আধুনিক কাতারের রূপকার শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির জীবনাবসান: একটি সোনালী অধ্যায়ের সমাপ্তি

ভূমিকা: একটি সোনালী অধ্যায়ের সমাপ্তি

২০২৬ সালের ১২ জুলাই, রবিবার সকালে ৭৪ বছর বয়সে আধুনিক কাতারের রূপকার ও সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির জীবনাবসানের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি, অর্থনৈতিক ইতিহাস এবং বিশ্ব কূটনীতিতে একটি সোনালী ও মহিমান্বিত অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। কাতারের আমিরি দিওয়ান থেকে ‘ফাদার আমির’ (পিতা আমির) হিসেবে সর্বজনশ্রদ্ধেয় এই দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়কের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই সমগ্র উপসাগরীয় অঞ্চল, আরব বিশ্ব এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া। কাতারে চার দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে বিরতি টানা হয় এবং জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। প্রতিবেশী সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান এবং কুয়েতের শীর্ষ নেতারা এই শোককে সমগ্র আরব জাতির অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

১৯৯৫ থেকে ২০১৩ সাল এই ১৮ বছরের অবিস্মরণীয় শাসনামলে শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি মাত্র ২৮ লাখ জনসংখ্যার এবং ১১,৫৮১ বর্গকিলোমিটারের একটি ছোট্ট উপসাগরীয় রাষ্ট্রকে রূপান্তরিত করেছিলেন বিশ্বের অন্যতম ধনী, প্রভাবশালী এবং কূটনৈতিকভাবে অপরিহার্য একটি বৈশ্বিক পরাশক্তিতে। বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকেও যে দেশটি মূলত মুক্তা আহরণ এবং সীমিত তেল আয়ের ওপর নির্ভরশীল একটি নিভৃত মরুময় ভূখণ্ড ছিল, তাঁর জাদুকরী নেতৃত্বে তা একুশ শতকের আধুনিকতার প্রতীক হয়ে ওঠে। তাঁর জীবনাবসান কেবল একজন আরব শাসকের বিদায় নয়, বরং একটি জাতির শূন্য থেকে মহাকাশ ছোঁয়ার এক অবিশ্বাস্য রূপান্তরের মহাকাব্যের সমাপ্তি।

শৈশব, সামরিক শিক্ষা এবং ক্ষমতায় আরোহণ

১৯৫২ সালে দোহার আল থানি রাজপরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শেখ হামাদ। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন প্রখর বুদ্ধিমত্তা, চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং গভীর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। কাতারে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করার পর তিনি উচ্চতর সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত রয়্যাল মিলিটারি একাডেমি স্যান্ডহার্স্ট (Royal Military Academy Sandhurst)-এ ভর্তি হন এবং ১৯৭১ সালে সসম্মানে স্নাতক সম্পন্ন করেন। স্যান্ডহার্স্টের কঠোর সামরিক শৃঙ্খলা এবং আধুনিক যুদ্ধবিদ্যার জ্ঞান তাঁর ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতাকে শাণিত করেছিল। দেশে ফিরে তিনি কাতার সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৭৭ সালে মাত্র ২৫ বছর বয়সে তিনি দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও যুবরাজ (Crown Prince) হিসেবে নিযুক্ত হন এবং সেনাবাহিনীর কাঠামোগত সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৯৯০-এর দশকের শুরুতে কাতার এক গভীর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং কাঠামোগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। দেশটির প্রধান আয়ের উৎস অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগার প্রায় শূন্য হয়ে পড়েছিল। এছাড়া বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে দেশটি তখন মূলত প্রতিবেশী বড় রাষ্ট্রগুলোর ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল ছিল। এই স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে ১৯৯৫ সালের ২৭ জুন এক রক্তপাতহীন ও অত্যন্ত শান্তিপূণ প্রাসাদ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি তাঁর পিতা শেখ খলিফা বিন হামাদ আল থানির স্থলাভিষিক্ত হন। ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, কাতারকে টিকে থাকতে হলে এবং বিশ্বমঞ্চে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে প্রথাগত ও রক্ষণশীল চিন্তার বাইরে গিয়ে আমূল অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কার করতে হবে।

অর্থনৈতিক বিপ্লব: এলএনজি এবং নর্থ ফিল্ডের বিস্ময়

শেখ হামাদের শাসনামলের সবচেয়ে যুগান্তকারী এবং দূরসাহসী পদক্ষেপ ছিল কাতারের অর্থনৈতিক ভিত্তির সম্পূর্ণ পুনর্নির্মাণ। পারস্য উপসাগরের গভীরে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম একক প্রাকৃতিক গ্যাসের খনি 'নর্থ ফিল্ড' (North Field) ১৯৭১ সালে আবিষ্কৃত হলেও দীর্ঘদিন ধরে তা অবহেলিত ছিল। কারণ সে সময় প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইনের বাইরে পরিবহন করা অসম্ভব ছিল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি (LNG) আহরণ ও রপ্তানি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত হতো।

বিশ্বের অনেক শীর্ষ অর্থনৈতিক বিশ্লেষক এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকের সতর্কতা উপেক্ষা করে শেখ হামাদ পশ্চিমা জ্বালানি জায়ান্ট যেমন এক্সনমবিল (ExxonMobil), টোটাল (Total) এবং শেল (Shell)-এর সাথে কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তোলেন। তিনি এলএনজি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিধিবর্ধন অবকাঠামো তৈরিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়ে এক বিশাল আর্থিক ঝুঁকি গ্রহণ করেন। তাঁর এই দূরদর্শী সাহসিকতা অচিরেই কাতারকে এক অবিশ্বাস্য ও নজিরবিহীন সাফল্যের মুখোমুখি করে:

সূচক

১৯৯৫ (ক্ষমতা গ্রহণের সময়)

২০১৩ (ক্ষমতা ত্যাগের সময়)

প্রধান অর্থনৈতিক ভিত্তি

সীমিত তেলের মজুদ ও মাঝারি আয়

বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি (LNG) রপ্তানিকারক

মাথাপিছু জিডিপি (GDP)

আনুমানিক ১৬,০০০ মার্কিন ডলার

বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ (১,০০,০০০ ডলারের বেশি)

বৈদেশিক বিনিয়োগ ও তহবিল

সাধারণ ও সীমিত সরকারি রিজার্ভ

৭০০ বিলিয়ন ডলারের 'কাতার ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি' (QIA)

ভূ-রাজনৈতিক পরিচিতি

আঞ্চলিক ছোট ও নির্ভরশীল উপসাগরীয় রাষ্ট্র

বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম প্রধান ও স্বাধীন কূটনৈতিক কেন্দ্র

এই এলএনজি বিপ্লব কাতারকে রাতারাতি বিশ্বের অন্যতম ধনী রাষ্ট্রে পরিণত করে। তবে শেখ হামাদ কেবল সম্পদ অর্জনেই থেমে থাকেননি; তিনি জানতেন যে তেল ও গ্যাসের মজুদ একদিন ফুরিয়ে যাবে। তাই অর্জিত বিপুল অর্থ তিনি বিলাসবহুল ব্যয়ের পরিবর্তে ভবিষ্যতের জন্য দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ করেন। ২০০৫ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত কাতার ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি (QIA) লন্ডনের বিখ্যাত হ্যারডস (Harrods) ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, শাদ টাওয়ার, ভক্সওয়াগেন, বার্কলেস ব্যাংক, হিথরো বিমানবন্দর এবং প্যারিস সেন্ট-জার্মেই (PSG) ফুটবল ক্লাবের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিপুল মালিকানা অর্জন করে, যা কাতারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে চিরস্থায়ী রূপ দেয়।

কূটনৈতিক ভারসাম্য এবং সফট পাওয়ার (Soft Power)

অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি শেখ হামাদ কাতারকে একটি অনন্য ও প্রভাবশালী ভূ-রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গড়ে তোলেন। বড় এবং সামরিকভাবে শক্তিশালী প্রতিবেশীদের মাঝখানে অবস্থিত ছোট একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য তিনি প্রথাগত সামরিক শক্তির চেয়ে 'সফট পাওয়ার' (Soft Power) বা কোমল কূটনীতিকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, অর্থনৈতিক শক্তিকে যদি সফলভাবে কূটনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবে রূপান্তরিত করা যায়, তবেই একটি ছোট রাষ্ট্র বিশ্বমঞ্চে অপরাজেয় হয়ে উঠতে পারে।

১. আল জাজিরা ও গণমাধ্যম বিপ্লব

১৯৯৬ সালে শেখ হামাদের ব্যক্তিগত অর্থায়নে এবং সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় জন্ম নেয় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম 'আল জাজিরা' (Al Jazeera)। সে সময় আরব বিশ্বে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রিত, একঘেয়ে ও সেন্সরযুক্ত গণমাধ্যমের বাইরে আল জাজিরা এক অভূতপূর্ব বাকস্বাধীনতা, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা ও মুক্ত আলোচনার জন্ম দেয়। খুব দ্রুতই এই চ্যানেলটি সিএনএন বা বিবিসির মতো পশ্চিমা প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে এবং আরব বিশ্বের সাধারণ মানুষের শক্তিশালী কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়। আল জাজিরা কেবল সংবাদ পরিবেশন করেনি, বরং মধ্যপ্রাচ্যের সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে এক ঐতিহাসিক বিপ্লব ঘটিয়েছে, যা কাতারকে বিশ্বজুড়ে এক অনন্য পরিচিতি ও অপরিসীম প্রভাব এনে দেয়।

২. বিশ্ব রাজনীতির মধ্যস্থতাকারী

শেখ হামাদের দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি ছিল সবার সাথে সংলাপের দরজা খোলা রাখা এবং একটি বহিল্মুখী (Multi-directional) কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা। তিনি একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে গভীর কৌশলগত মিত্রতা বজায় রেখে কাতারের আল উদেইদ বিমান ঘাঁটিতে (Al Udeid Air Base) হাজার হাজার মার্কিন সেনা ও মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম মার্কিন সামরিক কেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দেন, ঠিক তেমনি অন্যদিকে প্রতিবেশী ইরান (যাদের সাথে কাতার নর্থ ফিল্ড গ্যাস খনি ভাগ করে নিয়েছে), হামাস এবং পরবর্তীতে আফগানিস্তানের তালেবানদের সাথেও কার্যকরী যোগাযোগ ও আস্থার সম্পর্ক বজায় রাখেন।

এই অনন্য ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের কারণে কাতার বিশ্ব রাজনীতির এক অপরিহার্য ও নির্ভরযোগ্য মধ্যস্থতাকারীতে (Mediator) পরিণত হয়। ২০০৮ সালে লেবাননের জটিল অভ্যন্তরীণ সংঘাত নিরসন, সুদানের দারফুর শান্তি চুক্তি সম্পাদন, ইয়েমেনের সংঘাত প্রশমন এবং পরবর্তীতে মার্কিন-তালেবান ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনায় দোহার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত নির্ধারক ও প্রশংসিত।

৩. শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে বিপ্লব: ভিশন ২০৩০

শেখ হামাদের স্বপ্ন কেবল অবকাঠামো ও অর্থনীতিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তাঁর এই স্বপ্নে প্রধান অনুপ্রেরণা ও চালিকাশক্তি ছিলেন তাঁর দূরদর্শী স্ত্রী, শেখা মোজা বিনতে নাসের (Sheikha Moza bint Nasser)। ১৯৯৫ সালে তাঁরা যৌথভাবে 'কাতার ফাউন্ডেশন' (Qatar Foundation) প্রতিষ্ঠা করেন। দোহার বুকে আড়াই হাজার একর জমির ওপর গড়ে তোলা হয় এক বিশাল ও অত্যাধুনিক 'এডুকেশন সিটি' (Education City)

এখানে জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি, কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটি, টেক্সাস এঅ্যান্ডএম, নর্থওয়েস্টার্ন এবং করনেল ইউনিভার্সিটির মতো বিশ্বখ্যাত পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পূর্ণাঙ্গ ক্যাম্পাস স্থাপন করা হয়। তাঁর লক্ষ্য ছিল কাতারের নতুন প্রজন্মকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে না পাঠিয়ে ঘরের কাছেই বিশ্বমানের শিক্ষা প্রদান করা এবং কাতারকে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান গবেষণা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির কেন্দ্রে পরিণত করা। এর মাধ্যমে তিনি ‘কাতার ন্যাশনাল ভিশন ২০৩০’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন।

বিশ্বজয়ের স্বপ্ন: ২০২২ ফিফা বিশ্বকাপ

শেখ হামাদের দীর্ঘমেয়াদী স্বপ্নের আরেকটি বড় এবং ঐতিহাসিক অর্জন ছিল ২০২২ সালের ফিফা বিশ্বকাপের স্বাগতিক হওয়ার গৌরব অর্জন। ২০১০ সালের ২ ডিসেম্বর জুরিখে যখন ফিফা কাতারকে প্রথম কোনো আরব ও মুসলিম দেশ হিসেবে স্বাগতিক দেশ হিসেবে ঘোষণা করে, তখন সমগ্র বিশ্বে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। অনেকেই মরুভূমির তীব্র গরম, ছোট একটি দেশের ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা এবং লজিস্টিক সক্ষমতা নিয়ে সংশয় ও তীব্র সমালোচনা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু শেখ হামাদ এই চ্যালেঞ্জকে কাতারের আধুনিকায়নের প্রধান অনুঘটক হিসেবে গ্রহণ করেন।

তাঁর প্রত্যক্ষ দিকনির্দেশনায় কাতার পরবর্তী এক দশকে প্রায় ২২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করে এক অভূতপূর্ব কর্মযজ্ঞ শুরু করে। মরুভূমির বুকে নির্মিত হয় আটটি অত্যাধুনিক ও পরিবেশবান্ধব শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্টেডিয়াম, চালূ হয় বিশ্বমানের চালকবিহীন ‘দোহা মেট্রো’ রেল নেটওয়ার্ক, সম্প্রসারিত হয় হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং শূন্য থেকে গড়ে তোলা হয় ভবিষ্যতের স্মার্ট সিটি 'লুসাইল সিটি' (Lusail City)। ২০২২ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে আয়োজিত এই বিশ্বকাপ কেবল ইতিহাসের অন্যতম সফল ও জাঁকজমকপূর্ণ টুর্নামেন্ট হিসেবেই স্বীকৃতি পায়নি, বরং এটি প্রমাণ করেছিল যে শেখ হামাদের রোপণ করা স্বপ্ন কাতারকে বৈশ্বিক সক্ষমতা ও আয়োজক দক্ষতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দিয়েছে। এই আয়োজন সমগ্র আরব ও মুসলিম বিশ্বের জন্য এক বিরাট গর্বের প্রতীকে পরিণত হয়।

একটি বিরল দৃষ্টান্ত: ২০১৩ সালে স্বেচ্ছায় সিংহাসন ত্যাগ

আরব বিশ্বের রাজতন্ত্র এবং সমকালীন বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি একটি বিরল, সাহসিকতাপূর্ণ এবং সম্পূর্ণ নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। সাধারণত এই অঞ্চলের বা বিশ্বের যেকোনো রাজতান্ত্রিক ও একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় শাসকেরা আমৃত্যু ক্ষমতায় আসীন থাকেন অথবা কোনো গণঅভ্যুত্থান বা প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হন। কিন্তু ২০১৩ সালের ২৫ জুন, মাত্র ৬১ বছর বয়সে, সম্পূর্ণ সুস্থ এবং শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ত্যাগের ঘোষণা দেন, যা সমগ্র বিশ্বকে অবাক করেছিল।

তিনি তাঁর পুত্র, ব্রিটিশ-শিক্ষিত ও অত্যন্ত যোগ্য যুবরাজ, বর্তমান আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি-এর হাতে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেন। জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া তাঁর ঐতিহাসিক বিদায়ী ভাষণে তিনি বলেছিলেন, "এখন সময় এসেছে নতুন প্রজন্মের হাতে নেতৃত্বের মশাল তুলে দেওয়ার, যাতে তরুণদের উদ্ভাবনী শক্তি, আধুনিক চিন্তাধারা ও অদম্য উদ্যম দেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।"

ক্ষমতা হস্তান্তরের পর তিনি ‘আল-আমির আল-ওয়ালিদ’ (পিতা আমির বা Father Emir) উপাধি গ্রহণ করেন এবং রাষ্ট্রীয় দৈনন্দিন প্রশাসন থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নেন। তবে ২০১৭ সালের উপসাগরীয় অবরোধের মতো জাতীয় সংকটময় মুহূর্তে তিনি পুত্রের পাশে একজন প্রাজ্ঞ অভিভাবক ও পরামর্শদাতা হিসেবে ছায়া দিয়ে গেছেন। তাঁর এই শান্তিপূর্ণ ও স্বতঃপ্রণোদিত ক্ষমতা হস্তান্তর কাতারের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায় এবং আরব বিশ্বে সুশাসনের এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করে।

উপসংহার: ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় উত্তরাধিকার

শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির ৭৪ বছর বয়সে প্রস্থান কেবল একটি রক্তমাংসের মানুষের জীবনাবসান নয়; এটি এমন একজন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়কের বিদায়, যিনি অসম্ভবকে সম্ভব করার সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন এবং নিজের জাতিকে এক নতুন পরিচয় এনে দিয়েছিলেন। তিনি যখন ১৯৯৫ সালে দেশটির দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন, কাতার তখন বিশ্ব মানচিত্রে প্রায় অপরিচিত, তেল-নির্ভর এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাবহীন একটি ক্ষুদ্র বিন্দু ছিল। আর যখন তিনি বিদায় নেন, কাতার তখন বিশ্বের অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক, শিক্ষাগত এবং সাংস্কৃতিক মানচিত্রের এক উজ্জ্বলতম ও শক্তিধর নক্ষত্র।

তাঁর ১৮ বছরের শাসনামল প্রমাণ করেছে যে, একটি দেশের ভৌগোলিক আকার বা ক্ষুদ্র জনসংখ্যা কখনো বিশ্বমঞ্চে মাথা তুলে দাঁড়ানোর পথে বাধা হতে পারে না; বরং নেতৃত্বের অদম্য সাহস, দূরদর্শী পরিকল্পনা, কূটনৈতিক প্রজ্ঞা এবং জাতীয় সম্পদের সঠিক ও মেধাভিত্তিক ব্যবহারই একটি জাতিকে বিশ্বের দরবারে শ্রেষ্ঠত্ব এনে দিতে পারে। আধুনিক দোহার প্রতিটি আকাশচুম্বী নান্দনিক ভবন, আল জাজিরার প্রতিটি সৎ ও নির্ভীক সম্প্রচার, এডুকেশন সিটির প্রতিটি গবেষণাগার, এলএনজি-এর প্রতিটি বিশ্বব্যাপী চালান এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কাতারের প্রতিটি পদক্ষেপে শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির উত্তরাধিকার চিরকাল বেঁচে থাকবে। মধ্যপ্রাচ্য এবং বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে তিনি কেবল একজন সফল শাসক হিসেবে নন, বরং একটি আধুনিক রাষ্ট্রের যুগান্তকারী রূপকার ও স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।




Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter