বিশ্ব পরিবেশ দিবসের বাণিজ্যিক পরিহাস: প্রাকৃতিক সম্পদের লুণ্ঠন, রাজনৈতিক ভণ্ডামি এবং ক্ষয়িষ্ণু নাগরিক চেতনার রাজনৈতিক অর্থনীতি

৫ই জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস সমকালীন বিশ্বে এক গভীর স্ববিরোধিতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষার স্লোগান, বৃক্ষরোপণের বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতা এবং কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (CSR) বিজ্ঞাপনী আড়ম্বরের আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকে এক নির্মম পুঁজিবাদী রাজনৈতিক অর্থনীতি। যে সমস্ত প্রাকৃতিক উপাদান—যেমন বিশুদ্ধ বাতাস, শব্দহীন শান্ত পরিবেশ, স্বাভাবিক জৈবিক ঘুম এবং উন্মুক্ত স্থানে হাঁটাচলা—মানব সভ্যতার আদিলগ্ন থেকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এবং সমানভাবে সকলের জন্য উন্মুক্ত ছিল, নব্য-উদারবাদী পুঁজিবাদ আজ সেগুলোকে কৃত্রিম সংকটের মাধ্যমে দুষ্প্রাপ্য করে তুলেছে। এই পরিকল্পিত ঘাটতি বা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির পর, সেই অভাবকেই বাজারজাত করে বিশ্বজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে এক বহু বিলিয়ন ডলারের তথাকথিত "ওয়েলনেস" (wellness) বা জীবনধারা শিল্প। পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা একদিকে সাধারণ মানুষকে তার প্রাকৃতিক সুস্থ পরিবেশ থেকে বঞ্চিত করছে, অন্যদিকে সেই বঞ্চিত মানুষের কাছেই ফিল্টার করা বাতাস, শব্দ-নিরোধক প্রযুক্তি, ঘুমের ট্র্যাকিং গ্যাজেট এবং হাঁটার জন্য যান্ত্রিক ট্রেডমিল চড়া দামে বিক্রি করে মুনাফা লুটছে। এই রূপান্তরটি কেবল অর্থনৈতিক শোষণ নয়, বরং এটি মানব অস্তিত্বের মৌলিক অনুভূতির একচেটিয়া পণ্যকরণ।

সংবেদনের পণ্যকরণ এবং ওয়েলনেস পুঁজিবাদের লোভী ব্যবসায়িক মডেল

আধুনিক পুঁজিবাদী অর্থনীতি আজ আর কেবল স্থূল পণ্য বা সেবা বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিলম্বিত পুঁজিবাদের (late capitalism) এই যুগে মানুষের সংবেদনশীল অভিজ্ঞতা ও অনুভূতিগুলোকে বাজারজাতকরণের আওতায় আনা হয়েছে, যাকে বিশ্লেষকেরা "সংবেদনের পণ্যকরণ" (commodification of sensation) বলে চিহ্নিত করেছেন। এই মডেলে, শারীরিক সুস্থতা এবং মানসিক শান্তিকে একটি সামাজিক অধিকার হিসেবে দেখার পরিবর্তে একটি ব্যক্তিগত ক্রয়ের বিষয় বা বিলাসী জীবনধারা হিসেবে রূপান্তর করা হয়, যা কেবল উচ্চবিত্তের আর্থিক সামর্থ্যের মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব।

বাতাসের বাণিজ্যিকীকরণ: ডিক্যাপ্রিওর আবাসন থেকে দিল্লির পে-টু-ব্রিদ অর্থনীতি

বিশুদ্ধ বায়ু মানুষের একটি মৌলিক ও অলঙ্ঘনীয় অধিকার হলেও আজ তা ধনীদের জন্য একটি প্রিমিয়াম পণ্যে পরিণত হয়েছে। হলিউডের বিখ্যাত পরিবেশবাদী অভিনেতা লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও নিউ ইয়র্ক সিটিতে একটি ১০ মিলিয়ন ডলারের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ক্রয় করেছেন, যা ডেলোস (Delos) নামক একটি ওয়েলনেস রিয়েল এস্টেট কোম্পানি দ্বারা নির্মিত। ডিক্যাপ্রিও নিজে এই কোম্পানির উপদেষ্টা এবং পরিচালনা পর্ষদের সদস্য। এই আবাসনে ২৪ ঘণ্টা ফিল্টার করা বিশুদ্ধ বাতাস চলাচল, ক্ষতিকারক জীবাণু ধ্বংস করার জন্য আল্ট্রাভায়োলেট লাইট সিস্টেম এবং শাওয়ারে ক্লোরিন গ্যাস নিঃশ্বাসের সাথে শরীরে প্রবেশ করা রোধ করতে ভিটামিন-সি ফিল্টার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ডিক্যাপ্রিওর মতো বৈশ্বিক পরিবেশবাদীরা যখন এই ধরণের কৃত্রিম জীবনযাপনের প্রচার করেন, তখন তা পরিবেশ সুরক্ষার সমষ্টিগত রাজনৈতিক লড়াইকে দুর্বল করে এক ধরণের ব্যক্তিগত ও পুঁজিবাদী সমাধানকেই উৎসাহিত করে। এটি মূলত ইঙ্গিত করে যে যৌথভাবে পৃথিবীর পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব নয়, তাই ব্যক্তিস্বার্থে সচ্ছল ব্যক্তিরা যেন কৃত্রিম বায়ুমণ্ডলের টিকিট কিনে নিজেদের সুরক্ষিত করেন।

এই একই নিষ্ঠুর বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয় ভারতের রাজধানী দিল্লিতে। যখন তীব্র ধোঁয়াশায় দিল্লির সাধারণ নাগরিকদের ফুসফুস বিষাক্ত গ্যাসে ভরে উঠছে, তখন দিল্লির ধনী এলাকায় "অক্সি পিউর" (Oxy Pure) নামক অক্সিজেন বার স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে ১৫ মিনিট সুগন্ধযুক্ত বিশুদ্ধ অক্সিজেন শ্বাস নেওয়ার জন্য সাধারণ মানুষকে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা (প্রায় ৪ থেকে ৭ ডলার) ব্যয় করতে হচ্ছে, যা ভারতের সাধারণ মেহনতি মানুষের গড় দৈনিক আয়ের চেয়েও বহুগুণ বেশি। ঠিক একইভাবে, বহুজাতিক কোম্পানি "ভাইটালিটি এয়ার" (Vitality Air) ক্যানাডার পাহাড়ের বাতাস বোতলে ভরে ভারতের বাজারে চড়া দামে বিক্রি করছে। করোনাকালীন বিপর্যয় এবং জলবায়ু সংকটের পর থেকে এই কৃত্রিম বায়ু পরিশোধনকারী এবং সৌন্দর্যবর্ধক বায়ু ফিল্টারের বাজার বৈশ্বিকভাবে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এটি এক বিপজ্জনক "পে-টু-ব্রিদ" (pay-to-breathe) বা শ্বাস ক্রয়ের অসম সমাজব্যবস্থা তৈরি করছে, যেখানে বাতাস আর বিনামূল্যে পাওয়া প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, বরং একটি সংরক্ষিত শ্রেণীগত অধিকার।

নীরবতার রূপান্তর: শ্রেণীভিত্তিক সংবেদনশীলতা এবং এএনসি প্রযুক্তি

শান্ত ও শব্দহীন পরিবেশ মানুষের স্নায়বিক সুস্থতার জন্য অত্যন্ত জরুরি। তবে পুঁজিবাদের অপরিকল্পিত নগরায়ন ও অনিয়ন্ত্রিত শব্দদূষণ শান্ত পরিবেশকে একটি দুষ্প্রাপ্য লাক্সারিতে পরিণত করেছে। নব্য-উদারবাদী সমাজে সংবেদনের এই শ্রেণীবিভাজন আজ অত্যন্ত স্পষ্ট। সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণী নিজেদের আর্থিক সামর্থ্য দিয়ে নীরবতা ক্রয় করতে পারে—তারা বিলাসবহুল শব্দ-নিরোধক অ্যাপার্টমেন্টে থাকে, ব্যক্তিগত গাড়িতে যাতায়াত করে এবং কোলাহলপূর্ণ পাবলিক স্পেসে নিজেদের কানকে সুরক্ষিত রাখতে অ্যাক্টিভ নয়েজ ক্যান্সেলেশন (ANC) প্রযুক্তিসম্পন্ন দামি এয়ারপড বা হেডফোন ব্যবহার করে। অন্যদিকে, সমাজের দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষেরা অবিরাম উচ্চ শব্দদূষণ, কারখানার কোলাহল এবং ঘিঞ্জি বসতির যন্ত্রণার মধ্যে জীবন কাটাতে বাধ্য হয়, যা তাদের দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ও শারীরিক অবসাদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতা ও সচেতন রাজনৈতিক প্রতিবাদ করার মানসিক শক্তিকে অবদমিত করে রাখার এক সূক্ষ্ম হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।

জৈবিক ঘুমের যান্ত্রিকীকরণ এবং স্লিপ ইকোনমি

ঘুম মানুষের জীবনের অন্যতম আদিম ও প্রাকৃতিক বিশ্রামের মাধ্যম, যা পুঁজিবাদী কর্মযজ্ঞ ও অবিরাম ভোগের বাইরে মানুষের এক স্বাধীন আশ্রয়স্থল ছিল। কিন্তু বর্তমান পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা এই মানুষের শেষ স্বাধীন অধিকারটিকেও গ্রাস করেছে। বৈশ্বিক "স্লিপ ইকোনমি" বা ঘুম অর্থনীতি ২০১৯ সালে ৪৩২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছিল, যা অতি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৫৮৫ বিলিয়ন ডলারে পরিণত হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় আজ "স্লিপম্যাক্সিং" (sleepmaxxing) নামক এক কৃত্রিম প্রতিযোগিতার প্রচার চলছে, যেখানে মানুষকে ভালো ঘুমের জন্য মুখের টেপ, বিশেষ সিল্কের বালিশের কভার (যা ২০২৩ সালেই প্রায় ৯৩৭ মিলিয়ন ডলারের বাজারে পরিণত হয়েছে), মেলাটোনিন সাপ্লিমেন্টস এবং ওউরা রিং (Oura ring)-এর মতো জটিল গ্যাজেটস কিনতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

একই সাথে, প্রযুক্তির চরম বিকাশ ঘটিয়ে মানুষের এই ঘুমের সময়টুকুকে কেড়ে নেওয়ার জন্য বিনোদন কোম্পানিগুলো কাজ করে চলেছে। উদাহরণস্বরূপ, নেটফ্লিক্সের প্রধান নির্বাহী ২০১৭ সালে গর্ব করে বলেছিলেন যে তাদের ব্যবসার প্রধান প্রতিযোগী কোনো অন্য স্ট্রিমিং সাইট নয়, বরং মানুষের "ঘুম", এবং তারা সেই লড়াইয়ে জয়ী হচ্ছেন। মানুষ যখন মোবাইল এবং ইন্টারনেটের আসক্তিতে প্রাকৃতিক ঘুম হারায়, তখন আবার সেই অনিদ্রাকে নিরাময়ের জন্য "ইনসোমনিয়া ইকোনমি" (insomnia economy) নামক আরও একটি ৬.৩ বিলিয়ন ডলারের বাজার তাদের সামনে প্রেসক্রিপশন নিয়ে হাজির হয়। মানুষের ক্লান্তি এবং বিশ্রামের মতো জৈবিক অনুভূতি আজ ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডের কিছু সংখ্যায় রূপান্তরিত হয়েছে, যা মানুষের নিজস্ব শারীরিক স্বজ্ঞাকে অবদমিত করে পুঁজিবাদী বাজারকে প্রসারিত করে।

প্রাকৃতিক হাঁটার অধিকার হরণ এবং আশি হাজার টাকার ট্রেডমিল

সম্ভবত পুঁজিবাদের সবচেয়ে বড় পরিহাস ফুটে ওঠে মানুষের সবচেয়ে প্রাচীন ও স্বাভাবিক দৈহিক ক্রিয়া—"হাঁটা"র ওপর আক্রমণের মধ্য দিয়ে। সৃষ্টির আদিলগ্ন থেকে মানুষ উন্মুক্ত রাস্তায়, মাঠের সবুজ ঘাসে বা বনের ছায়ায় হেঁটে নিজেদের সচল রেখেছে। কিন্তু বর্তমান নগরায়ন মডেল ফুটপাতগুলোকে দখল করে নিয়েছে, পার্ক ও উন্মুক্ত খেলার মাঠ ধ্বংস করে আকাশচুম্বী ভবন তৈরি করেছে এবং রাজপথগুলোকে মোটরযানের বিষাক্ত ধোঁয়া ও অনিয়ন্ত্রিত ট্রাফিকের নরকে পরিণত করেছে। ফলস্বরূপ, খোলা আকাশের নিচে সাধারণ মানুষের হাঁটার কোনো নিরাপদ বা স্বাস্থ্যকর স্থান আর অবশিষ্ট নেই।

যখন পুঁজিবাদী শহরগুলো মানুষের প্রাকৃতিক হাঁটার পথটি সম্পূর্ণ কেড়ে নিল, তখনই জিমনেশিয়াম ও ফিটনেস ইন্ডাস্ট্রিগুলো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের কোণে লোহার পাতের ওপর হাঁটার জন্য আশি হাজার বা তার চেয়েও বেশি ভারতীয় টাকার মূল্যের "ট্রেডমিল" নামক কৃত্রিম যন্ত্র বিক্রি করতে শুরু করল। যে হাঁটা ছিল সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উন্মুক্ত আকাশের নিচে পাওয়া এক শারীরিক আনন্দ, আজ তা জিমে চড়া মাসিক ফিস দিয়ে বা ড্রয়িংরুমে দামি যান্ত্রিক গ্যাজেটের সাহায্যে অর্জন করতে হচ্ছে। এই রূপান্তরটি প্রমাণ করে যে পুঁজিবাদ কীভাবে প্রথমে একটি প্রাকৃতিক ও বিনামূল্যে প্রাপ্য সুস্থতাকে অসম্ভব করে তোলে এবং পরে সেই সুস্থতাকেই একটি প্রিমিয়াম লাক্সারি হিসেবে পুনরায় উচ্চমূল্যে বিক্রি করে। এই চার প্রকার লুণ্ঠনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রূপটি নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:

প্রাকৃতিক ও আদিম মানবিক অধিকার

পুঁজিবাদী সংকটের উৎস

বাণিজ্যিকীকরণ ও কৃত্রিম প্রতিস্থাপন

অর্থনৈতিক মুনাফা ও বাজার মূল্য

বিশুদ্ধ বাতাস

কলকারখানা ও অপরিকল্পিত নির্মাণের ধোঁয়া, গাছ কাটা

হোম এয়ার ফিল্টার, স্মগ টাওয়ার, বোতলজাত বাতাস, অক্সিজেন বার

বৈশ্বিক এয়ার পিউরিফায়ার বাজার প্রায় $১৪ বিলিয়ন ; অক্সিজেন বারে ১৫ মিনিটের খরচ ₹৩০০-৫০০

নিস্তব্ধতা ও শান্তি

ট্রাফিক জ্যাম, কলকারখানা, অতিরিক্ত জনসংখ্যা, অপরিকল্পিত নগর উন্নয়ন

অ্যাক্টিভ নয়েজ ক্যান্সেলেশন (ANC) ডিভাইস, এএনসি এয়ারপড ও হেডফোন

প্রিমিয়াম লাক্সারি লাইফস্টাইল পণ্য এবং শ্রেণীর ভিত্তিতে সংবেদনের কিউরেশন

জৈবিক ঘুম ও বিশ্রাম

স্মার্টফোন স্ক্রিনের উজ্জ্বল আলো, অতিরিক্ত কাজের চাপ, প্রতিযোগিতামূলক সমাজ

ওউরা রিং, মেলাটোনিন সাপ্লিমেন্ট, বিশেষ স্লিপ পিলোকেস ও ট্র্যাকার

গ্লোবাল স্লিপ ইকোনমি $৫৮৫ বিলিয়ন ; অনিদ্রা দূরীকরণের বাজার ২০৩০ সালের মধ্যে $৬.৩ বিলিয়ন

হাঁটাচলা ও গতিশীলতা

ফুটপাত দখল, পার্কের বিনাশ, রাজপথে যানজট ও দূষণ

যান্ত্রিক ট্রেডমিল, ইনডোর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত জিম মেম্বারশিপ

ঘরোয়া অটোমেটিক ট্রেডমিলের আনুমানিক বাজার মূল্য ₹৫০,০০০ থেকে ₹৮০,০০০ বা তার বেশি

দ্বি-মুখী শাসনতান্ত্রিক ব্যর্থতা: কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের পরিবেশগত দেউলিয়াত্ব

ভারতবর্ষের দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র—দিল্লি এবং কলকাতার পরিবেশগত বিপর্যয় এবং কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সার্বিক চিত্রটি লক্ষ্য করলে এক ভয়াবহ ও লজ্জাজনক শাসনতান্ত্রিক ব্যর্থতার রূপটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কেন্দ্র ও রাজ্য স্তরের কোনো সরকারই পরিবেশের কাঠামোগত সুরক্ষার ব্যাপারে কোনো আন্তরিক দূরদর্শিতা দেখাতে পারেনি।

দিল্লির চরম স্বাস্থ্য বিপর্যয় এবং রাজনৈতিক পরিহাসের রাজনীতি

দিল্লির বায়ুদূষণ যখন প্রতি বছর শীতকালে এক অসহনীয় মাত্রা স্পর্শ করে এবং বাতাসে ধূলিকণার পরিমাণ (PM2.5) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত নিরাপদ সীমার চেয়ে প্রায় বিশ থেকে ত্রিশ গুণ ছাড়িয়ে যায়, তখন নীতি-নির্ধারক ও রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিক্রিয়া সাধারণ নাগরিকদের সাথে এক নিষ্ঠুর তামাশার মতো শোনায়।

২০১৯ সালের দিল্লির তীব্রতম বায়ু সংকটের সময় তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডঃ হর্ষ বর্ধন (যিনি নিজে একজন পেশাদার চিকিৎসক) জনগণকে দূষণ থেকে বাঁচতে প্রচুর পরিমাণে "গাজর ও ব্রকোলি" খাওয়ার মতো চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং অবৈজ্ঞানিক পরামর্শ দেন। একই সময়ে তৎকালীন কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রী প্রকাশ জাভড়েকর জনগণের তীব্র ক্ষোভের মুখে দাঁড়িয়ে তাদের সকালবেলা ধ্রুপদী "সেতার ও বীণার সুর" শুনে দিন শুরু করার টুইট করেন। এই ধরণের আচরণ প্রমাণ করে যে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারগুলো কীভাবে কাঠামোগত এবং প্রযুক্তিগত সংস্কার করার পরিবর্তে জনগণের ওপরেই তাদের বেঁচে থাকার ব্যক্তিগত দায় চাপিয়ে দেয়।

একই সাথে, সরকারের ভণ্ডামির সবচেয়ে কুৎসিত দিকটি উন্মোচিত হয় যখন জানা যায় যে সাধারণ মানুষকে দূষিত বায়ুর নরকে ফেলে রেখে দিল্লির সচিবালয়, সংসদ ভবন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের কক্ষ এবং মন্ত্রীদের বাংলোগুলোতে সাধারণ করদাতার টাকায় লাখ লাখ মূল্যের অত্যন্ত দামি পিউরিফায়ার বসানো হয়েছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন দূষণ প্রতিরোধের ওপর ভাষণ দেন, তখন তাঁর পেছনে স্বয়ংক্রিয় উচ্চ ক্ষমতার এয়ার পিউরিফায়ার সচল থাকে।

এর পাশাপাশি, দিল্লি ও কেন্দ্র সরকারের আরেকটি বড় ব্যর্থতা হলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং অকেজো "স্মগ টাওয়ার" ও "আউটডোর এয়ার পিউরিফায়ার" স্থাপন করা। আনন্দ বিহার আইএসবিটি বা লোধি রোডের মতো জায়গায় কোটি কোটি টাকা খরচ করে যে আউটডোর ফিল্টারগুলো বসানো হয়েছিল, কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে সেগুলো সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে এবং ওই এলাকাগুলোর বায়ু মানের কোনো টেকসই উন্নতি ঘটাতে পারেনি। বৈজ্ঞানিক মহলের মতে, উৎস স্তরে ধোঁয়া নির্গমন (vehicle emissions, industrial smoke) না কমিয়ে উন্মুক্ত আকাশে বায়ু ফিল্টার চালানো আর সমুদ্রের জল চামচ দিয়ে পরিষ্কার করার চেষ্টা করা একই বিষয়। তদুপরি, একশ্রেণীর উগ্র সামাজিক সমর্থকগোষ্ঠী দীপাবলির মতো ধর্মীয় উৎসবগুলোর সময় নির্বিচারে ক্ষতিকর বাজি পোড়ানোকে সমর্থন করে এবং দূষণের বিরুদ্ধে সাধারণ নাগরিকদের প্রতিবাদকে "ধর্মীয় ঐতিহ্য ধ্বংসের আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র" বলে সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করে, যা এই চরম জনস্বাস্থ্য সংকটকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।

কলকাতার সবুজ বিনাশ ও ধাপা ল্যান্ডফিলের চিরস্থায়ী নরক

পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার পরিবেশগত পরিস্থিতিও একই ধরণের উদাসীনতা এবং ক্ষতিকারক নগর পরিকল্পনার শিকার। অরণ্য সমীক্ষা রিপোর্ট ২০২১ (ISFR 2021) অনুযায়ী, কলকাতা মহানগরী ২০১১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে তার অরণ্য ও সবুজ আচ্ছাদনের ৩০ শতাংশ হারিয়েছে। শহরের মোট আয়তনের মাত্র ০.৯৫ শতাংশ স্থান এখন সবুজ হিসেবে অবশিষ্ট রয়েছে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারিত পরিবেশগত ভারসাম্যের চেয়ে বহু নিচে।

মেট্রো রেলের কাজ, উড়ালপুল নির্মাণ এবং রিয়েল এস্টেটের বহুতল আবাসন প্রকল্পের নামে যেভাবে অবাধে শহরের শতাব্দী প্রাচীন গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে, তার প্রত্যক্ষ প্রভাবে কলকাতা আজ এক "আর্বান হিট আইল্যান্ড" (Urban Heat Island - UHI)-এ পরিণত হয়েছে। উপগ্রহ চিত্র এবং ভূ-স্থানিক বিশ্লেষণ নির্দেশ করে যে ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে কলকাতা মেট্রোপলিটন এলাকায় গাছপালা হ্রাস পেয়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ এবং কংক্রিটের নির্মিত এলাকা বেড়েছে ১৮৫.৯৪ শতাংশ, যার ফলস্বরূপ কলকাতার গড় তাপমাত্রা বিগত দুই দশকে প্রায় ২৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কার্বন নির্গমন বৃদ্ধি পেয়েছে ১৮৮.২৯ শতাংশ।

কলকাতার এই পরিবেশগত সংকটের আরও একটি চরম জ্বলন্ত ক্ষত হলো পূর্ব কলকাতার "ধাপা ল্যান্ডফিল"। প্রতিদিন কলকাতা পুরসভা (KMC) শহরের ৪.৫ মিলিয়ন মানুষের উৎপাদিত প্রায় ৪০০০ মেট্রিক টন কঠিন বর্জ্য কোনো স্যানিটারি লাইনার বা লিচেট নিষ্কাশন ব্যবস্থা ছাড়াই খোলা অবস্থায় ধাপায় স্তূপাকার করে ফেলে। এই বিশাল ময়লার পাহাড়ে স্থায়ীভাবে জ্বলতে থাকা মিথেন গ্যাসের আগুন প্রতিনিয়ত বাতাসে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী ধোঁয়া ছড়াচ্ছে। মাটির নিচে চুইয়ে পড়া বর্জ্যের বিষাক্ত জল বা লিচেট ভূগর্ভস্থ জলস্তরকে ক্রোমিয়াম, সিসা এবং ক্যাডমিয়াম দিয়ে স্থায়ীভাবে দূষিত করছে।

সবচেয়ে মারাত্মক ও কুখ্যাত বিষয় হলো, কলকাতার বাজারগুলোতে বিক্রি হওয়া সিংহভাগ শাকসবজি ধাপা ল্যান্ডফিলের বিষাক্ত নোংরা জলে এবং সস্তার আবর্জনা মিশ্রিত মাটিতে চাষ করা হয়, যা সাধারণ মানুষের দেহে ক্যান্সার ও যকৃতের মতো মারণব্যাধি ছড়াচ্ছে। পুরসভা ফান্ডের অভাব এবং অপরিকল্পিত নীতির অজুহাত দেখিয়ে এই বৈজ্ঞানিক উপায়ে বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণের দায়িত্ব এড়িয়ে গেছে, যা নাগরিক স্বাস্থ্যের ওপর এক রাষ্ট্রীয় অপরাধের সমান।

নাগরিক সমাজের ক্ষয়িষ্ণু দায়িত্ববোধ এবং সামাজিক উদাসীনতা

পরিবেশের এই ধ্বংসলীলার জন্য কেবল সরকার বা পুঁজিবাদী সংস্থাকে দায়ী করলে সত্যের এক অংশ উহ্য থেকে যায়। ভারতবর্ষের সাধারণ নাগরিক সমাজের মধ্যে তীব্র সাধারণ শিষ্টাচার এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের অভাব (zero civic sense) এই সংকটকে বহুগুণ আশঙ্কাজনক করে তুলেছে। রাস্তায় চলার সময় যেখানে-সেখানে থুতু ও পানের পিক ফেলা, প্লাস্টিক বোতল, চিপসের প্যাকেট এবং নোংরা আবর্জনা হাতের কাছে ডাস্টবিন থাকা সত্ত্বেও ফুটপাতে বা খোলা ড্রেনে ছুঁড়ে ফেলা আজ এক স্বাভাবিক সামাজিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। নাগরিকদের এই চরম সামাজিক উদাসীনতার মারাত্মক রূপটি প্রকাশ পায় কলকাতার সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজার দিনগুলোতে। পূজার ক'দিনে কলকাতায় দৈনিক বর্জ্য উৎপাদনের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১,০০০ টন বৃদ্ধি পেয়ে দৈনিক অন্তত ৫,৫০০ টনে পৌঁছায়।

পূজার প্যান্ডেলগুলোর চারপাশে এবং অস্থায়ী খাবারের দোকানগুলোতে বর্জ্য পৃথকীকরণের কোনো নূন্যতম পরিকাঠামো বা নাগরিকদের সচেতনতা থাকে না। প্লাস্টিকের গ্লাস, প্লেট এবং খাবারের অবশিষ্টাংশ একসাথেই রাস্তার ওপর ফেলে দেওয়া হয়। আইআইটি খড়গপুরের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যের অবশিষ্টাংশ মিশ্রিত নোংরা প্লাস্টিকগুলো রাসায়নিকভাবে এত বেশি দূষিত হয়ে পড়ে যে পরবর্তীতে রিসাইক্লিং শিল্পের পক্ষে সেগুলো ব্যবহার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এই বর্জ্যগুলো পরবর্তীতে ড্রেনের ম্যানহোলগুলো বন্ধ করে দেয়, যার ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই শহর জুড়ে নরক গুলজার পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সাধারণ নাগরিকরা নিজেদের অধিকারের ব্যাপারে অত্যন্ত সোচ্চার হলেও, পরিবেশের মতো সমষ্টিগত ভালো থাকার বিষয়ে তাঁদের ব্যক্তিগত দায়িত্বের ক্ষেত্রে এক সম্পূর্ণ নৈরাজ্যবাদী মনোভাব প্রদর্শন করেন।

টেকসই মুক্তির পথ: নীতিগত সংস্কার ও কাঠামোগত সমাধান

এই দমবন্ধ করা পরিবেশগত বিপর্যয় এবং পুঁজিবাদের শোষণ চক্র থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের ক্ষণস্থায়ী জোড়াতালি সমাধানের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদী বৈজ্ঞানিক সংস্কার এবং কঠোর আইনি শাসন কায়েম করতে হবে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ভারতের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন শহর ইন্দোর মডেলের সফল অনুকরণ

মধ্যপ্রদেশের ইন্দোর শহরটি আজ সারা ভারতের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এক জাদুকরী ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। কলকাতা এবং দিল্লির মতো বড় শহরগুলোতে অবিলম্বে ইন্দোরের এই সফল মডেলটি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা উচিত:

  • শতভাগ গৃহস্থালি স্তরে ছয়-স্তরের বর্জ্য পৃথকীকরণ (Six-way Source Segregation): ইন্দোরের প্রতিটি বাড়ির বাসিন্দারা নিজেদের রান্নাঘরেই ভেজা ময়লা (জৈব বর্জ্য), শুকনো ময়লা, ক্ষতিকর স্যানিটারি বর্জ্য, গৃহস্থালির বিপজ্জনক রাসায়নিক বর্জ্য এবং প্লাস্টিক সম্পূর্ণ আলাদা আলাদা বিনে জমা করেন। পুরসভার কর্মীরা প্রতিদিন সকালে বিশেষভাবে বিভক্ত গাড়ির (partitioned tippers) মাধ্যমে এই আলাদা বর্জ্য আলাদাভাবে সংগ্রহ করেন।
  • সম্পূর্ণ বৃত্তাকার অর্থনীতি প্ল্যান্ট (Circular Economy Integration): ভেজা জৈব বর্জ্যকে সেন্ট্রালাইজড এবং ডিসেন্ট্রালাইজড এরোবিক কম্পোস্টিং প্ল্যান্টে পাঠিয়ে উচ্চমানের জৈব সার এবং সিএনজি গ্যাসে রূপান্তরিত করা হয়। শুকনো বর্জ্যগুলোকে ম্যাটেরিয়াল রিকভারি ফ্যাসিলিটিতে (MRF) পাঠিয়ে আধুনিক সর্টিং মেশিনের মাধ্যমে ভাগ করে রিসাইক্লিং শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে বিক্রি করা হয়।
  • ল্যান্ডফিলের সম্পূর্ণ বায়ো-মাইনিং (Bio-mining of Legacy Waste): ধাপার মতো ঐতিহ্যবাহী ল্যান্ডফিলগুলোতে জমে থাকা বহু বছরের ময়লার স্তূপ দূর করতে ইন্দোর বিজ্ঞানসম্মত বায়ো-মাইনিং পদ্ধতি ব্যবহার করেছে, যা মাটির নিচে ক্ষতিকর রাসায়নিক চুঁইয়ে যাওয়া বন্ধ করে এবং মুক্ত জমিকে পুনরায় বনায়ন বা সুন্দর উদ্যানে রূপান্তর করে।

পশ্চিমবঙ্গের জরিমানা আইন, 'স্বচ্ছ' অ্যাপের কঠোর প্রয়োগ এবং মিয়াওয়াকি বনায়ন

পশ্চিমবঙ্গের পৌর বিষয়ক দপ্তর যে ১লা সেপ্টেম্বর থেকে যত্রতত্র আবর্জনা ফেলা ও রাস্তায় থুতু ফেলার বিরুদ্ধে মিউনিসিপ্যাল অ্যাক্টের অধীনে কড়া আর্থিক জরিমানা আরোপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয় হলেও এর প্রয়োগে কঠোরতা প্রয়োজন :

  • পরিকাঠামো নির্মাণ ও নজরদারি: জরিমানা কার্যকর করার আগে প্রতিটি পুরসভা এলাকায় প্রতি ১০০ মিটার অন্তর আলাদা ভেজা ও শুকনো ময়লা ফেলার ডাস্টবিন স্থাপন করতে হবে। শহরের ব্যস্ত মোড়গুলোতে সিসিটিভি নজরদারি বসিয়ে আইন অমান্যকারীদের চিহ্নিত করতে হবে।
  • জিও-ট্যাগড 'স্বচ্ছ' অ্যাপের ব্যবহার: রাজ্য সরকার প্রবর্তিত 'স্বচ্ছ' মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকরা শহরের যেকোনো স্থানে আবর্জনা জমে থাকার ছবি তুলে আপলোড করলে স্বয়ংক্রিয় জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে স্থানীয় পুরসভার দলকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তা পরিষ্কার করতে বাধ্য করতে হবে এবং এই কাজের গাফিলতির ওপর পুরসভার কর্মীদের বিভাগীয় শাস্তির বিধান রাখতে হবে।
  • মিয়াওয়াকি (Miyawaki) পদ্ধতিতে নগর বনায়ন: কলকাতার হারানো সবুজ ৩০ শতাংশ ফিরিয়ে আনতে বিশ্বখ্যাত মিয়াওয়াকি বনায়ন পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। জাপানি উদ্ভিদবিদ আকিরা মিয়াওয়াকি প্রবর্তিত এই পদ্ধতিতে অত্যন্ত কাছাকাছি ঘন আকারে দেশীয় প্রজাতির গাছ রোপণ করা হয়, যা সাধারণ বনের তুলনায় ১০ গুণ দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং ৩০ গুণ বেশি ঘন সবুজ ছাউনি তৈরি করে। এটি কলকাতার মতো ঘিঞ্জি শহরের স্বল্প পরিসরে আর্বান হিট আইল্যান্ডের প্রভাব কমাতে এবং ধূলিকণা শোষণ করে ফুসফুসের মতো কাজ করতে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হতে পারে।

উপসংহার: সমষ্টিগত প্রতিরোধের আহ্বান

বিশ্ব পরিবেশ দিবস কেবল গাছ লাগানোর একটি আনুষ্ঠানিক দিন নয়; এটি আমাদের বেঁচে থাকার অধিকারকে পুঁজিবাদের গ্রাস থেকে মুক্ত করার এক রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রতীক। যখন পুঁজিবাদের লোভী ও নিষ্ঠুর ব্যবসায়িক মডেল মানুষকে তাদের আদিমতম অধিকার—বিশুদ্ধ বাতাস, নীরবতা, শান্ত ঘুম এবং মুক্ত রাস্তায় হাঁটার অধিকার থেকে পরিকল্পিতভাবে বঞ্চিত করে কোটি কোটি টাকার ওয়েলনেস পণ্য বিক্রি করে, তখন তা মানব সভ্যতার এক চরম পরাজয়কে নির্দেশ করে। এই পরাজয় থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের একদিকে যেমন কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের শাসনতান্ত্রিক চরম ব্যর্থতা, করদাতার টাকার অপচয় ও বৈজ্ঞানিক অজ্ঞতাকে রাজনৈতিকভাবে কাঠামোগত প্রশ্নের মুখোমুখি করতে হবে, অন্যদিকে সাধারণ নাগরিকদের নিজেদের নূন্যতম সামাজিক শিষ্টাচার ও উৎস স্তরে আবর্জনা পৃথকীকরণের মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। প্রকৃতি আমাদের বিনামূল্যে যে অমূল্য সম্পদ উপহার দিয়েছিল, তা যেন কোনো কর্পোরেট হাউজের প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন মডেলে রূপান্তরিত না হয়—এই বিশ্ব পরিবেশ দিবসে নাগরিক সমাজের জন্য এটিই হোক প্রধান অঙ্গীকার।

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter