ফ্লাইদুবাই হামলা ও ‘জিহাদ’ বিতর্ক: ইসলামি নৈতিকতা এবং ফিলিস্তিন সংকটের প্রেক্ষাপট আকাশে চরমপন্থা বনাম ইসলামের আমানত দর্শন
ভূমিকা
২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের ফ্লাইট FZ1073 (বোয়িং 737 MAX 8)-এ মাঝআকাশে ৩৪,০০০ ফুট উঁচুতে জর্ডান-সৌদি আরব সীমান্তের কাছে এক অভাবনীয় ও ভীতিকর সংকট তৈরি হয়। ২৯ বছর বয়সী ওমানি কো-পাইলট হামাম আল-হামামি (Hamam Al-Hammami) ককপিটের জরুরি ক্র্যাশ এক্স (কুড়াল) ও ছুরি নিয়ে ২৯ বছর বয়সী ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারের (Smit Machchhar) ওপর প্রাণঘাতী আক্রমণ চালান। আল-হামামি বিমানের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিয়ে সেটিকে হঠাৎ খাড়াভাবে নিচে নামাতে শুরু করেন, যার ফলে বিমানটি দুই মিনিটেরও কম সময়ে ১৪,০০০ থেকে ১৭,৪০৩ ফুট নিচে নেমে আসে। বিমানটি অনধিকার প্রবেশ ও বিমান ছিনতাইয়ের জরুরি কোড (যেমন- 7500) পাঠাতে শুরু করে। কিন্তু গুরুতর আহত হওয়া সত্ত্বেও রক্তাক্ত ক্যাপ্টেন মাচ্ছার সাহসিকতার সাথে লড়াই করে ককপিটের দরজা খুলে দিতে সক্ষম হন। বিমানের খাড়া অবমান ও হট্টগোল টের পেয়ে কেবিন ক্রু, ডেন্টিস্ট ও প্লাম্বারসহ কয়েকজন যাত্রী এবং ফ্লাইটে থাকা অফ-ডিউটি রিজার্ভ পাইলটরা ককপিটে ছুটে আসেন। তারা কো-পাইলটকে চোকহোল্ডে চেপে ধরে পরাস্ত করেন এবং কন্ট্রোল থেকে সরিয়ে নেন। পরবর্তীতে দুজন রিজার্ভ পাইলট বিমানের দায়িত্ব নিয়ে সেটিকে স্থিতিশীল করেন এবং ১৪৭ জন যাত্রী ও ২৭ জন ক্রুর জীবন রক্ষা করে সৌদি আরবের তাবুবে জরুরি অবতরণ করান।
ঘটনা চলাকালে বিমানটি রুট থেকে বিচ্যুত হয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে ইসরায়েলি বিমান বাহিনী ফাইটার জেটের মাধ্যমে আকাশপথ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে গোয়েন্দা তথ্যে জানা যায়, বিমানে ১৫০ জনের বেশি ইসরায়েলি নাগরিক থাকা সত্ত্বেও ৯/১১ স্টাইলের প্রতিরক্ষা প্রটোকল অনুযায়ী ইসরায়েল বিমানটিকে গুলি করে নামানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই বিমানটি সৌদি আরবের দিকে মোড় নেয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবরটি আসার পর থেকেই শুরু হয়েছে বহুমুখী বিতর্ক। একদিকে যেমন রয়েছে বেসামরিক এভিয়েশনের নিরাপত্তা ও পাইলট স্ক্রিনিং ব্যবস্থার গলদ, অন্যদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনে দ্রুতই জুড়ে দেওয়া হচ্ছে বহুল পরিচিত ‘জিহাদ’ বা ‘ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ’-এর তকমা। বিমানটি তেল আবিব যাচ্ছিল এবং সেখানে ইসরায়েলি নাগরিকরা উপস্থিত ছিলেন—কেবল এই একটি সমীকরণকে সামনে এনে পশ্চিমা বয়ানগুলোতে ঘটনাটিকে সরলীকরণ করে একপেশে ‘জিহাদি হামলা’ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
তবে একজন চিন্তাশীল মুসলিম এবং সাধারণ বিবেকবান মানুষ হিসেবেও এই পুরো বিষয়টিকে আমাদের অনুপুঙ্খভাবে ব্যবচ্ছেদ করা প্রয়োজন। একদিকে যেমন রয়েছে ফিলিস্তিনের রক্তক্ষয়ী বাস্তবতার সাথে মুসলিম জনমানসের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভ, অন্যদিকে তেমনি রয়েছে ইসলামের শরিয়াহ দর্শন, পেশাগত দায়বদ্ধতা এবং জিহাদ সম্পর্কিত মৌলিক নৈতিকতার প্রশ্ন। আবেগ আর চরমপন্থার এই ধূম্রজালে ইসলামি জ্ঞানতত্ত্ব ঠিক কী বার্তা দেয়—তা বস্তুনিষ্ঠভাবে বোঝা জরুরি।
ফিলিস্তিন পরিস্থিতি এবং মুসলিমদের মনস্তাত্ত্বিক ক্ষোভ
গাজা ও পশ্চিম তীরে যা ঘটছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ভৌগোলিক বিরোধ নয়; এটি আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম নির্মম ও দীর্ঘস্থায়ী এক মানবিক ট্র্যাজেডি। দশকের পর দশক ধরে চলা অবৈধ দখলদারিত্ব, নির্বিচার বিমান হামলা এবং লাখ লাখ নিরীহ ফিলিস্তিনির কান্না পৃথিবীর যেকোনো সংবেদনশীল মানুষকে নাড়া দেয়। মুসলিম বিশ্বের তরুণদের অন্তরে এই অবিচার এক তীব্র বেদনাবোধ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়ে চলেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যখন দেখা যায় আরব ও মুসলিম প্রধান দেশগুলোর সাথে ইসরায়েলের বাণিজ্য ও কূটনৈতিক স্বাভাবিকীকরণ বাড়ছে এবং আকাশে নিয়মিত বাণিজ্যিক বিমান উড়ছে, তখন সাধারণ জনমানসে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক অস্বস্তি ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
ফ্লাইদুবাইয়ের এই ঘটনাকে অনেকে সেই ক্ষোভেরই এক চূড়ান্ত অন্ধ বিস্ফোরণ হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—ক্ষোভের কারণ বাস্তব হলেই কি তার প্রকাশের যে কোনো পথ বৈধ হয়ে যায়? ককপিটে বসে সহকর্মীর ওপর কুড়াল চালানো কিংবা দেড় শতাধিক নিরীহ যাত্রীকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া কি ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার লড়াইকে এক চুলও এগিয়ে নেয়? বাস্তবতা হলো, এই ধরনের অদূরদর্শী, ধ্বংসাত্মক ও আবেগতাড়িত হিংস্রতা ফিলিস্তিনিদের রক্তস্নাত আত্মত্যাগকে কোনো সাহায্য তো করেই না; উল্টো তা দখলদার শক্তির হাতে নিপীড়নকে বৈধতা দেওয়ার নতুন আন্তর্জাতিক অজুহাত তুলে দেয় এবং মজলুমের ন্যায্য সংগ্রামকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
‘জিহাদ’ তকমার ফাঁদ এবং ইসলামের যুদ্ধনীতি
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে চেনা একটি শব্দ ঘুরেফিরে আসছে—‘জিহাদ’। পশ্চিমা মিডিয়া অনেক ক্ষেত্রেই কোনো ঘটনার গভীর অনুসন্ধান না করে মুসলিম পরিচয় জড়িত থাকলেই তাকে ‘জিহাদি হামলা’ বলে তকমা দিতে পছন্দ করে। আবার অপরপক্ষে, চরমপন্থী চিন্তাধারায় প্রভাবিত কিছু বিভ্রান্ত ব্যক্তিও নিজেদের আইনবহির্ভূত অপরাধকে ধর্মীয় আলখেল পরাতে পবিত্র ‘জিহাদ’ শব্দের অপব্যবহার করে থাকে।
কিন্তু ইসলামি শরিয়তের ইতিহাসে জিহাদের ধারণা কি এতটাই নৈরাজ্যমূলক ও সীমাহীন? ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে জিহাদ হলো অন্যায়ের মূলোৎপাটন এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পরিচালিত একটি সুশৃঙ্খল, আত্মশুদ্ধিমূলক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত প্রয়াস। শরিয়ত যখনই জুলুমের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার্থে সশস্ত্র প্রতিরোধের অনুমতি দিয়েছে, তখনই তার সাথে বেঁধে দিয়েছে কঠোর কিছু নৈতিক ও মানবিক সীমারেখা। যুদ্ধের মতো চরম পরিস্থিতিতেও নিরস্ত্র ও নিরীহ মানুষকে কীভাবে সুরক্ষা দিতে হয়, রাসুলুল্লাহ (সা.) তার স্পষ্ট সীমারেখা টেনে দিয়েছেন। সুনান আবি দাউদে হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) দিকনির্দেশনা দিয়ে বলেন:
انْطَلِقُوا بِاسْمِ اللَّهِ وَبِاللَّهِ وَعَلَى مِلَّةِ رَسُولِ اللَّهِ وَلاَ تَقْتُلُوا شَيْخًا فَانِيًا وَلاَ طِفْلاً وَلاَ صَغِيرًا وَلاَ امْرَأَةً وَلاَ تَغُلُّوا وَضُمُّوا غَنَائِمَكُمْ وَأَصْلِحُوا وَأَحْسِنُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
“তোমরা আল্লাহর নামে, আল্লাহর সাহায্যে এবং রাসুলুল্লাহর আদর্শের ওপর অগ্রসর হও। কোনো অতিবৃদ্ধ ব্যক্তি, কোনো দুগ্ধপোষ্য শিশু, অপ্রাপ্তবয়স্ক বালক কিংবা কোনো নারীকে হত্যা করবে না। গনিমতের সম্পদে খেয়ানত করবে না; বরং তা একত্রিত করবে। পরস্পর সংশোধন ও সমঝোতা বজায় রাখবে এবং সবার সাথে সদ্ব্যবহার করবে; নিশ্চয়ই আল্লাহ অনুগ্রহকারীদের ভালোবাসেন।” (সুনান আবি দাউদ: ২৬১৪)
একটি সম্মুখসমরের ময়দানেও যেখানে নারী, শিশু ও বার্ধক্যে উপনীত ব্যক্তিদের গায়ে হাত তোলা সম্পূর্ণ হারাম, সেখানে শান্তিকালীন সময়ে একটি বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে সাধারণ বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু বানানো কোনো বিচারেই ‘জিহাদ’ হতে পারে না। ইসলামি ফিকহের পরিভাষায় এটি স্পষ্ট ‘ফাসাদ ফিল আরদ’ (পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি) এবং চরম পর্যায়ের ‘হিরাবাহ’ (ত্রাস ও দস্যুতা)। ইসলামের সুমহান পরিভাষাকে এমন অন্ধ আত্মঘাতী হিংস্রতার সাথে যুক্ত করা শরিয়তের মূল স্পিরিটের ওপর এক চরম অবিচার।
‘আমানত’ রক্ষা ও পেশাগত সততার গুরুত্ব
ইসলাম ধর্ম কেবল আনুষ্ঠানিক উপাসনায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি ব্যক্তিজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে চুক্তি ও বিশ্বস্ততার পরীক্ষা নেয়। আধুনিক পেশাগত জীবনকে ইসলাম বিবেচনা করে এক মহতী দায় হিসেবে। একজন বৈমানিক যখন কোনো আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন ইসলামি পরিভাষায় তিনি যাত্রী, বিমান সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সাথে এক অখণ্ড ‘আমানত’ ও ‘আহদ’ (অঙ্গীকার)-এ আবদ্ধ হন।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্ট ভাষায় নির্দেশ দিয়েছেন:
“হে মুমিনগণ, তোমরা তোমাদের অঙ্গীকার ও চুক্তিগুলো পূর্ণ করো।” (সূরা আল-মায়িদাহ: ১)
ককপিটের নির্জনতায় বসে নিজের দায়িত্ব ভুলে সহকর্মীকে পেছন থেকে অতর্কিত আক্রমণ করা এবং যাত্রীদের আস্থাকে ধ্বংস করে দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে এক মারাত্মক ‘খিযানত’ বা আমানতের খেয়ানত। নবি করিম (সা.) চুক্তিভঙ্গ ও আমানতের খেয়ানতকে মুনাফেকির অন্যতম মূল লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ফিলিস্তিনের প্রতি আবেগপ্রবণ সমর্থন কিংবা ভূ-রাজনৈতিক শত্রুতার দোহাই দিয়ে এই প্রকাশ্য বিশ্বাসভঙ্গকে ইসলামি শরিয়তের কোনো ফতোয়া বা যুক্তিতে জায়েজ করার সুযোগ নেই।
মানবজীবনের সুরক্ষা (হিফজুন নফস)
ইসলামি আইনের মূল উদ্দেশ্যসমূহের (মাকাসিদ আশ-শারিয়াহ) অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো ‘হিফজুন নফস’—অর্থাৎ সার্বজনীন মানবজীবনের পবিত্রতা ও নিরাপত্তা রক্ষা করা। কোরআনের সেই চিরন্তন বাণী সকল মানবজাতির জন্য এক স্পষ্ট মূলনীতি ঘোষণা করে:
“যে ব্যক্তি কোনো অপরাধ বা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ছাড়া কাউকে হত্যা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকেই হত্যা করল। আর যে একটি প্রাণ রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকেই রক্ষা করল।” (সূরা আল-মায়িদাহ: ৩২)
বিমানে অবস্থানরত মানুষের ধর্ম, মতাদর্শ বা পাসপোর্টের রঙ যা-ই হোক না কেন, নিরস্ত্র ও বেসামরিক মানুষ হিসেবে তাদের জীবন রক্ষা করাই ছিল ওই বিমানের চালকদের ওপর ন্যস্ত প্রধান শরিয়াহসম্মত ও পেশাগত দায়িত্ব। ব্যক্তিগত আক্রোশ বা অন্ধ উন্মাদনার বশবর্তী হয়ে আকাশপথে শতাধিক মানুষের জীবন বিপন্ন করার চেষ্টা কোনো ধার্মিকতা নয়; বরং জীবনের মর্যাদা সমুন্নত রাখাই ইসলামের আদি ও অন্ত শিক্ষা।
বৈশ্বিক এভিয়েশন নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্ক্রিনিং
ঘটনাটির আরেকটি অত্যন্ত গুরুতর দিক হলো এভিয়েশন নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি। সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাবলিক প্রসিকিউটরের দেওয়া তথ্যানুসারে, অভিযুক্ত আল-হামামি স্বীকার করেছেন যে তিনি বিমানটি সরাসরি তেল আবিবের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর অথবা শহরের কোনো বহুতল স্কাইস্ক্র্যাপারে আছড়ে ফেলার পরিকল্পনা করেছিলেন। ২০১৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের আরএমআইটি (RMIT) বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকৌশলবিদ্যায় পড়ার সময় থেকেই তিনি উগ্রপন্থা ও সন্ত্রাসবাদের দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং ২০০১ সালের ৯/১১ হামলার আদলে এই পরিকল্পনার নকশা করেন। আরও জানা যায়, ওমান এয়ারে শিক্ষানবিস পাইলট হিসেবে কর্মরত অবস্থায় উগ্রবাদী উপাদানসহ ধরা পড়ায় ২০২৪ সালেই তাকে নিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে ফ্লাইং থেকে বাদ দিয়ে প্রশাসনিক ডেস্কে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তা সত্ত্বেও, সাধারণ ব্যাকগ্রাউন্ড চেকিং ও লাইসেন্স পরীক্ষার গলদের কারণে উগ্রপন্থার উপসর্গগুলো ঢাকা পড়ে যায় এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তিনি ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেন। এমনকি ওমানের মতো কূটনৈতিক সম্পর্কহীন দেশের নাগরিকদের ইসরায়েলি আকাশসীমায় উড্ডয়নে নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত ইসরায়েলি এভিয়েশন নিয়মও ফ্লাইদুবাই উপেক্ষা করেছিল। বর্তমানে সৌদি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আটক আল-হামামিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রত্যর্পণ করা হয়েছে, যেখানে তিনি সন্ত্রাসবাদ ও বিমান ছিনতাইয়ের আনুষ্ঠানিক মামলার মুখোমুখি। এই ঘটনার পর ফ্লাইদুবাই সাময়িকভাবে ইসরায়েলে তাদের ফ্লাইট স্থগিত করেছে।
ককপিটের ভেতর জরুরি অগ্নিনির্বাপণ বা উদ্ধারকাজের জন্য রাখা ‘ক্র্যাশ এক্স’ (কুড়াল)-কে যখন সহকর্মীর বিরুদ্ধেই প্রাণঘাতী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন তা প্রমাণ করে যে কেবল প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা দিয়ে আকাশপথ নিরাপদ রাখা যায় না। বিমানের পাইলটদের নিয়মিত মনস্তাত্ত্বিক মূল্যায়ন, গভীর ব্যাকগ্রাউন্ড ভেরিফিকেশন এবং কোনো ব্যক্তির ভেতর চরমপন্থা বা উগ্র মানসিকতার সামান্যতম লক্ষণ থাকলে তাকে যাত্রীবাহী বিমান থেকে স্থায়ীভাবে দূরে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
উপসংহার
ফ্লাইদুবাইয়ের এই শ্বাসরুদ্ধকর ঘটনাটি মুসলিম তরুণ ও সচেতন বিশ্বের সামনে আবেগ বনাম প্রজ্ঞার এক কঠিন আয়না তুলে ধরেছে। ফিলিস্তিনের মজলুম মানুষের ওপর চলা অব্যাহত অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের মানবিক সহানুভূতি, প্রার্থনা, নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক সমর্থন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবাদ সব সময়ই বজায় থাকবে। কিন্তু সেই ন্যায়ের সংগ্রাম যেন কখনোই অন্ধ আক্রোশ, আত্মঘাতী চরমপন্থা কিংবা চুক্তিভঙ্গের অন্ধকারে পথ না হারায়।
ইসলাম কোনো বিশৃঙ্খলা, সন্ত্রাস বা হঠকারিতার ধর্ম নয়; ইসলাম দাঁড়িয়ে আছে সুবিচার, মানবিক মূল্যবোধ, আমানত রক্ষা এবং প্রজ্ঞার ওপর। ককপিটে বসে নিরস্ত্র সহকর্মীকে রক্তাক্ত করে নিরপরাধ যাত্রীদের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে কোনো আদর্শ কায়েম করা যায় না। ধর্মের সুমহান নীতিকে চরমপন্থার অপব্যাখ্যা থেকে রক্ষা করা এবং যে কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পেশাগত আমানত ও মানবজীবন সুরক্ষার প্রতি অবিচল থাকাই একজন প্রকৃত মুমিনের আসল ঈমানি পরিচয়।