একবিংশ শতাব্দীর ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক সত্তা ও স্বরূপ অন্বেষণ

ভূমিকা

উপনিবেশ-পরবর্তী মুসলিম বিশ্বে, বিশেষত ১৯৭৮ সালের মক্কা সম্মেলনের পর থেকে "মুসলিম" বা "ইসলামি" নামধারী বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোর অভাবনীয় দ্রুত প্রসার ঘটেছে। ঐতিহ্যবাহী ইসলামি ও আধুনিক পশ্চিমা শিক্ষাক্রমের সংমিশ্রণ  ঘটানো এই অভিনব প্রতিষ্ঠানগুলো উম্মাহর উচ্চশিক্ষার প্রয়োজনীয়তার প্রতি মুসলিমদের ক্রমবর্ধমান সচেতনতার এক ইতিবাচক প্রমাণ। এটি এমন এক সময়ে ঘটছে যখন সমাজে বিদ্যমান ব্যাপক নিরক্ষরতা ইসলামের জ্ঞানভিত্তিক সভ্যতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এই প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত ঐতিহ্যবাহী ও আধুনিক শিক্ষার সফল সমন্বয়ের মাধ্যমে বৃহত্তর বৈশ্বিক মুসলিম উম্মাহর স্বার্থ রক্ষার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে।

শিক্ষাবিদরা এই পদ্ধতিটিকে 'সমন্বয়' বা 'ইসলামিকরণ' যা-ই বলুন না কেন, এর মূল লক্ষ্য হলো মুসলিম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি স্বতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক আত্মপরিচয় নিশ্চিত করা, যার অন্বেষণ এখনো চলমান। তবে, পশ্চিমা কাঠামোর প্রভাবে এসব প্রতিষ্ঠানের আকস্মিক ও যত্রতত্র বিস্তার কিছু গুরুতর প্রশ্নেরও জন্ম দিয়েছে। অংশীজনরা ভেবে দেখার অবকাশও পাচ্ছেন না যে, নামের সাথে "ইসলামি" তকমা থাকলেও তারা আসলেই একুশ শতকের জন্য উপযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও যোগ্য স্নাতক তৈরি করতে পারছেন কি না। বরং মনে হচ্ছে, গত কয়েক দশক ধরে আমরা কেবল অন্ধের মতো ছুটে চলেছি এবং ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্নাতকদের যোগ্যতার ক্ষেত্রে মূলত গৎবাঁধা একই জিনিসেরই পুনরাবৃত্তি করে যাচ্ছি।

আধুনিক মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট ও দোলাচল

সেদিক থেকে একটি আদর্শ আধুনিক মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় এমন এক সংকট বা দোলাচলের আবর্তে নিপতিত, যা আংশিকভাবে তার নিজেরই সৃষ্টি। একদিকে, এর কাঁধে ন্যস্ত রয়েছে নিজস্ব ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ 'উম্মাহগত দায়িত্ব'; সেইসাথে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সর্বাধিক অগ্রসর আধুনিক সংস্কৃতিগুলো থেকে সর্বোত্তম ও সবচেয়ে কার্যকর জ্ঞান আহরণ করে সেগুলোকে নিজ শিক্ষাক্রমের কাঠামোর আওতায় একটি সুসংহত পূর্ণাঙ্গ রূপে একীভূত বা সমন্বয়  করার ভার। এটা স্বীকার করতেই হবে যে, এই বিশাল দায়িত্বভারের বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব কোনো দায় বা ত্রুটি নয়; বরং এটি আধুনিক মুসলিম উম্মাহর নিয়তিরই একটি অংশ। তবে, ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি নিজস্ব আত্মপরিচয় অন্বেষণে আধুনিক মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য মূলত শিক্ষাক্রম-সমন্বয়ের সেই উদ্যোগে তার সফলতার সাথেই নিবিড়ভাবে জড়িত, যেটিকে সে চাইলে একটি সুন্দর রূপ দিতে ও প্রভাবিত করতে পারে।

অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারসাম্যহীন ভৌত ও বাহ্যিক সম্প্রসারণের  কারণে এই সমন্বয়ের কাজটি খুব বেশি দূর এগোতে পারেনি। কারণ, এই কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য যে ধরনের সুসংহত প্রচেষ্টা এবং উদ্ভাবনী দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন, তার জন্য দরকারি মূল্যবান সময়টুকু থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বঞ্চিত হয়েছে। নিশ্চিতভাবেই এ ক্ষেত্রে কয়েকটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত রয়েছে, যারা তাদের প্রতিষ্ঠার প্রথম দুই দশকের মতো সময়ে জনসমক্ষে নিজেদের বহুল আলোচিত 'ইসলামিকরণ-সমন্বয়' (Islamization-Integration) এজেন্ডাকে তুলে ধরতে তুলনামূলকভাবে সফল হয়েছিল। কিন্তু তুলনামূলকভাবে সফল হওয়া এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও বিভিন্ন কারণে তাদের সেই কাঙ্ক্ষিত এজেন্ডাটি থমকে গেছে এবং কার্যত তা শিকেয় তুলে রাখা হয়েছে। অধিকন্তু, এই 'ইসলামিকরণ-সমন্বয়' প্রক্রিয়া থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে যেসব বুদ্ধিবৃত্তিক ও তাত্ত্বিক সাহিত্য তৈরি হয়েছে, তা-ও মোটেও আশাব্যঞ্জক বা উল্লেখ করার মতো কিছু ছিল না। তা সত্ত্বেও, সমন্বয়ের এজেন্ডায় বর্তমানে আমরা যে চরম স্থবিরতা বা পশ্চাদপসরণ  লক্ষ্য করছি, তার প্রেক্ষিতে এ দাবি করাই যায় যে—সকল আধুনিক মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ই এর ব্যর্থতার দায়ভার বহন করে।

অন্যান্য গবেষক ও পণ্ডিতরা তাঁদের লেখায় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান সংকটটিকে "সম্প্রসারমান দেহ" এবং "সঙ্কুচিত আত্মা" -এর সমস্যা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এর দ্বারা তাঁরা মূলত এটাই বোঝাতে চেয়েছেন যে, বাহ্যিক নানাবিধ চাপের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এত দ্রুতগতিতে সম্প্রসারিত হচ্ছে (যার ইঙ্গিত আগেই দেওয়া হয়েছে) যে, এর প্রতিষ্ঠাতাদের ধারণামতে খোদ ক্যাম্পাস সম্প্রদায়ের যে আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চাহিদা পূরণ হওয়ার কথা ছিল, তা এখন আর প্রায় হয়েই ওঠে না। এটি অনুধাবন করা প্রয়োজন যে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চাহিদাগুলো কেবল একটি সুনির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক পরিবেশের আওতায়ই পূরণ করা সম্ভব।

বর্তমানে ব্যাপকভাবে যা ঘটছে তা হলো—বিশ্ববিদ্যালয়ের 'দেহ' বা বাহ্যিক কাঠামো (যেমন: এর ভৌত অবকাঠামো, শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবং অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক জনবল) ক্রমাগত সম্প্রসারিত হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু এর আদি বা মূল 'আত্মা'—যেই চেতনা এর জন্মকে অনুপ্রাণিত করেছিল—তা ক্রমশ সঙ্কুচিত হচ্ছে। এর কারণ হলো, এই চেতনাটি এখন কেবল শিক্ষার্থীদের দ্বারাই নয়, বরং আরও উদ্বেগজনকভাবে, এর শিক্ষকমণ্ডলী বা অ্যাকাডেমিকদের দ্বারাও পর্যাপ্তভাবে আত্মস্থ বা লালিত হচ্ছে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের 'ইসলামিকরণ-সমন্বয়' (Islamization-Integration) কর্মসূচির এই অন্তর্নিহিত ব্যর্থতার (implied failure) মূলে রয়েছে সকল পর্যায়ে এর নেতৃত্বের অক্ষমতা। তারা ধারাবাহিকতা ও পরিবর্তনের মধ্যে একটি টেকসই, গতিশীল ও সুস্থ ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে; বিশেষ করে, প্রতিষ্ঠাতাদের দর্শনের প্রতি প্রতিষ্ঠানের অব্যাহত দায়বদ্ধতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রমের উন্নয়ন ও পরিবর্তনের প্রতি এর উন্মুক্ততার মধ্যকার যে কাঙ্ক্ষিত ভারসাম্য থাকা দরকার ছিল, তা রক্ষায় তারা সফল হয়নি। ওপর্যুক্ত প্রারম্ভিক আলোচনার আলোকে, এই প্রবন্ধটি সমসাময়িক মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষাক্রম সমন্বয়ের সেই উদ্যোগটিকে পুনরায় পর্যালোচনার দাবি রাখে, যা বর্তমানে অনেকটাই গতি হারিয়ে স্থবির হয়ে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। যেহেতু এই প্রবন্ধটির পরিসর সীমিত, তাই এই পর্যালোচনাটি কেবল সেই মূল সমস্যাগুলোর একটি সামগ্রিক রূপরেখার (overview) মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে, যেগুলো সমন্বয়ের এই উদ্যোগের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে দেখা গেছে।

এই পর্যালোচনার মূল উদ্দেশ্য হলো বর্তমানে ব্যাপকভাবে প্রচলিত কাঠামোর পরিবর্তে একটি নতুন 'জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোতে' উপনীত হওয়া; যে কাঠামোর আওতায় 'ইসলামিকরণ-সমন্বয়' প্রক্রিয়াটিকে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক—উভয় ক্ষেত্রেই পূর্ণাঙ্গতা, উৎকর্ষ এবং সমস্যা-সমাধানের সক্ষমতার দিক থেকে আরও উন্নত স্তরে উন্নীত করা সম্ভব হবে। এই প্রবন্ধে আরও এই যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, আলোচ্য এই নতুন জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোটি অন্য কোনো কিছু নয়; বরং এটি হলো তা-ই, যাকে আমরা 'তাওহিদি জ্ঞানতত্ত্ব' (tawhidic epistemology) বলে আখ্যায়িত করি। আর এটিই একটি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বরূপ নির্ধারণকারী প্রধান উপাদান হিসেবে কাজ করবে।

আধুনিক মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরাজমান অভিন্ন সমস্যাসমূহ

আধুনিক মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলো বর্তমানে বেশ কিছু অভিন্ন সমস্যা ও চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন, যা স্বাভাবিকভাবেই আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা ও সমন্বয়ের  দাবি রাখে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—একটি ইসলামি অ্যাকাডেমিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশে এবং পরিণামে 'ইসলামের নামে' শিক্ষার্থীদের যে শিক্ষা প্রদান করা হচ্ছে বলে দাবি করা হয়, সেই শিক্ষার গুণগত মান; এই শিক্ষার সামাজিক মূল্য ; এবং আলোচ্য মুসলিম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব চরিত্র ও আত্মপরিচয়।

এমতাবস্থায়, স্বাভাবিকভাবেই এই প্রাসঙ্গিক প্রশ্নটি সামনে আসে যে—এই সমস্যাগুলোকে কার্যকরভাবে মোকাবিলার ক্ষেত্রে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের নিজস্ব উদ্যোগে ইসলামের ভূমিকা ঠিক কী হবে? আমাদের সুদৃঢ় মত হলো, এক্ষেত্রে ইসলাম ধর্মের যুতসই ভূমিকাটি হবে মূলত জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রকৃতির।

কুরআনের ভাষ্যমতে, ইসলাম হলো সত্যের ধর্ম (দ্বীন আল-হক), যা মুসলিম দার্শনিকদের মতে মূলত 'জ্ঞানের ধর্ম'-এরই সমার্থক। সুতরাং, ইসলাম জ্ঞানতাত্ত্বিক শিক্ষায় অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এসব শিক্ষার মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যেমন: 'জ্ঞানের ঐক্য' নীতি; বিজ্ঞান বা শাস্ত্রসমূহের ঐক্য ও স্তরক্রম ; ইসলামি শিক্ষাসংস্কৃতির ভিত্তি ও লক্ষ্য হিসেবে জ্ঞানের অবস্থান; এবং 'জ্ঞানের নীতিশাস্ত্র'-এর প্রয়োজনীয়তা, যারই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগ হলো পেশাগত নৈতিকতা। যেহেতু বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের উচ্চশিক্ষার সাধারণ অবস্থার মতোই মুসলিম উচ্চশিক্ষার মূল সমস্যাটিও মৌলিকভাবে জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রকৃতির, তাই এক্ষেত্রে ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বের যুতসই ভূমিকা নিয়ে কথা বলাই সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে, মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরাজমান সমস্যাগুলো সমাধানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক জ্ঞানতাত্ত্বিক নীতিটি হলো সেই জ্ঞানতাত্ত্বিক ধারণা, যা ইসলামের প্রথম স্তম্ভের মধ্যে নিহিত রয়েছে। এই স্তম্ভটি আল্লাহর একত্ববাদ এবং মুহাম্মাদি রিসালাতের দুটি সাক্ষ্যকে (শাহাদাতাইন) সুদৃঢ়ভাবে ঘোষণা করে।

যেসব পণ্ডিত বলেন যে এই দুটি সাক্ষ্য মূলত 'জ্ঞানের বিবৃতি , তাঁদের কথাই যথার্থ। সেই হিসেবে, এগুলো জ্ঞানতাত্ত্বিক নীতি হিসেবে পরিগণিত হওয়ার দাবি রাখে; বস্তুত এগুলো হলো সবচেয়ে মৌলিক দুটি নীতি। ঐতিহ্যগতভাবে, এই দুটি অবিচ্ছেদ্য নীতি তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক—উভয় ক্ষেত্রেই অন্যান্য সকল জ্ঞানতাত্ত্বিক ধারণার সবচেয়ে মৌলিক উৎস হিসেবে কাজ করে। যেহেতু এই দুটি নীতি এবং এগুলোর থেকে উদ্ভূত শাখাগুলো ইসলামের 'তাওহিদি শিক্ষা'র মূল বিষয়বস্তু গঠন করে, তাই এর ফলে সৃষ্ট এই জ্ঞানভাণ্ডারটিকে আমরা 'তাওহিদি জ্ঞানতত্ত্ব' (tawhidic epistemology) হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারি।

আধুনিক মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষাক্রম সমন্বয়ের যে সর্বোত্তম মডেলটি অর্জন করতে চাইছে, সেই অন্বেষণকে সফল করার একটি অপরিহার্য নিয়ামক  হিসেবে এই 'তাওহিদি জ্ঞানতত্ত্ব'কে এখানে উপস্থাপন করা হয়েছে। শিক্ষাক্রম সমন্বয়ের 'সর্বোত্তম মডেল' বলতে আমরা সর্বপ্রথম ও প্রধানত এমন একটি মডেলকে বুঝি, যা অত্যন্ত সুসংগত (coherent), ত্রুটিমুক্ত ও সুদৃঢ় (sound) এবং ব্যাপক প্রায়োগিক উপযোগিতাসম্পন্ন। এমন মডেল বলতে মূলত এমন একটি সমন্বয়-পরিকল্পনাকে বোঝায়, যার মধ্যে একটি চমৎকার ভারসাম্য রক্ষার সক্ষমতা রয়েছে। এই ভারসাম্যটি হলো—মানুষের চিরন্তন বা শাশ্বত চাহিদাগুলোর প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিদীপ্ত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা এবং পরিবর্তিত স্থান ও কালের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে মানুষের পরিবর্তনশীল চাহিদাগুলোর প্রতি এর প্রায়োগিক বা বাস্তবমুখী সাড়া দেওয়ার সক্ষমতার মধ্যকার ভারসাম্য।

মানুষের এই পরিবর্তনশীল চাহিদাগুলো সাধারণত এমন সব "ধর্মনিরপেক্ষ" বিজ্ঞান বা অ্যাকাডেমিক শাস্ত্রের মাধ্যমে পূরণ করা হয়, যেগুলো সম্পূর্ণ নতুনভাবে উদ্ভূত কিছু জ্ঞানতত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। সেই ধারাবাহিকতায়, এই পরিবর্তনশীল চাহিদাগুলো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের—বিশেষ করে যে বিভাগের ওপর শিক্ষাক্রমের সাময়িক পর্যালোচনার দায়িত্ব ন্যস্ত থাকে, তাদের—সামনে একটি বড় ধরনের 'জ্ঞানতাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ' ছুঁড়ে দিতে সক্ষম বলে মনে করা হয়। তবে এটি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা হয় যে, 'তাওহিদি জ্ঞানতত্ত্ব'-এর সহায়তায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আলোচ্য এই চ্যালেঞ্জটি অত্যন্ত কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে। এখানে লক্ষণীয় যে, এই জ্ঞানতাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জটি মূলত একটি চলমান বা অবিরাম (ongoing) প্রক্রিয়া। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক সম্প্রসারণের অর্থই হলো এর শিক্ষাক্রমে সবসময়ই নতুন নতুন অ্যাকাডেমিক শাস্ত্র বা বিষয় যুক্ত হতে থাকবে, যেগুলোর জন্য একটি উপযুক্ত জ্ঞানতাত্ত্বিক সাড়ার প্রয়োজন হবে।

উৎকর্ষমণ্ডিত শিক্ষাক্রম সমন্বয়ের অন্বেষণ: খণ্ডিত পদ্ধতি থেকে তাওহিদি জ্ঞানতত্ত্বের দিকে

শিক্ষাক্রম সমন্বয়ের প্রক্রিয়াটি মূলত একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক কাজ। এর ফলে যে সমন্বয়টি তৈরি হবে, তার গুণগত মান বহুলাংশে নির্ভর করে সেই জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোর গুণগত মানের ওপর, যার অধীনে এই সমন্বয়টি সাধিত হয়। কেন আমরা এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি, তা অনুধাবন করা মোটেও কঠিন নয়। জ্ঞান সমন্বয়ের যেকোনো কাজে মূলত চারটি উপাদানের উপস্থিতি আবশ্যক: প্রথমত, যে জ্ঞানগত উপাদানগুলোকে সমন্বয় করতে হবে; দ্বিতীয়ত, যে মন বা মেধা (mind) এই সমন্বয়ের কাজটি করছে; তৃতীয়ত, সমন্বয়ের নীতিমালা ও হাতিয়ারসমূহ; এবং চতুর্থত, সেই ধারণাগত কাঠামো, যার ভেতরে সমন্বিত উপাদানগুলোকে একীভূত করা হবে।

এটি একেবারেই স্পষ্ট যে, আলোচ্য এই চারটি উপাদানের প্রতিটির সাথেই গুণগত মানের একটি বিষয়  ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যদিও এই সমস্ত উপাদানই গুরুত্বপূর্ণ—বিশেষ করে সমন্বয়কারীর মানবীয় মেধা—তবুও এই প্রবন্ধের মূল আলোকপাত হলো আলোচ্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোর গুণগত মানের ওপর। আধুনিক মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষাঙ্গন বা অ্যাকাডেমিয়া বর্তমানে ঠিক এই মূল সমস্যাটিরই মুখোমুখি। শিক্ষাক্রম সমন্বয়ের কাজের এই গুণগত চাহিদার প্রতি একটি মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের গভীর মনোযোগ দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। এটা স্বীকার করতেই হবে যে, কয়েক দশক আগে আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রতি মুসলিম পণ্ডিতদের অ্যাকাডেমিক সাড়া দেওয়ার শুরু থেকেই শিক্ষাক্রম খাতে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। এসব ক্ষেত্রে ঐতিহ্যবাহী এবং আধুনিক জ্ঞানের মধ্যে এক ধরনের সমন্বয়ের রূপ দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তবে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় বলতে ঐতিহ্যবাহী ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে যা বোঝায়—অর্থাৎ একে 'তাওহিদি জ্ঞানতত্ত্ব'-এর প্রতীক হতে হবে—সেই বিচারে এই পরিবর্তনগুলোকে কেবল 'বাহ্যিক' পরিবর্তন হিসেবেই আখ্যা দেওয়া যায়।

সাধারণভাবে বলতে গেলে, আলোচ্য এই শিক্ষাক্রম সমন্বয়ের কাজটি করা হয় অত্যন্ত শিথিলভাবে। এক্ষেত্রে মূলত ইসলামিক স্টাডিজের "ঐতিহ্যবাহী" শিক্ষাক্রমের সাথে বর্তমান চাকরির বাজারের জন্য উপকারী মনে হওয়া "আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ জ্ঞানের" কিছু অংশ জুড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু, সমন্বয়ের এই ধরনের চর্চা অনেকটাই খামখেয়ালি ও অগভীর বলে মনে হয়। এর মধ্যে সেই সঠিক জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তির অভাব রয়েছে, যা ইসলামি শিক্ষাসংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে ও সমুন্নত রাখতে চায়।

জ্ঞানতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, এই তথাকথিত শিক্ষাক্রম সমন্বয় আসলে নির্বাচিত কিছু ঐতিহ্যবাহী শাস্ত্র এবং কিছু আধুনিক কোর্সের একটি দুর্বল সংমিশ্রণ ছাড়া আর কিছুই নয়। এটি মূলত দুটি প্রধান বিবেচনার দ্বারা পরিচালিত হয়: প্রথমত, ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাক্রমের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার মাধ্যমে নিজেদের 'ইসলামি' হিসেবে তুলে ধরা; এবং দ্বিতীয়ত, চাকরিপ্রত্যাশী স্নাতকদের চাহিদার প্রতি সচেতন থাকার ভাব দেখানো।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্ণধারদের চিন্তাভাবনা ও চর্চায় থাকা এই বিবেচনাগুলো আজকাল এতটাই গতানুগতিক ও সাধারণ হয়ে পড়েছে যে, প্রকৃত সমন্বয়ের কাজে এদের সফল বলে গুরুত্ব দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এখন আমাদের যা প্রয়োজন তা হলো—এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে, এমনকি যারা এক্ষেত্রে তুলনামূলক ভালো করছে তাদেরকেও, শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমপর্যায়ে উন্নীত করতে সাহায্য করা। এমন বিশ্ববিদ্যালয়, যারা 'তাওহিদি জ্ঞানতত্ত্ব'-এর চেতনাকে ধারণ করবে এবং একেই মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ের মূল নির্যাস হিসেবে সগর্বে তুলে ধরবে। শিক্ষাক্রম সমন্বয়ের ক্ষেত্রে উৎকর্ষ অর্জনের পথে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মুসলিম মনন বা চিন্তাধারার উন্মুক্ত হওয়া একান্ত প্রয়োজন—তা শিক্ষক-গবেষক কিংবা শিক্ষার্থী, উভয়ের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য। কেবল মননের এই প্রকৃত উন্মোচনের মাধ্যমেই—যা মৌলিকভাবে একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক বিষয়—মুসলিমরা সেই সংকট থেকে মুক্ত হতে পারবে, যাকে প্রয়াত সৌদি আন্তর্জাতিক পণ্ডিত ও বুদ্ধিজীবী আবদুল হামিদ আবু সুলাইমান (১৯৩৬-২০২১) "দ্য ক্রাইসিস ইন দ্য মুসলিম মাইন্ড" (মুসলিম মননের সংকট) বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং মার্কিন রাজনৈতিক দার্শনিক অ্যালান ব্লুম (১৯৩০-১৯৯২) যাকে "দ্য ক্লোজিং অব দ্য আমেরিকান মাইন্ড" (মার্কিন মননের রুদ্ধতা) বলে উল্লেখ করেছেন।

বস্তুত, এই দুই পণ্ডিতই আধুনিক মননের আবদ্ধ বা রুদ্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে কথা বলছিলেন, তবে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে। উভয়েই মননের এই রুদ্ধতার পেছনে কিছু জ্ঞানতাত্ত্বিক কারণকে দায়ী করেছেন। আবু সুলাইমানের মতে, এটি হলো ইজতিহাদ বা "মুক্তচিন্তার" দরজা সংকীর্ণ বা বন্ধ হয়ে যাওয়া। অন্যদিকে ব্লুমের মতে, এটি হলো "বিশ্ববিদ্যালয়ের এলিট বা উচ্চশ্রেণির দ্বারা কৌতূহল ও অনুসন্ধিৎসার বিপজ্জনক সংকোচন"-এর ফলে সৃষ্ট এক গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক সংকট।

তাঁদের চিন্তাধারায় নানা মিল-অমিল থাকা সত্ত্বেও, আমার যুক্তি হলো—তাঁরা উভয়েই যে "বদ্ধ" মানব মননের কথা বলেছেন, তাকে বিভিন্ন মাত্রায় উন্মুক্ত করার সেই সাধারণ চাবিকাঠি বা উন্মোচক হতে পারে 'তাওহিদি জ্ঞানতত্ত্ব'। সেদিক থেকে, প্রতিটি মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য 'স্রষ্টার একত্ববাদ বিদ্যা' বা 'ইলমুত তাওহিদ'-এর পাশাপাশি এই অ্যাকাডেমিক শাস্ত্রটি শেখানো অত্যন্ত জরুরি; কেননা তাওহিদি জ্ঞানতত্ত্ব হলো মূল 'ইলমুত তাওহিদ'-এরই একটি শাখা। এই 'তাওহিদি মনন'-এর বিকাশ ও লালন করাই হলো মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ঐতিহ্যবাহী লক্ষ্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু। কারণ, ঠিক এ ধরনের মননই তাদের প্রাতিষ্ঠানিক আত্মপরিচয় বা স্বকীয়তাকে নির্ধারণ করে।

ক্রমবিকাশের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, একটি নবীন ও আধুনিক মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য তাদের শিক্ষাক্রম সমন্বয়ের উদ্যোগটি প্রাথমিক স্তরের সংমিশ্রণের মাধ্যমে শুরু করাটা বেশ বোধগম্য ও গ্রহণযোগ্য। এই প্রক্রিয়ায় ঐতিহ্যবাহী ইসলামি জ্ঞান ও আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ জ্ঞানের মধ্যে সমন্বয় সাধনে সাধারণত একটি খণ্ডিত বা আংশিক জ্ঞানতাত্ত্বিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের খণ্ডিত পদ্ধতির একটি সাধারণ উদাহরণ হলো—যেখানে যতটুকু প্রাসঙ্গিক মনে হয়, সেখানে ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানের সাথে আধুনিক জ্ঞানের সমন্বয়ের স্বপক্ষে কেবল কুরআন বা হাদিসের কিছু উদ্ধৃতি তুলে ধরা।

তবে, আমরা যখন আরও উন্নত এবং আরও উৎকর্ষমণ্ডিত শিক্ষাক্রম সমন্বয়ের দিকে অগ্রসর হতে চাইব, তখন আমাদের 'তাওহিদি জ্ঞানতত্ত্ব'-এর বুদ্ধিবৃত্তিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হবে। কারণ, ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যে এই জ্ঞানতত্ত্বকে সর্বজনীন, সর্বাধিক পূর্ণাঙ্গ, সামগ্রিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

প্রায়োগিক ইসলামি জ্ঞানতত্ত্ব: মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মপরিচয় সুদৃঢ়করণ

একুশ শতকে উচ্চশিক্ষার প্রসারে উম্মাহর যে লক্ষ্য রয়েছে, তাতে ইসলামকে যদি একটি প্রধান ভূমিকা পালন করতে হয়, তবে আমার যুক্তি হলো—আমাদেরকে এমন একটি ইসলামের দিকে ফিরে তাকাতে হবে, যাকে 'জ্ঞানের ধর্ম' এবং একটি 'বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য'  হিসেবে বোঝা হয়। ইসলামের এই বিশেষ দিকটির ওপর ভিত্তি করে আমরা এর ভূমিকাকে প্রধান তিনটি ক্ষেত্রে ভাগ করতে পারি। প্রথমত, ইসলামের প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধের  ভূমিকা; দ্বিতীয়ত, ইসলামি জ্ঞানতাত্ত্বিক শিক্ষার ভূমিকা—বিশেষ করে এর 'প্রায়োগিক জ্ঞানতত্ত্ব', যা একটি মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মপরিচয়কে সুদৃঢ় করতে সক্ষম; এবং তৃতীয়ত, ইসলামি 'জ্ঞানের নীতিশাস্ত্র'-এর ভূমিকা।

প্রথম ভূমিকার কথা বলতে গেলে, আমরা ইসলামকে সাংগঠনিক তত্ত্ব ও দৃষ্টিভঙ্গির একটি উৎস হিসেবে বিবেচনা করছি। এটি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের 'আদর্শ আকার' এবং 'আদর্শ চরিত্র' কেমন হওয়া উচিত—সে বিষয়ে মুসলিমদের সঠিক দিশা দিতে পারে। এই প্রসঙ্গে সমাজবিজ্ঞানী ইবনে খালদুনের 'সাংস্কৃতিক সত্তার পরিমিত আকার'—বিশেষ করে শহরের আকার—সম্পর্কিত তত্ত্বটির কথা স্মরণ করা যেতে পারে। এই তত্ত্বটির বাস্তব প্রয়োগ বেশ স্পষ্ট। একটি বিশ্ববিদ্যালয় সীমাহীনভাবে কেবল ভৌত বা বাহ্যিকভাবে বড় হতে পারে না। তাছাড়া, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত আকারের বিষয়টি এর প্রশাসনিক বা পরিচালনার মানের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আদর্শ চরিত্রের কথা ভাবলে, প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধের উৎস হিসেবে ইসলাম অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ এটি নেতৃত্ব ও অনুবর্তিতার তত্ত্ব ও চর্চা এবং সামাজিক সংহতি বা সম্পৃক্ততাবোধের ক্ষেত্রে চমৎকার দিকনির্দেশনা প্রদান করে।দ্বিতীয় ভূমিকার প্রসঙ্গে বলতে গেলে, মুসলিম উচ্চশিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে ইসলামি জ্ঞানতাত্ত্বিক শিক্ষার গুরুত্বের কিছু সাধারণ দিক নিয়ে আগেই আলোচনা করা হয়েছে। এখন যা নিয়ে আলোচনা করার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে, তা হলো একটি মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের 'তাওহিদি আত্মপরিচয়'কে সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে ইসলামের 'প্রায়োগিক জ্ঞানতত্ত্বের' আরও বিস্তারিত দিকগুলো। নিচে এ ধরনের সাতটি কাজের কথা উল্লেখ করা হলো:

 শিক্ষাক্রমের দর্শন ও কাঠামোগত নকশা প্রণয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ধারণার জোগান দেওয়া।  প্রতিটি পৃথক অ্যাকাডেমিক শাস্ত্রের জ্ঞানতত্ত্বকে সুনির্দিষ্টভাবে প্রণয়ন করা এবং তাদের মধ্যকার সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যগুলো তুলে ধরা।  বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কর্মসূচিগুলোতে একটি 'তাওহিদি রূপকল্প' প্রদান করা: এই রূপকল্পটিকে এমন ধরনের অ্যাকাডেমিক কর্মসূচিতে রূপান্তরিত করা যেতে পারে, যা কেবল একটি যৌক্তিক ও দক্ষ অ্যাকাডেমিক পরিচালনাব্যবস্থাই নিশ্চিত করবে না, বরং আনুষঙ্গিক ব্যয়ও সাশ্রয় করবে।ফরজে আইন (ব্যক্তিগতভাবে অবশ্যপালনীয়) এবং ফরজে কিফায়া (সামাজিকভাবে অবশ্যপালনীয়) জ্ঞানের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষাক্রম নিশ্চিত করা। চিরন্তন বা শাশ্বত জ্ঞান এবং পরিবর্তনশীল বা সাময়িক জ্ঞানের মধ্যে একটি সুষম শিক্ষাক্রম প্রদান করা। একটি সুস্থ জ্ঞানচর্চার সংস্কৃতি তৈরির উদ্দেশ্যে সত্যনিষ্ঠা, যৌক্তিকতা, বস্তুনিষ্ঠতা এবং সুনিশ্চয়তার মতো বুদ্ধিবৃত্তিক-যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক মূল্যবোধগুলোর প্রাথমিক উৎস হিসেবে কাজ করা। একটি সুস্থ গবেষণার সংস্কৃতি সৃষ্টির লক্ষ্যে গবেষণাধর্মী মূল্যবোধের উৎস হিসেবে ভূমিকা পালন করা।

তৃতীয় ভূমিকার প্রসঙ্গে, আমরা একটি মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিক ভূমিকা ও দায়িত্বের নিম্নোক্ত দিকগুলোর ওপর জোর দিচ্ছি, যা ধারণাগতভাবে এর আত্মপরিচয়ের সাথেই নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত:

 নতুন জ্ঞানের সৃষ্টি বা উৎপাদন, এর নানামুখী প্রয়োগ এবং সব ধরনের প্রসার বা প্রচার যেন ইসলামি নৈতিকতা অনুযায়ী পরিচালিত হয়, তা নিশ্চিত করা।  পেশাগত নৈতিকতার একটি উৎস হিসেবে কাজ করা: এর উদ্দেশ্য হলো এটি নিশ্চিত করা যে, প্রতিটি পেশায় নিয়োজিত স্নাতকেরা যেন পেশাগত নৈতিকতার সর্বোত্তম মানদণ্ডে উদ্বুদ্ধ ও বিকশিত হতে পারে।  নিম্নোক্ত এই প্রায়োগিক প্রজ্ঞার প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়কে দায়বদ্ধ করা: "স্নাতকদের বাজারদর বা গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য আরও বেশি সময় প্রয়োজন—এমন অজুহাতে সমসাময়িক উচ্চশিক্ষার পাঠ্যক্রমগুলোতে যে নৈতিক জ্ঞানকে ব্যাপকভাবে এড়িয়ে চলা হয়, মূলত সেই নৈতিক জ্ঞানই তাদের সর্বোত্তম বাজারদরের সবচেয়ে বড় নিশ্চয়তা দিতে পারে।"

উপসংহার

জ্ঞান-বিজ্ঞানের এক অতুলনীয় ধর্ম হিসেবে ইসলামের অন্তর্নিহিত প্রকৃতি শিক্ষাক্ষেত্রে—বিশেষ করে উচ্চশিক্ষায়—এক সুগভীর প্রভাব বিস্তার করেছে, যা কেবল মুসলিম বিশ্বেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এর সীমানাও ছাড়িয়ে গেছে। একটি সুদৃঢ় উচ্চশিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার সংস্কৃতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ইসলাম পাশ্চাত্যের চেয়েও কয়েক শতাব্দী এগিয়ে ছিল। এই সংস্কৃতি, যা ধ্রুপদী ইসলামি সভ্যতার একটি অসামান্য বৈশিষ্ট্য ছিল, তা খোদ ইসলাম ধর্মের আত্মপরিচয়কেই প্রতিফলিত করত। আর এই পরিচয়টি হলো 'তাওহিদি'; এই অর্থে যে, এটি চূড়ান্ত একত্ববাদের (আল-তাওহিদ) নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত।

অতীত বা ঐতিহ্যবাহী মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের প্রাতিষ্ঠানিক আত্মপরিচয়ে—বিশেষ করে তাদের শিক্ষাক্রমে—এই সত্যটিকেই চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছিল। বর্তমানে একুশ শতকের সমসাময়িক মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো—কীভাবে তারা ঐতিহ্যবাহী ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বের নির্দেশনায় শিক্ষাক্রম সমন্বয়ের এমন একটি কার্যকর মডেল তৈরি করতে পারে, যা ঐতিহ্যবাহী ইসলামি জ্ঞান ও আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ জ্ঞানের মধ্যে একটি সফল মেলবন্ধন বা সংশ্লেষ ঘটাবে, অথচ একইসাথে এর মধ্যে একটি সুস্পষ্ট 'তাওহিদি চরিত্র'ও দৃশ্যমান থাকবে।

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter