প্রফেসর কে. আলীকুট্টি মুসলিয়ার: পাণ্ডিত্য, সমাজসেবা ও নীরব নেতৃত্বের এক অনন্য জীবন
পরিচিতি
ইসলামী জ্ঞান, সমাজ সংস্কার এবং শিক্ষা বিপ্লবের ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাঁদের অবদান কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চল বা সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভারতের কেরালা রাজ্যের সুন্নি মুসলিম সম্প্রদায়ের আধুনিক ইতিহাসে অধ্যাপক কে. আলিকুট্টি মুসলিয়ার ছিলেন এমনই একজন স্বল্পায়ু ও প্রতিভাবান আলেম। ৮১ বছর বয়সে, ২০২৬ সালের ২৩শে জুলাই তাঁর মৃত্যু কেরালার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার এক দীর্ঘ ও স্বর্ণযুগের অধ্যায়ের অবসান ঘটায়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি দক্ষিণ ভারতের ঐতিহ্যবাহী সংগঠন ‘সমস্তা কেরালা জামিয়াতুল উলামা’ (সংক্ষেপে ‘সমস্তা’ নামে পরিচিত)-এর সাধারণ সম্পাদক এবং বিখ্যাত ‘জামিয়া নুরিয়া আরবি কলেজ’-এর অধ্যক্ষ (শাইখুল জামিয়া) হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
একাধারে তিনি ছিলেন একজন দরদী শিক্ষক, দূরদর্শী কাজী, সফল লেখক, সম্পাদক এবং নিবেদিতপ্রাণ জনসেবক। তাঁর কাজের পরিধি স্থানীয় মহল্লার ক্ষুদ্র গণ্ডি থেকে শুরু করে সর্বভারতীয় পর্যায় এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বের স্কলারলি সম্মেলন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তবে কেবল পদে আসীন থাকা বা পদমর্যাদার দীর্ঘ তালিকা দিয়ে তাঁর অর্জনের সঠিক মূল্যায়ন সম্ভব নয়। আলীকুট্টি মুসলিয়ার ছিলেন কেরালার সেই ব্যতিক্রমী প্রজন্মের আলেমদের অন্তর্ভুক্ত, যারা নিজেদের বুনিয়াদ তৈরি করেছিলেন ঐতিহ্যবাহী ‘দেরস’ (মসজিদভিত্তিক শিক্ষা) ব্যবস্থায়, কিন্তু পরবর্তীতে পরিবর্তিত সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিক কলেজ, প্রশাসনিক কমিটি, গবেষণা প্রকাশনা ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সমাজকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ঐতিহ্যবাহী ধারাকে বিন্দুমাত্র বিসর্জন না দিয়েও কীভাবে সময়ের প্রাতিষ্ঠানিক চাহিদার সাথে মেলবন্ধন ঘটানো যায়, তা তিনি নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন।
ঐতিহ্যবাহী ‘দেরস’ সংস্কৃতিতে গড়ে ওঠা শিক্ষা
আলীকুট্টি মুসলিয়ার ১৯৪৫ সালে কেরালার মালাপ্পুরম জেলার ইরুম্পুঝি থেক্কুম্মুরিতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন কুন্নথ মুসা হাজী এবং মা মাদাম্বি ইয়াতুট্টি। পারিবারিকভাবেই তিনি এক ধর্মীয় ও জ্ঞান চর্চার পরিবেশ পেয়েছিলেন। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষার সূচনা ঘটেছিল তাঁর দাদা কুন্নথ আলী হাজীর হাতে। পারিবারিক পাঠ শেষে তিনি কেরালার শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী মসজিদভিত্তিক ‘দেরস’ শিক্ষাব্যবস্থায় প্রবেশ করেন। সেখানে তৎকালীন সময়ের বহু নামকরা ও বিজ্ঞ শিক্ষকদের সান্নিধ্যে এসে তিনি ইসলামী শরীয়াহর বিভিন্ন শাখায় গভীর জ্ঞান অর্জন করেন।
পরবর্তীতে ১৯৬৪ সালে তিনি কেরালার উচ্চতর দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘জামিয়া নূরিয়া এরাবিক কলেজ’-এ যোগদান করেন। তাঁর শিক্ষাজীবনে ও মেধা গঠনে ভূমিকা রাখা প্রখ্যাত ওলামাদের মধ্যে ছিলেন পেরিনথালমান্না সাইথালী মুসলিয়ার, ভালাপুরম কে. টি. মুহাম্মদ মুসলিয়ার, আব্দুল কাদের মুসলিয়ার, পেরুম্বালাম বাপুত্তি মুসলিয়ার, থেঝাক্কোড কুঞ্জালভি মুসলিয়ার, ‘শামসুল ওলামা’ ই. কে. আবু বকর মুসলিয়ার এবং কোট্টুমালা আবু বকর মুসলিয়ার। এদের সান্নিধ্যে থেকে তিনি ১৯৬৮ সালে জামিয়া নূরিয়া থেকে সম্মানজনক ‘ফৈজি’ কোর্স বা ডিগ্রি সফলতার সাথে সম্পন্ন করেন।
তরুণ বয়সেই তাঁর ওপর অনেক বড় বড় সামাজিক দায়িত্ব অর্পিত হতে শুরু করে। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, কিশোর বয়সেই তিনি তিরুরক্কাড মহল্লা মসজিদের ‘খতিব’ হিসেবে দায়িত্ব পান এবং মাত্র বিশ বছর বয়সের কাছাকাছি সময়ে সেখানকার ‘কাজী’ নিযুক্ত হন। কেরালার ‘মহল্লা’ প্রশাসনিক কাঠামোয় কাজী বা খতিবের দায়িত্ব কেবল আনুষ্ঠানিকতা বা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সেখানে একজন কাজীকে জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং সামাজিক বিচক্ষণতার সমন্বয় ঘটাতে হয়। নামাজের ইমামতি ও শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের পারিবারিক বিরোধ মেটানো, পরামর্শ দেওয়া এবং দৈনন্দিন জীবনের জটিল প্রশ্নের সমাধান করতে হয়। অল্প বয়সের এই অভিজ্ঞতা তাঁর পরবর্তী জীবনের প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক নেতৃত্বের বুনিয়াদ শক্তভাবে গড়ে তুলেছিল।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কেন্দ্রে এক আদর্শ শিক্ষক
উচ্চতর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর আলীকুট্টি মুসলিয়ার নিজেকে সম্পূর্ণরূপে জ্ঞানদান ও শিক্ষকতার মহান পেশায় নিয়োজিত করেন। তিনি প্রথমে মীনারকুঝি দেরসে এবং পরবর্তীতে চেম্মঙ্কদভুতে শিক্ষক হিসেবে সেবা প্রদান করেন। ১৯৭৯ সালে তিনি স্বীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামিয়া নূরিয়ায় শিক্ষক হিসেবে ফিরে আসেন। দীর্ঘ শিক্ষকতার পর, ২০০৩ সালে তিনি এই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ (প্রিন্সিপাল) হিসেবে নিযুক্ত হন এবং ‘শাইখুল জামিয়া’ খেতাবে ভূষিত হন। যে প্রতিষ্ঠানে তিনি একসময় ছাত্র হিসেবে গভীর মনোযোগে পড়াশোনা করেছিলেন, সেই প্রতিষ্ঠানই পরবর্তীতে তাঁর হাত ধরে শত শত আলেম গড়ার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।
কেরালার সুন্নি মুসলিমদের উচ্চতর শিক্ষার বিকাশে জামিয়া নূরিয়ার স্থান অত্যন্ত উঁচুতে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং অধ্যক্ষ হিসেবে এই প্রতিষ্ঠানের সাথে তাঁর পথচলা ছিল প্রায় পাঁচ দশকের। এত দীর্ঘ যোগাযোগের কারণে প্রশাসনিক ফাইলের বাইরে গিয়েও তিনি প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ, দেরসের পাঠদান এবং শিক্ষক-ছাত্রের আত্মিক সম্পর্কের গভীরতা বুঝতেন।
তাঁর এই দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন ব্যাখ্যা করে যে, কেন কেবল আধুনিক ‘প্রফেসর’ উপাধি দিয়ে তাঁর পাণ্ডিত্যের পরিচয় শেষ করা যায় না। তিনি কেবল এক আধুনিক কলেজের লেকচারার ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন ঐতিহ্যবাহী ‘মুদাররিস’ যাদের পাঠদান পদ্ধতি গড়ে ওঠে মূল গ্রন্থের গভীর পঠন, মৌখিক ব্যাখ্যা এবং শিক্ষকের সাথে শিক্ষার্থীর সার্বক্ষণিক বুদ্ধিবৃত্তিক সহচর্যের মাধ্যমে। একই সাথে তিনি এমন এক প্রতিষ্ঠানের হাল ধরেছিলেন, যার গ্র্যাজুয়েটরা পরবর্তীতে ভারত ও বিদেশের বিভিন্ন মসজিদ, কলেজ, সামাজিক সংস্থা ও শিক্ষা উদ্যোগে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
কেরালার ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানচর্চা যখন প্রবাসীদের অভিবাসনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত হচ্ছিল, তখন জামিয়া নূরিয়া এবং এর প্রাক্তন ছাত্র সংগঠন ‘ওসফোজানা’-র প্রধান হিসেবে আলীকুট্টি মুসলিয়ার দেশীয় শিকড়যুক্ত এই শিক্ষা ঐতিহ্যকে মধ্যপ্রাচ্য সহ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসীদের সাথে সংযুক্ত করতে বিশেষ অবদান রাখেন।
সংগঠক থেকে সাধারণ সম্পাদক
সংগঠক হিসেবে আলীকুট্টি মুসলিয়ারের উত্থান ঘটেছিল অত্যন্ত ধীর গতিতে ও সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায়। ১৯৮৬ সালে তিনি ‘সামাস্তা’-এর কেন্দ্রীয় সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী পর্ষদ ‘মুশাওয়ারা’-য় অন্তর্ভুক্ত হন। এরপর ১৯৯২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ দুই দশক তিনি ‘সুন্নি যুবজন সংঘ’-এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব দক্ষতার সাথে পালন করেন। ২০১০ সালে তিনি সামাস্তা-এর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হন এবং ২০১৬ সালে চেরুসেরি জাইনুদ্দিন মুসলিয়ারের ওফাতের পর তিনি সামাস্তা-এর ৫ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এর পাশাপাশি তিনি সামাস্তা এডুকেশন বোর্ড, সুন্নি মহল্লা ফেডারেশন এবং ২০১৩ সালে কাসারগোদ ইউনাইটেড জামায়াতের কাজী হিসেবে দায়িত্ব নেন।
এই বহুবিধ পদমর্যাদা তাঁকে পাণ্ডিত্য, শিক্ষা বিস্তার এবং সামাজিক প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে এনে দাঁড় করিয়েছিল। সামাস্তা কেবল ফতোয়া বা ধর্মীয় নির্দেশনা দেওয়ার কোনো সংস্থা নয়; এর সাথে জড়িয়ে আছে হাজার হাজার মাদ্রাসা, কলেজ, মহল্লা এবং সামাজিক কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের বিশাল নেটওয়ার্ক। ফলে এর সাধারণ সম্পাদককে একদিকে ধর্মীয় শিক্ষার বিশুদ্ধতা রক্ষা করতে হয়, অন্যদিকে বিশাল প্রশাসনিক বাস্তবতার সাথে সমন্বয় সাধন করতে হয়।
যাঁরা তাঁর সাথে কাজ করেছেন, তারা সবসময় তাঁর শান্ত মেজাজ, মেপে কথা বলার অভ্যাস এবং সবার সাথে পরামর্শ করার মানসিকতার প্রশংসা করেছেন। সামাস্তা সভাপতি সৈয়দ মুহাম্মদ জিফরি মুথুক্কোয়া তাঙাল তাঁর প্রয়াণের পর স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেন যে, আলীকুট্টি মুসলিয়ার ছিলেন এমন এক অভিভাবক যিনি যেকোনো কঠিন সংকটে সংস্থার নীতি ও আদর্শ রক্ষায় দৃঢ় ঢাল হিসেবে দাঁড়িয়েছেন, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে সবসময় বিনয়ী ও পরিপক্ক ছিলেন।
আজকের দ্রুতগতির যুগে যখন প্রকাশ্য আলোচনায় সস্তা জনপ্রিয়তার চর্চা দেখা যায়, তখন আলীকুট্টি মুসলিয়ার ছিলেন অন্য এক আদর্শের প্রতীক। তিনি গভীর চিন্তাভাবনার পর কথা বলতেন, প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস সংরক্ষণ করতেন এবং নিজের জ্ঞান ও ন্যায়ের ওপর ভিত্তি করে প্রভাব বিস্তার করতেন।
জনসেবার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান সবচেয়ে উজ্জ্বল ছিল হজ ব্যবস্থাপনায়। ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি কেরালা রাজ্য হজ কমিটির চেয়ারম্যান এবং ২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সর্বভারতীয় হজ কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন কেরালা হজ কমিটির ইতিহাসে প্রথম অ-মন্ত্রী চেয়ারম্যান। এই দায়িত্ব পালনে কেবল ধর্মীয় জ্ঞান নয়, বরং সরকারি সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বয় এবং হজযাত্রীদের ব্যবহারিক কষ্ট লাঘবের প্রশাসনিক দক্ষতার প্রয়োজন ছিল। এছাড়া তিনি অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড এবং রাজ্য এতিমখানা কমিটির সাথেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে কেরালার পাণ্ডিত্য
আলীকুট্টি মুসলিয়ারের যোগ্যতার স্বাক্ষর কেবল কেরালার মাটিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, তা আন্তর্জাতিক স্তরেও ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। মালায়লাম ভাষার বিভিন্ন পুস্তিকা অনুযায়ী, তিনি সৌদি আরব, মিশর, লিবিয়া, ইরাক, তুরস্ক, মরক্কো, সেনেগাল এবং মালয়েশিয়ার মতো বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
১৯৮৬ সালে হায়দ্রাবাদে লিবিয়ান দূতাবাস আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে তিনি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। পরবর্তীতে তিনি ইরাকের কুফায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন। ২০১৫ সালে মক্কা এবং মালয়েশিয়ার সারাওয়াকে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ফিকহ সম্মেলনেও তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। লিবিয়া, মরক্কো ও সেনেগালে অনুষ্ঠিত কনফারেন্সগুলোতে তিনি ইসলামী ঐতিহ্য ও তাসাউফের ওপর তথ্যগর্ভ আলোচনা পেশ করেন।
তিনি মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগের সম্মানজনক ‘ইসলামিক ফিকহ কাউন্সিল’-এর সাথে যুক্ত ছিলেন, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের স্বনামধন্য ওলামারা সমসাময়িক যুগের আইনি, সামাজিক ও ধর্মীয় জটিল বিষয়াবলী নিয়ে গবেষণা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। আন্তর্জাতিক এসব মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি কেবল ব্যক্তিগত সুনাম এনে দেয়নি, বরং আরব বিশ্বের আধিপত্য থাকা ইসলামিক আলোচনাগুলোতে ভারতের ঐতিহ্যবাহী শাফেঈ মাজহাবের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে তুলে ধরেছিল। আরবি, উর্দু, হিন্দি, মালায়লাম এবং ইংরেজি ভাষার ওপর চমৎকার দখলের কারণে তিনি আন্তর্জাতিক ও দেশীয় যেকোনো পরিমণ্ডলে সাবলীলভাবে নিজের চিন্তা ও যুক্তি পেশ করতে পারতেন।
কেরালার ঐতিহ্যবাহী ইসলামী জ্ঞানচর্চা কোনোদিনই বিচ্ছিন্ন ছিল না; বরং ভ্রমণ, প্রকাশনা ও আন্তর্জাতিক কাউন্সিলের মাধ্যমে তারা ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সাথে যুক্ত ছিল। আলীকুট্টি মুসলিয়ার ছিলেন সেই ঐতিহ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধুনিক প্রতিনিধি।
লেখক, সম্পাদক ও ভাষাবিদ
শিক্ষাদান এবং সংগঠনের পাশাপাশি সাহিত্য ও গবেষণার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ছিল সমান উজ্জ্বল। তিনি কেরালার সুপরিচিত প্রকাশনা ‘আল-মুয়াল্লিম’, আরবি ভাষার সাময়িকী ‘আল-নূর’ এবং ‘সুন্নি আফকার’-এর প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। একই সাথে তিনি কেরালা মুসলিম সমাজের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে তৈরি ‘মুসলিম লোকম ইয়ার বুক’ এবং ‘কেরালা মুসলিম ডাটা ব্যাংক’ প্রকল্পের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।
লেখালেখি ও সম্পাদনার পাশাপাশি তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ ছিল একটি ত্রিভাষিক ‘আরবি-মালায়লাম-ইংরেজি’ অভিধান রচনা করা। খ্যালিকুট বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of Calicut) লাইব্রেরি ক্যাটালগে ২০১৫ সালে প্রকাশিত তাঁর রচিত এই অভিধানটির রেকর্ড রয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে একটি অভিধান রচনা করা ধর্মীয় তত্ত্বকথা আলোচনার চেয়ে সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু এটি শিক্ষাক্ষেত্রে একটি বৈপ্লবিক কাজ ছিল। এই অভিধান তৈরির মূল উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীরা যেন নিজেদের মাতৃভাষা, আরবি এবং আন্তর্জাতিক ইংরেজি ভাষার মধ্যে সহজে সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে। তাঁর এই অভিধান ও সম্পাদনার কাজগুলো শ্রেণিকক্ষের বাইরেও জ্ঞানের সুবাতাস ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করেছিল।
প্রচারবিমুখ আত্মসংযম ও ব্যক্তিগত জীবন
আলীকুট্টি মুসলিয়ারের বাহ্যিক অর্জনের পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিগত আত্মসংযম ও বুজুর্গির কথা তাঁর ছাত্র ও সহকর্মীরা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। একটি স্মৃতিচারণে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শত ব্যস্ততা, দীর্ঘ সফর এবং ক্লান্তিকর পাঠদানের মধ্যেও তিনি কখনও নফল ইবাদত (যেমন সালাতুদ দোহা বা চাশতের নামাজ) কাজা করতেন না। পূর্বসূরি বুজুর্গ ও ওলামাদের প্রতি তাঁর ছিল অপরিসীম শ্রদ্ধা। যেকোনো বুজুর্গের মাজারের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি গাড়ি থামিয়ে ফাতিহা পাঠ করতেন এবং জিয়ারত করতেন।
এগুলো কেবল শ্রদ্ধার খাতিরে বলা কোনো সাধারণ গল্প নয়; বরং এগুলোই ছিল তাঁর সার্বজনীন নীতি ও চারিত্রিক দৃঢ়তার মূল উৎস। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর যে ধৈর্য, সৌজন্যতা এবং মেজাজের ভারসাম্য দেখা গেছে, তার শিকড় ছিল এই গভীর আধ্যাত্মিক জীবনের মধ্যে। তিনি মুখে ছিলেন কোমল, বিচারে ছিলেন সতর্ক এবং অন্যের কষ্ট হতে পারে এমন কাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখতেন।
অনেকগুলো পদে আসীন থাকা সত্ত্বেও তাঁর অতি সাধারণ জীবনযাপনই ছিল তাঁর নেতৃত্বের অন্যতম শক্তি। বিনয়ী হওয়ার অর্থ কিন্তু সিদ্ধান্তহীনতা বা দুর্বলতা নয়; নীতিগত প্রশ্নে তিনি পাহাড়ের মতো অটল থাকতেন, তবে তা উপস্থাপন করতেন বিনম্রভাবে। বহুত্ববাদী ভারতীয় সমাজে কীভাবে নিজ ধর্মের ওপর শতভাগ অটল থেকেও অন্যান্য সম্প্রদায়ের সাথে পরম শ্রদ্ধাপূর্ণ সম্পর্ক রাখা যায়, তিনি ছিলেন তার বাস্তব উদাহরণ।
উপসংহার
২০২৬ সালের ২৩ জুলাই বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগে এই মহান কর্মবীর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিরুরক্কাড জুমা মসজিদ প্রসংগনে সর্বস্তরের হাজার হাজার মানুষের অশ্রুসিক্ত উপস্থিতিতে তাঁর জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়। তাঁর এই চলে যাওয়া সামাস্তা, জামিয়া নূরিয়া এবং সমগ্র দক্ষিণ ভারতের দ্বীনি অঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করেছে। তবে মৃত্যুর চেয়েও বড় সত্য হলো তিনি তাঁর কর্মের মাধ্যমে এমন একটি চিরস্থায়ী আলেম সমাজ ও ব্যবস্থা রেখে গেছেন, যা আগামী বহু প্রজন্মকে পথ দেখাবে।
প্রফেসর কে. আলীকুট্টি মুসলিয়ারের মূল অবদান ও ঐতিহ্য লুকিয়ে আছে তাঁর তৈরি করা এই ‘ধারাবাহিকতার’ মধ্যে। তিনি ঐতিহ্যবাহী মসজিদ-দেরস এবং আধুনিক কলেজ, স্থানীয় মহল্লা ও আন্তর্জাতিক ফিকহ কাউন্সিল, কিংবা ব্যক্তিগত ইবাদত ও জটিল প্রশাসনিক দায়িত্বকে কখনো একে অপরের বিরোধী মনে করেননি। তিনি এই সমস্ত কিছুকে একটি একক সামাজিক ও দ্বীনি আমানত হিসেবে পরিচালনা করেছেন।
শিক্ষাদান, প্রাতিষ্ঠানিক সংগঠন, জনসেবা, রচনা এবং নিরহংকার ব্যক্তিগত জীবনযাত্রার মাধ্যমে তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে প্রমাণ করে গেছেন যে নম্রতা, পরামর্শ এবং সেবার মানসিকতা যুক্ত হলে শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষাও যেকোনো আধুনিক যুগে সমানভাবে কার্যকর ও প্রাসঙ্গিক থাকে। মহান আল্লাহ তাঁর সকল দ্বীনি খিদমতকে কবুল করুন, তাঁর ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন।