলমান।

একবার ভেবে দেখুন, একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনী মঞ্চে দাঁড়িয়ে একজন নাগরিকের নাম নিয়ে ঠাট্টা করছেন, তাঁর ধর্মাচরণকে সন্দেহের বিষয় বানাচ্ছেন, তাঁর জন্য বিশেষ নজরদারির কথা তুলছেন, আর এই সবকিছু ঘটছে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রকাশ্য সভায়। টেক্সাসের মুসলমান ভোটাররা আল জাজিরাকে বলেছেন, তাঁরা কারও রাজনৈতিক জুজুবুড়ি হয়ে থাকতে রাজি নন। সেখানে এক মুসলমান রিপাবলিকান নিজের দলের এক সমাবেশে উপস্থিত থেকে অনুভূতিটাকে 'অত্যন্ত মর্মান্তিক' বলে বর্ণনা করেছেন। সিএআইআর-টেক্সাস গভর্নর অ্যাবটের বিরুদ্ধে বাক্‌স্বাধীনতার সাংবিধানিক ভিত্তিতে মামলাও করেছে। ডেট্রয়টের কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তালিব আল জাজিরাকে বলেছেন, ফুটবল খেলার বিরতিতে এমন বর্ণবিদ্বেষী বিজ্ঞাপন দেখানো হতো যে শিশুদের সামনে টিভি বন্ধ করে দিতে হতো। এই সব ঘটনা একসঙ্গে জুড়লে একটি ছবি ফুটে ওঠে। প্রার্থীর বিরুদ্ধে আক্রমণ যেন শুধু একজন মানুষের বিরুদ্ধে ছিল না, একটি গোটা জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বের স্বীকৃতিকেই লক্ষ্য করেছিল। ঠিক এই কারণেই তাঁর জয় ব্যক্তিগত সাফল্যের সীমা ছাড়িয়ে সম্মিলিত আত্মমর্যাদার ঘোষণা হয়ে উঠেছে।

চিকিৎসকের রাজনীতি: ব্যাধির মূলে হাত

এল-সাইয়েদকে শুধু ধর্মের পরিচয়ে বেঁধে ফেললে তাঁর প্রতি অবিচার হবে। তাঁর প্রচার-পত্র নিজের পরিচয় দিচ্ছে এভাবে: তিনি রাজনীতিক হতে চাননি, চিকিৎসক হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বুঝেছিলেন, ভাঙা রাজনৈতিক ব্যবস্থাই মানুষকে অসুস্থ করে তুলছে। এই একটি বাক্যেই তাঁর পুরো দর্শনের বীজ লুকিয়ে আছে। যে চিকিৎসক রোগীর জ্বর নামিয়েই তৃপ্ত থাকেন না, জ্বরের কারণ খুঁজতে সমাজের শিরা-উপশিরায় অনুসন্ধান চালান, তিনিই প্রকৃত চিকিৎসক। এল-সাইয়েদ সেই অনুসন্ধানেই নেমেছিলেন। তাঁর নির্বাচনী কর্মসূচির তিনটি স্তম্ভ ছিল: রাজনীতি থেকে কর্পোরেট অর্থের বিদায়, সাধারণ মানুষের পকেটে অর্থ ফিরিয়ে দেওয়া, আর সবার জন্য সরকারি স্বাস্থ্যবিমা, যাকে আমেরিকায় 'মেডিকেয়ার ফর অল' বলা হয়।

আল জাজিরা তাঁর রাজনীতিকে ডেমোক্র্যাটিক দলের সংখ্যাগরিষ্ঠের তুলনায় অনেক বেশি বামপন্থী ও আমূল বলে বর্ণনা করেছে, আর ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন সমর্থনের কড়া সমালোচনাকে তাঁর অন্যতম পরিচয় বলে উল্লেখ করেছে। বিজয়ের রাতে তিনি যা বলেছেন, তার সারকথা এই: সাধারণ মানুষ কর দিচ্ছে, অথচ সেই অর্থ তার নিজের ও সন্তানের কল্যাণে খরচ না হয়ে অন্য কারও সন্তানের মাথায় বোমা হয়ে পড়ছে, এটা চলতে পারে না। এই বক্তব্যে মতের মিল-অমিল থাকতেই পারে। অনেকে তাঁর পররাষ্ট্রনীতির বিরোধিতা করবেন, গণতন্ত্রে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একটি বিষয় লক্ষণীয়। তাঁকে জিতিয়েছে কোনো ধর্মীয় আবেগ নয়, জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবার উচ্চ খরচ আর রাজনীতিতে অর্থের আধিপত্যের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ। ডেট্রয়টের এক ভোটার আল জাজিরাকে বলেছেন, জ্বালানির দাম বেড়েছে, পরিবর্তন চাই। টেক্সাসের আরেক ভোটার সব প্রার্থীকে একই বার্তা দিয়েছেন: 'নিজের কাজটা করুন।' তাই একজন মুসলমান প্রার্থীকে নির্বাচিত করে মার্কিন জনগণ যে পরিবর্তনের কথা বলছেন, তা একই সঙ্গে ধর্মীয় সহনশীলতার আর অর্থনৈতিক ন্যায়ের দাবি। আর এই দুটি দাবি একে অপরের পরিপূরক।

নিজের ঘরের আঘাত ও অর্থের প্রাচীর

এই বিজয়কে নিছক সহজ জয় ভাবলে ভুল হবে। আগস্টের প্রাইমারিতে তিনি মধ্যপন্থী, চারবারের কংগ্রেস সদস্য হেলি স্টিভেন্সকে প্রায় পনেরো হাজার ভোটের সামান্য ব্যবধানে হারিয়ে ডেমোক্র্যাটিক মনোনয়ন পেয়েছিলেন। নির্বাচনের ঠিক আগের রবিবারে সেই স্টিভেন্স প্রকাশ্যে রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী রজার্সের পক্ষে দাঁড়ালেন আর এল-সাইয়েদের প্রচারকে 'ঘৃণা'র অভিযোগে অভিযুক্ত করলেন। নিজের দলের ভেতর থেকে এমন আঘাত আসবে, তা অনেকেই ভাবেননি। আল জাজিরা বলছে, প্রচারের শেষ পর্ব এই বিভাজনে অশান্ত হয়ে উঠেছিল।

অন্যদিকে ছিল অর্থের এক বিশাল প্রাচীর। আগস্টের প্রাইমারির পর শুধু এই একটি সিনেট-আসনের জন্য একশো মিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিজ্ঞাপন-খরচ হয়েছে। মিশিগান এমন এক রাজ্য, যেখানে ১৯৯৪ সালের পর কোনো রিপাবলিকান সিনেট নির্বাচনে জেতেননি। ডেমোক্র্যাট সিনেটর গ্যারি পিটার্সের অবসরে আসনটি খালি হওয়ায় এটি জাতীয় ক্ষমতার লড়াইয়ের কেন্দ্রে চলে এসেছিল। এই দুই প্রতিকূলতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনি ভরসা রেখেছিলেন সাধারণ মানুষের ছোট ছোট অনুদানের ওপর। তাঁর প্রচার-পত্র দাবি করেছে, অভিযানটি পুরোপুরি সাধারণ মানুষের টাকায় চলেছে, কর্পোরেট বা ধনকুবেরদের টাকায় নয়। প্রচার-পত্র আরও জানায়, ১ নভেম্বর একদিনেই তাঁরা চব্বিশ লক্ষ ডলারের বেশি সংগ্রহ করেছেন। নিজ প্রচারের এসব দাবি আমরা সতর্কভাবেই গ্রহণ করব, কারণ প্রার্থীর নিজের ওয়েবসাইট স্বভাবতই নিজের পক্ষের কথা বলে। তবু বিজয়ের রাতে তিনি যে সূত্রটি উচ্চারণ করেছেন, তা সহজেই বোঝা যায়। তাঁর ভাষ্য, টাকা আর জনতার লড়াইয়ে এবার জনতাই জিতেছে। যে লড়াইয়ে প্রতিপক্ষের পেছনে সর্বোচ্চ ক্ষমতার সমর্থন, বিপুল অর্থবল আর নিজের দলের আংশিক প্রত্যাখ্যান, সেখানে জয়ের অর্থ শুধু ভোটের সংখ্যায় মাপা যায় না। এটি মানুষের আত্মবিশ্বাসের একটি অনির্বচনীয় প্রকাশ।

পরিহাসে মর্যাদা: বিজয়-রজনীর বাণী

বিজয়ের রাতে এল-সাইয়েদ যে ভাষণ দিয়েছেন, তা আমার কাছে একটি ছোট কিন্তু গভীর রচনার মতো মনে হয়েছে। তিনি সেই অভিভাবকদের কথা তুলেছেন, যাঁরা সন্তানকে বোঝাতে পারছিলেন না, কেন দেশের রাষ্ট্রপতি কারও নাম বা প্রার্থনার ধরন নিয়ে ঠাট্টা করেন। তাঁদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, আগামীকাল সন্তানকে জানিয়ে দিতে যে 'খারাপ লোকেরা হেরে গেছে'। আর ট্রাম্পের প্রতি তাঁর সম্ভাষণ ছিল রসে ভরা: নামের উচ্চারণে যদি অসুবিধা হয়ে থাকে, তাহলে জানুয়ারিতে উপ-রাষ্ট্রপতি ভ্যান্স তাঁকে শপথ করানোর পর শুধু 'সিনেটর' বলে ডাকলেই চলবে।

এই কথাগুলোয় রাগের জ্বালা নেই, আছে এক প্রশান্ত তেজ। আমি অবাক হই, কীভাবে একজন মানুষ অপমানের তীব্রতাকে পরিহাসের মর্যাদায় তুলে আনতে পারেন। কবিগুরু লিখেছিলেন, 'যেথা চিত্ত ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির।' যে মানুষের শির উঁচু, সে অপমানের জবাবে অপমান ছুড়ে দেয় না। সে এমনভাবে জবাব দেয়, যাতে অপমানকারী নিজেই নিজের ক্ষুদ্রতা টের পান। এল-সাইয়েদ আরও বলেছেন, আমেরিকার মহত্ত্ব নিজের ত্রুটি উপেক্ষা করায় নয়, ত্রুটি শোধরানোর সাহসে। তাঁর মতে, দেশকে আবার 'মহান' করার দরকার নেই, দরকার সেই ইচ্ছাটাকে বুকে ধরে রাখা, যা এই জাতিকে সব সময় আরও পূর্ণ হয়ে ওঠার প্রেরণা দিয়েছে। এই ভাষা শুধু রাজনীতিকের নয়, সাধকের ভাষা। যে জাতি নিজের অপূর্ণতাকে লুকাতে না চেয়ে স্বীকার করতে শেখে, সে-ই আসলে সুস্থ হয়ে উঠতে থাকে।

রাজ্যে রাজ্যে অরুণোদয়: কংগ্রেস ও গভর্নরের মানচিত্র

মিশিগানের এই ঘটনাকে আমি একা দেখতে চাই না। পুরো দেশের নির্বাচনী মানচিত্রের পটভূমিতে রাখলে এর অর্থ আরও স্পষ্ট হয়। আল জাজিরার ৪ নভেম্বরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী ডেমোক্র্যাটরা এবার প্রতিনিধি সভা ও সিনেট, দুই কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছেন। বিশ বছরের মধ্যে এই প্রথম একজন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসের দুই কক্ষই হারালেন। সংবাদ লেখার সময় প্রতিনিধি সভায় ডেমোক্র্যাটদের হাতে ২২৮টি আসন ছিল, আরও ৩৪টিতে তাঁরা এগিয়ে ছিলেন। সিনেটে তাঁদের ঝুলিতে ৫৪টি আসন, আর রিপাবলিকানদের ৪৪টি। প্রতিবেদন বলছে, ১৯৯০-এর দশকের পর এটি ডেমোক্র্যাটদের সবচেয়ে বড় বিজয় হতে পারে। মনে রাখা দরকার, গণনা তখনও চলছিল, তাই চূড়ান্ত সংখ্যা কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।

গভর্নরদের ক্ষেত্রেও ছবিটি একই রকম। ছত্রিশটি রাজ্যে গভর্নর নির্বাচন হয়েছে। আল জাজিরার হিসাবে ডেমোক্র্যাটরা আঠাশটি, রিপাবলিকানরা কুড়িটি রাজ্যে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, দুটি রাজ্যের ফল তখনও অনিশ্চিত। জর্জিয়ায় আটলান্টার প্রাক্তন মেয়র কেইশা ল্যান্স বটমস দুইশো মিলিয়ন ডলারেরও বেশি নিজস্ব অর্থ খরচ করা ধনকুবের রিক জ্যাকসনকে হারিয়ে জনপ্রিয় বিদায়ী গভর্নর ব্রায়ান কেম্পের উত্তরাধিকার নিয়েছেন। ওহাইওতে ডেমোক্র্যাট অ্যামি অ্যাকটন রিপাবলিকান তারকা বিবেক রামাস্বামীকে হারিয়েছেন। টেক্সাসে জেমস ট্যালারিকো সিনেট নির্বাচনে অ্যাটর্নি জেনারেল কেন পাক্সটনকে হারিয়ে এমন এক জয় ছিনিয়ে এনেছেন, যা ১৯৯৪ সালের পর রাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের প্রথম রাজ্যব্যাপী বিজয়। ক্যানসাসে মেথডিস্ট যাজক অ্যাডাম হ্যামিল্টন বর্তমান সিনেটর রজার মার্শালকে হারিয়েছেন, যা ১৯৩২ সালের পর ওই রাজ্যের প্রথম ডেমোক্র্যাট সিনেটর। সাউথ ক্যারোলাইনায় অ্যানি অ্যান্ড্রুজ, নর্থ ক্যারোলাইনায় রয় কুপার আর মেইনে ট্রয় জ্যাকসন সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের শক্তি বাড়িয়েছেন।

এই সব জয়ের মধ্যে একটি সূত্র আমার চোখে পড়েছে। বহু ক্ষেত্রেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমর্থিত প্রার্থীরা হেরেছেন। আল জাজিরা লিখেছে, ট্রাম্প ভোটারদের বলেছিলেন, তিনি নিজেই যেন ব্যালটে আছেন। কিন্তু ফল আসার পর তিনি ফক্স নিউজে স্বীকার করলেন, ডেমোক্র্যাটরা ভালো কাজ করেছে, তারা কঠিন লড়াই করেছে। অন্য সংবাদসূত্র জানাচ্ছে, তিনি ইরান-যুদ্ধের প্রভাবের কথাও মেনে নিয়েছেন। এই স্বীকারোক্তি আমার কাছে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। যে শক্তি এতদিন ভয় আর বিভাজনের ভাষায় রাজনীতি করতে অভ্যস্ত ছিল, সে আজ অন্তত আংশিকভাবে বুঝেছে যে সেই ভাষা সব সময় কাজ করে না।

উপহাসের পরাজয়: ট্রাম্প-বিরোধী প্রার্থীদের কাহিনি

আমার বিশেষ মনোযোগ গেছে সেই প্রার্থীদের দিকে, যাঁরা ট্রাম্পের বিরোধিতা করে তাঁর ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ আর ব্যক্তিগত আক্রমণের মুখোমুখি হয়েছেন। টেক্সাসের জেমস ট্যালারিকোর ক্ষেত্রে তাঁর প্রতিপক্ষ পাক্সটন তাঁকে বিদ্রূপ করে একটি ডাকনাম চালু করেছিলেন, যা পরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও গ্রহণ করেন। আল জাজিরার সাক্ষাৎকারে এক টেক্সাসবাসী ভোটার ঠিক এই নামকরণের সংস্কৃতিকেই কটাক্ষ করে বলেছেন, নীতির কথা না বলে শুধু নাম ধরে উপহাস করাই এঁদের রাজনীতি। অথচ সেই ট্যালারিকোই শেষ পর্যন্ত জিতে বলেছেন, টেক্সাসের মানুষ তাঁর গুলতি হয়ে গলিয়াথকে হারিয়েছে।

এখানে একটি সাধারণ সত্য ধরা পড়ে। উপহাস আর ব্যঙ্গ কিছুদিন আলোড়ন তোলে, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে ভোটারের আস্থা জিততে পারে না, যদি না তার পেছনে বাস্তব প্রতিশ্রুতি আর কাজের সামর্থ্য থাকে। যাঁরা ট্রাম্পের কটাক্ষের শিকার হয়েও স্থির ছিলেন, ক্যানসাসের যাজক হ্যামিল্টন, যিনি বলেছেন, গণতন্ত্র বাঁচানোর এই সময়ে ধর্ম আর রাজনীতি নিয়ে চুপ থাকা চলে না, কিংবা নর্থ ক্যারোলাইনার রয় কুপার, তাঁরা প্রত্যেকে একটি করে জীবন্ত উদাহরণ রেখে গেছেন। এল-সাইয়েদ এই সারিরই সবচেয়ে সামনে, কারণ তাঁর ওপর আক্রমণ ছিল সবচেয়ে ব্যক্তিগত, তাঁর নাম আর বিশ্বাসের ওপর। আর সেই আক্রমণ যে ব্যর্থ হলো, তা শুধু একজন প্রার্থীর বিজয় নয়, এমন একটি রাজনৈতিক কৌশলের ব্যর্থতাও, যা মানুষের ভিন্নতাকে অস্ত্র বানাতে চেয়েছিল। এই কৌশল আজ ক্ষয়িষ্ণু, আর তার ক্ষয়ই আমাদের আশার কারণ।

বৈচিত্র্যের মিছিল: ইতিহাসের নবগঠন

এই নির্বাচনে মুসলমানের প্রথম স্থান পাওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি একটি বড় মিছিলের অংশ। আল জাজিরার 'প্রথমদের তালিকা' পড়লে মনে হয়, আমেরিকার রাজনৈতিক মঞ্চে একটি নীরব নবজন্ম ঘটছে। নিউ হ্যাম্পশায়ারে ক্রিস প্যাপাস সিনেটের প্রথম প্রকাশ্য সমকামী সদস্য হয়েছেন। জর্জিয়ায় বটমস প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর। নিউ মেক্সিকোয় ডেব হাল্যান্ড, লাগুনা পুয়েব্লো সম্প্রদায়ের সন্তান ও বাইডেন সরকারের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্র সচিব, প্রথম আদিবাসী আমেরিকান নারী গভর্নর। টেক্সাসে জিনা হিনোয়োসা প্রথম হিস্পানিক নারী গভর্নর, আর ক্যালিফোর্নিয়ায় জেভিয়ার বেসেরা প্রথম লাতিনো গভর্নর। ইলিনয়ের জুলিয়ানা স্ট্র্যাটনের জয়ে সিনেটে একসঙ্গে তিনজন কৃষ্ণাঙ্গ নারী থাকবেন, বাকি দুজন ডেলাওয়্যারের লিসা ব্লান্ট রচেস্টার আর মেরিল্যান্ডের অ্যাঞ্জেলা অলসব্রুকস। আর ফ্লোরিডায় রিপাবলিকান বায়রন ডোনাল্ডস প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রিপাবলিকান গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন।

এই তালিকায় যা আমাকে সবচেয়ে মুগ্ধ করে, তা হলো এখানে দলীয় সীমারেখা পুরোপুরি মানা হয়নি। ডোনাল্ডসের ঐতিহাসিক জয় প্রমাণ করে, বৈচিত্র্যের এই আন্দোলন কোনো একটি দলের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। এটি আরও গভীর এক সামাজিক পরিবর্তনের ঢেউ। যে দেশ একসময় একটিমাত্র মুখের ছাঁচে নিজেকে গড়তে চেয়েছিল, সে দেশ আজ বহু মুখের আয়নায় নিজেকে চিনতে শিখছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ভারতীয় বংশোদ্ভূত কয়েকজন প্রার্থীও এবার প্রতিনিধি সভায় জিতেছেন, আর অরুণা মিলার মেরিল্যান্ডের লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। এই সব ঘটনা একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, মার্কিন গণতন্ত্রের ভেতরে একটি নীরব আত্মসংশোধন চলছে, আর মুসলমান সম্প্রদায় সেই সংশোধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

মুসলমান প্রতিনিধিত্বের এই যাত্রা হঠাৎ শুরু হয়নি। ২০১৮ সালে রাশিদা তালিব ও ইলহান ওমর প্রথম মুসলমান নারী হিসেবে কংগ্রেসে ঢুকেছিলেন, আর সেদিনও বিদ্বেষের ঝড় কম বয়নি। ২০২২ সালে মেহমেট ওজ প্রথম মুসলমান হিসেবে একটি প্রধান দলের সিনেট-মনোনয়ন পেয়েছিলেন, যদিও তিনি হেরে যান। ওই বছরই সিএআইআর-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী বহু মুসলমান প্রার্থী রাজ্য ও স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই ধাপগুলো এক একটি সোপান, আর আজকের জয় সেই সিঁড়ির এক নতুন ধাপ। প্রতিটি ধাপ যখন ঘৃণার বিরুদ্ধে সাহসের এক একটি পদক্ষেপ, তখন সিঁড়ির ওপরে ওঠা কখনো আকস্মিক নয়, সব সময়ই পরিশ্রমের ফল।

হুজুরাতের বাণী ও ইবনে খালদুনের চক্র: ঐতিহ্যের দর্পণে

এবার আমি আমার ঐতিহ্যের আয়নায় এই ঘটনাকে দেখতে চাই। আমাদের পবিত্র গ্রন্থে বলা হয়েছে, মানবজাতিকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে সৃষ্টি করা হয়েছে, যাতে তারা একে অপরকে চিনতে পারে (সূরা হুজুরাত, ৪৯:১৩)। এই আয়াতে বৈচিত্র্য কোনো সমস্যা নয়, বরং বিধাতার পরিকল্পিত ব্যবস্থা। পরিচয়, অর্থাৎ পারস্পরিক জানা-বোঝাই এর উদ্দেশ্য, ভয় বা অবজ্ঞা নয়। যে সভ্যতা এই সত্য মেনে নেয়, সে সীমানার বাইরের মানুষকে সহযাত্রী ভাবে, হুমকি ভাবে না। অন্য এক আয়াতে আমাদের মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে, কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের অবিচারের দিকে ঠেলে না দেয় (সূরা মায়িদা, ৫:৮)। এই দুটি নির্দেশের আলোয় বলা যায়, আমাদের বিশ্বাস আমাদের শিখিয়েছে প্রতিপক্ষের প্রতিও ন্যায়বিচারে অবিচল থাকতে, এমনকি যখন সে আমাদের অপমান করে।

ইবনে খালদুন তাঁর মুকাদ্দিমায় সভ্যতার উত্থান-পতনের যে চক্রের কথা লিখেছেন, তা আজ নতুন অর্থ নিয়ে হাজির। তাঁর মতে, কোনো শক্তি যখন ন্যায় আর সংহতির ভিত্তি হারিয়ে শুধু ক্ষমতার অহংকারে ফুলে ওঠে, তখন তার পতনের বীজ বোনা হয়ে যায়। আজ পশ্চিম একটি আত্মসমীক্ষার মুহূর্তে দাঁড়িয়ে। তার ভোটাররা প্রশ্ন করছেন, যে উৎকণ্ঠা আমাদের শেখানো হয়েছিল, তা কি সত্যি? যে প্রতিবেশীকে ভয় পেতে বলা হয়েছিল, সে কি সত্যিই বিপদ, নাকি আমাদের চিকিৎসক, আমাদের সহকর্মী, আমাদের সন্তানের শিক্ষক? এই প্রশ্ন তোলাই আত্মসংশোধনের সূচনা।

আমাদের দার্শনিক আল-কিন্দি নবম শতাব্দীতেই বলেছিলেন, সত্যকে গ্রহণ করতে লজ্জা পাওয়ার কারণ নেই, তা যে জাতি বা উৎস থেকেই আসুক না কেন। এই উদারতাই ছিল আমাদের সোনালি যুগের প্রাণ, যখন বাগদাদের পণ্ডিতরা গ্রিক, পারসিক ও ভারতীয় জ্ঞান একই ছাদের নিচে অনুবাদ করতেন। আজ পশ্চিমের কিছু মানুষ যেন সেই উদারতাকে নতুন করে আবিষ্কার করছেন। তাঁরা বুঝতে পারছেন, সভ্যতা কোনো একক ভূখণ্ডের সম্পত্তি নয়। এটি মানবজাতির যৌথ উত্তরাধিকার, আর এর ধারক বহু ভাষা, বহু নাম আর বহু বিশ্বাসের মানুষ।

সতর্ক আশা: আরোগ্যের পথে অপূর্ণতার স্বীকৃতি

আমি জানি, প্রতিটি আনন্দের সঙ্গে সতর্কতার কথাও বলতে হয়, নইলে তা আবেগের উচ্ছ্বাস হয়ে দাঁড়ায়, আর উচ্ছ্বাস দ্রুত শুকিয়ে যায়। প্রথমত, একটি নির্বাচনের ফলে ইসলামোফোবিয়া মুছে যায় না। আল জাজিরা নিজেই লিখেছে, প্রচারের সময় মুসলমান সম্প্রদায় উদ্বিগ্ন ছিল, আবার ধৈর্যও হারায়নি। বহু বছর ধরে জমে থাকা ঘৃণার বিষ এক রাতে শেষ হওয়ার নয়। যে সমাজে নির্বাচনী বিজ্ঞাপনে একজন প্রার্থীর ধর্মকে অস্ত্র বানানো সম্ভব হয়েছে, সেখানে সেই অস্ত্র ভবিষ্যতের কোনো নির্বাচনে আর ব্যবহার হবে না, এমন নিশ্চয়তা নেই।

দ্বিতীয়ত, এল-সাইয়েদের ইসরায়েল-নীতি আর সামরিক সহায়তা-বিরোধী অবস্থান নিয়ে মার্কিন সমাজে গভীর মতভেদ আছে। সেই মতভেদ গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। কেউ তাঁর সমালোচনা করবেন, কেউ প্রশংসা। কিন্তু সমালোচনা আর ঘৃণা এক জিনিস নয়। নীতির বিরোধিতা করা এক কথা, একজন মানুষকে তাঁর নাম আর ধর্মের জন্য 'জিহাদি' বলে দাগিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ আলাদা। আমি আশা করি, এই পার্থক্যটি আগামী দিনের আলোচনায় আরও স্পষ্ট হবে। তাঁর মতামতের সমালোচনা চলুক, কিন্তু সেই সমালোচনা যেন তাঁর পরিচয়ের ওপর আঘাত না হয়।

তৃতীয়ত, আমাদের নিজেদের ঘর সামলানোর দায়ও আছে। আমি একজন মুসলমান চিন্তাবিদ হিসেবে স্বীকার করি, মুসলিম বিশ্বের ভেতরেও বহু অন্যায়, বহু অসহিষ্ণুতা, বহু সংকীর্ণতা আছে। পশ্চিমের পক্ষপাতের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার নৈতিক অধিকার আমাদের তখনই থাকবে, যখন আমরা সংখ্যালঘুর প্রতি, নারীর প্রতি, ভিন্নমতের মানুষের প্রতি নিজেদের ঘরে ন্যায় আর সৌজন্য নিশ্চিত করতে পারব। এল-সাইয়েদের কাহিনি আমাদেরও একটি আয়না ধরে দিচ্ছে। সম্মান পেতে হলে সম্মান দিতে শিখতে হয়, আর অন্যের কাছে সমতা দাবি করতে হলে নিজের ঘরে সমতা প্রতিষ্ঠা করতে হয়।

পূর্ব ও পশ্চিমের মিলনসেতু

এখানে আমি রবীন্দ্রনাথের কথা না মনে করে পারি না। তাঁর 'পূর্ব ও পশ্চিম' প্রবন্ধে তিনি যে উপলব্ধির কথা বলেছিলেন, তা আজ নতুন প্রাসঙ্গিকতায় উজ্জ্বল। তাঁর বক্তব্যের মর্ম এই যে, পূর্ব ও পশ্চিমের মিলন ছাড়া মানবসভ্যতা সম্পূর্ণ হতে পারে না। সেই মিলন কখনো রাজ্যজয়ে আসে না, কখনো বাণিজ্যের লাভ-ক্ষতির হিসাবেও আসে না, আসে হৃদয়ের উদারতায়। দুই পক্ষ যখন একে অপরের কাছে নিজের দরজা খুলে দেয়, তখনই প্রকৃত মিলনের সূচনা।

মিশিগানের এই বিজয়কে আমি সেই মিলনেরই একটি ছোট কিন্তু প্রতীকী পদক্ষেপ মনে করি। যেদিন একজন মার্কিন ভোটার একটি মুসলমান সন্তানের নাম শুনে ভয় না পেয়ে ভরসা পান, সেদিন পূর্ব ও পশ্চিমের মাঝে একটি সেতুর এক ইঞ্চি তৈরি হয়। সেই ইঞ্চিগুলো একসঙ্গে জুড়েই একদিন বিশাল সেতু হবে। এল-সাইয়েদের অসংখ্য সমর্থক, যাঁদের মধ্যে মুসলমান, খ্রিস্টান, ইহুদি, নাস্তিক সবাই ছিলেন, প্রমাণ করেছেন যে সেই সেতু গড়া সম্ভব। তাঁরা প্রার্থীকে ধর্ম দেখে নয়, মানুষ দেখে বেছেছেন। আর যেদিন কোনো সিনেটরকে তাঁর কাজ দিয়ে বিচার করা হবে, তাঁর নামের উচ্চারণ দিয়ে নয়, সেদিনই আমরা সত্যিকার জয়ের স্বাদ পাব।

সন্ধ্যার প্রদীপ: নিভতে না দেওয়ার শপথ

সন্ধ্যা নেমেছে। বাংলার আকাশে কার্তিকের প্রথম তারাটি জ্বলে উঠেছে, আর দূরে কোথাও শঙ্খের ধ্বনি ভেসে আসছে। পশ্চিমের সেই দূর দেশে এখন প্রভাত। সেখানে এক নতুন সিনেটর নিজের শপথের দিন গুনছেন, আর লক্ষ লক্ষ শিশু, যাদের নামের বানান নিয়ে স্কুলে কেউ কখনো হেসেছে, তারা আজ রাতে একটু বেশি নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। তাদের অভিভাবকরা সকালে উঠে তাদের বলতে পারবেন, দেখো, তোমার নাম নিয়ে লজ্জার কিছু নেই। যেকোনো সভ্যতার আরোগ্যের মাপকাঠি তার ক্ষমতাবানদের কীর্তিতে নয়, তার দুর্বলতমের মনের নিশ্চিন্ততায়।

আমি বিশ্বাস করি, জগৎ ধীরে ধীরে নিজের ক্ষত সারিয়ে তুলছে। এই সেরে ওঠা সহজ নয়, দ্রুতও নয়। ঘৃণা পিছু হটবে, আবার ফিরে আসবে, আবার পিছু হটবে। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে একবার যে দরজা খুলে গেছে, তা পুরোপুরি বন্ধ করা আর সম্ভব নয়। আমাদের কাজ শুধু এটুকুই: সেই দরজার আলোটিকে নিভতে না দেওয়া। আমরা, যাঁরা এই ঘটনাকে দূর থেকে দেখছি, তাঁদেরও একটি দায়িত্ব আছে। আমাদের নিজেদের সমাজে, নিজেদের পাড়ায়, নিজেদের হৃদয়ে ভিন্নতার প্রতি সেই সম্মান জাগিয়ে রাখতে হবে, যা আমরা অন্যের কাছে দাবি করি।

রবীন্দ্রনাথের গানের একটি পঙ্‌ক্তি আমার মনে পড়ছে: 'এই করেছ ভালো, নিঠুর হে, এই করেছ ভালো।' অন্ধকারের এই কঠিন পরীক্ষা না এলে আলোর এই মূল্য আমরা বুঝতাম না। ঘৃণার এই তীব্র প্রচারই বিজয়ের মাধুর্যকে আরও গাঢ় করেছে। আজ পশ্চিমের আকাশে যে আলো ফুটল, তা একজন মানুষের নামে লেখা হলেও সমগ্র মানবতার। আমরা সেই আলোকে প্রণাম জানাই, আর প্রার্থনা করি, এই আলো দিনে দিনে আরও ছড়িয়ে পড়ুক, যতদিন না পূর্ব আর পশ্চিমের মাঝে কোনো প্রাচীর অবশিষ্ট থাকে।

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter