দত্তক গ্রহণ একটি মানবিক দায়িত্ব: সহানুভূতি ও সামাজিক দায়িত্ববোধের ইসলামী নৈতিক প্রতিফলন

 ভূমিকা

আজকের পৃথিবী যুদ্ধ, দারিদ্র্য, বাস্তুচ্যুতি ও সামাজিক বৈষম্যে পরিপূর্ণ—যার ফলে লাখো শিশু পিতামাতা হারিয়ে নিঃসঙ্গ ও অসহায় হয়ে পড়েছে। তারা শুধু আর্থিক দারিদ্র্যের নয়, বরং মানবিক অবহেলারও শিকার। সমাজ যখন এই শিশুদের প্রতি তাদের নৈতিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তখন দত্তক গ্রহণ বা এতিমের লালন-পালন কেবল ব্যক্তিগত দয়ার কাজ নয়; বরং তা মানবতার প্রতি গভীর এক প্রতিক্রিয়া হয়ে দাঁড়ায়।

সাধারণভাবে “দত্তক গ্রহণ” বলতে বোঝায়—একটি শিশু, যার পিতা-মাতা নেই, তাকে নিজের পরিবারে স্থান দেওয়া, তার যত্ন নেওয়া, ভালোবাসা ও সুরক্ষা প্রদান করা। কিন্তু ইসলামী দৃষ্টিতে এই ধারণাটি কাফালাহ্ (الكفالة) নামে পরিচিত—যা আইনগত মালিকানা নয়, বরং নৈতিক অভিভাবকত্ব বা দায়িত্বশীল তত্ত্বাবধান। পশ্চিমা আইনি দত্তক প্রথার বিপরীতে, কাফালাহ্ শিশুর জৈবিক বংশধারা অক্ষুণ্ণ রাখে এবং অভিভাবকের উপর আর্থিক, মানসিক ও সামাজিক দায়িত্ব আরোপ করে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক প্রশ্ন দেখা দেয়—দত্তক গ্রহণ কি কেবল ব্যক্তিগত দয়ার কাজ, নাকি ইসলামে এটি মানবিক ও নৈতিক কর্তব্য? ইসলামী নৈতিকতায় এর উত্তর নিহিত রয়েছে তিনটি মূলনীতিতে—রহমাহ্ (সহানুভূতি), মাস’উলিয়্যাহ ইজতিমাইয়্যাহ (সামাজিক দায়িত্ব) এবং আদল (ন্যায়বিচার)।

এই প্রবন্ধের লক্ষ্য হলো—দত্তক গ্রহণকে ইসলামী নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা; যেখানে এতিমের যত্ন কেবল দান নয়, বরং একটি নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব, যা করুণা, ন্যায় ও সামাজিক মমত্ববোধের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত।

মানবিক সংকট ও দত্তক গ্রহণের নৈতিক প্রয়োজনীয়তা

আধুনিক পৃথিবী আজ গভীর মানবিক সংকটের মুখোমুখি। যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দারিদ্র্য ও সামাজিক অস্থিতিশীলতায় কোটি কোটি শিশু তাদের পিতা-মাতার স্নেহ ও নিরাপত্তা হারিয়েছে। এই শিশুদের অনেকে অনাহার, নির্যাতন ও মানসিক আঘাতের শিকার। আন্তর্জাতিক রিপোর্টগুলো জানায়—এতিম শিশুদের একটি বিশাল অংশই আশ্রয়হীন ও অবহেলিত। এই বাস্তবতা কেবল সামাজিক নয়; বরং একটি নৈতিক চ্যালেঞ্জ—মানবজাতি কীভাবে এই অসহায়দের প্রতি সাড়া দেবে?

ইসলামের দৃষ্টিতে এতিমদের যত্ন নেওয়া কোনো ঐচ্ছিক দান নয়; এটি এক গভীর নৈতিক কর্তব্য। আল্লাহ্ তাআলা বলেন—

وَأَمَّا الْيَتِيمَ فَلَا تَقْهَرْ وَأَمَّا السَّائِلَ فَلَا تَنْهَرْ
“অতএব, এতিমের প্রতি অবিচার করো না, আর ভিক্ষুককে তাড়িয়ে দিও না।” (সূরা আদ-দুহা ৯–১০)

রাসূলুল্লাহ বলেছেন—

“যে ব্যক্তি এতিমের দায়িত্ব নেয়, আমি ও সে জান্নাতে এমন হব,” —এবং তিনি দুই আঙুল পাশাপাশি দেখান। (সহীহ বুখারী)

এই শিক্ষা প্রমাণ করে যে দত্তক বা কাফালাহ্ ইসলামে আল্লাহর করুণার সামাজিক প্রতিফলন। এটি ব্যক্তিগত দয়া নয়, বরং সমাজের নৈতিক ভিত্তি দৃঢ় করার একটি মাধ্যম। এতিমদের যত্ন নেওয়ার মাধ্যমে মুমিন ব্যক্তি কেবল আত্মিক কর্তব্যই পূর্ণ করেন না; বরং মানবিক মর্যাদা পুনঃস্থাপনেও ভূমিকা রাখেন। তাই কাফালাহ্ শুধু দয়ার কাজ নয়, এটি ঈমানের বাস্তব প্রতিফলন—যেখানে বিশ্বাস ন্যায় ও মানবতার সঙ্গে মিলিত হয়।

 ইসলামে দত্তক ও কাফালাহ্-এর ধারণা

সমসাময়িক দত্তক গ্রহণ পদ্ধতিতে সাধারণত একটি শিশুর জৈবিক পিতা-মাতার সকল অধিকার ও দায়িত্ব আইনগতভাবে দত্তক গ্রহণকারীর কাছে হস্তান্তরিত হয়। কিন্তু ইসলামে দত্তক গ্রহণ এই অর্থে স্বীকৃত নয়। ইসলাম শিশু যত্নকে স্বাগত জানায়, কিন্তু তার বংশধারা গোপন বা পরিবর্তন করা নিষিদ্ধ করেছে। ইসলামী বিকল্প ব্যবস্থা হলো কাফালাহ্, যার অর্থ হচ্ছে—একটি শিশুর দায়িত্ব গ্রহণ করা, তার ভরণ-পোষণ, শিক্ষা ও লালন-পালনের দায়িত্ব পালন করা, তবে তার প্রকৃত পিতার নাম ও পরিচয় অক্ষুণ্ণ রাখা।

কুরআনে আল্লাহ বলেন—

مَا جَعَلَ اللَّهُ لَكُمْ أَبْنَاءَكُمُ الَّذِينَ تَدَّعُونَهُمْ... فَادْعُوهُمْ لِآبَائِهِمْ ذَلِكُمْ أَقْسَطُ عِندَ اللَّهِ
“আল্লাহ তোমাদের দত্তকপুত্রদের প্রকৃত পুত্র করেননি... তাদের পিতাদের নামে ডেকো—এটাই আল্লাহর কাছে অধিক ন্যায়সঙ্গত।” (সূরা আল-আহযাব ৪–৫)

এই আয়াত নবী করিম ও তাঁর দত্তকপুত্র জায়েদ ইবনে হারিসার প্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়। রাসূল তাঁকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন, কিন্তু তাঁর বংশধারা জায়েদ ইবনে হারিসা হিসেবেই রইল। এর মাধ্যমে ইসলাম স্পষ্ট করে যে—ভালোবাসা ও যত্ন গ্রহণযোগ্য, কিন্তু বংশ পরিচয় পরিবর্তন নয়।

অতএব কাফালাহ্ হলো নৈতিক অভিভাবকত্ব—যেখানে শিশুর পরিচয় ও অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তার সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করা হয়। এটি দয়া ও ন্যায়ের সমন্বিত এক ইসলামী নৈতিক মডেল, যা মানবতার সুরক্ষা ও ন্যায়বিচারের সমান্তরাল বাস্তবায়ন ঘটায়।

 ইসলামী মানবিক নীতির কেন্দ্রবিন্দু: রহমাহ্ (সহানুভূতি)

ইসলামী নৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে রহমাহ্—অর্থাৎ করুণা ও সহানুভূতি। এটি কেবল অনুভূতি নয়, বরং আল্লাহর একটি গুণ, যা মানব আচরণের দিকনির্দেশক। কুরআনে বলা হয়েছে—

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ
“আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছি।” (সূরা আল-আম্বিয়া ১০৭)

এই রহমাহ্ মানে নিছক দয়া নয়; এটি সক্রিয় অংশগ্রহণ—অন্যের কষ্ট লাঘব করা, অসহায়কে আশ্রয় দেওয়া এবং মর্যাদা ফিরিয়ে আনা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দত্তক গ্রহণ বা কাফালাহ্ কেবল উদারতার প্রকাশ নয়; এটি আল্লাহর রহমতের বাস্তব রূপ।

রাসূলুল্লাহ নিজ জীবনে করুণার এই শিক্ষা বাস্তবায়ন করেছেন। তিনি ক্ষুধার্তকে আহার দিয়েছেন, এতিমকে আশ্রয় দিয়েছেন, শিশুদের প্রতি অপরিসীম স্নেহ দেখিয়েছেন। এইভাবে রহমাহ্ ইসলামে শুধু আবেগ নয়, বরং ন্যায়ভিত্তিক সামাজিক কর্মের রূপ নিয়েছে।

কাফালাহ্ এই রহমাহ্‌কে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনে—যেখানে ভালোবাসা ও দায়িত্ব একসঙ্গে চলে। শিশুর বংশরক্ষা ও পরিচয় সংরক্ষণ করে তাকে নিরাপত্তা ও যত্ন দেওয়া ইসলামের নৈতিক বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ। সুতরাং, রহমাহ্ ইসলামে এমন এক কার্যকর নীতি যা ব্যক্তিগত দয়া থেকে সামাজিক দায়িত্বে রূপ নেয়।

 সামাজিক দায়িত্ব ও নৈতিক সমাজ গঠন

ইসলাম মানুষকে এক নৈতিক সমাজের সদস্য হিসেবে বিবেচনা করে, যেখানে প্রত্যেকের দায়িত্ব অন্যের কল্যাণে অবদান রাখা। এই ধারণাকে বলা হয় মাস’উলিয়্যাহ ইজতিমাইয়্যাহ — সামাজিক দায়িত্ববোধ। রাসূলুল্লাহ বলেছেন—

“তোমাদের প্রত্যেকেই একজন রাখাল, এবং প্রত্যেকে তার পালিতদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।” (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)

এই হাদীস সমাজের প্রতিটি ব্যক্তিকে একটি নৈতিক দায়বদ্ধতার আওতায় আনে। এতিম বা পরিত্যক্ত শিশুর যত্ন তাই কেবল ব্যক্তিগত ইচ্ছা নয়; বরং এটি এক সামষ্টিক কর্তব্য (ফরযে কিফায়াহ্)।

কুরআন বারবার এতিম ও দরিদ্রের যত্নকে ঈমানের সঙ্গে যুক্ত করেছে—

لَيْسَ الْبِرَّ أَنْ تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ... وَلَكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ... وَآتَى الْمَالَ عَلَى حُبِّهِ ذَوِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينَ
“পূর্ব বা পশ্চিমে মুখ ফিরানোই ধার্মিকতা নয়; বরং ধার্মিক সে, যে আল্লাহতে বিশ্বাস রাখে... এবং ধন-সম্পদ ব্যয় করে আত্মীয়, এতিম ও অভাবগ্রস্তদের জন্য।” (সূরা আল-বাকারা ১৭৭)

সুতরাং, দত্তক বা কাফালাহ্ ইসলামি সমাজে এমন এক নৈতিক উদ্যোগ যা মানব মর্যাদা পুনরুদ্ধার করে, ভালোবাসা ও সামাজিক বন্ধন জোরদার করে। এটি এমন এক সমাজের নির্মাণের পথ দেখায় যেখানে কেউ অবহেলিত নয়, কেউ অনাথ নয়।

 আইন ও করুণার ভারসাম্য: মানবিক কাফালাহ্-এর মডেল

ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য হলো—আইন ও করুণার মধ্যে ভারসাম্য। দান, সহানুভূতি ও ন্যায়ের সীমারেখা ইসলাম নির্ধারণ করেছে যেন কোনো আবেগ ন্যায়ের ক্ষতি না করে। কাফালাহ্ এই ভারসাম্যের বাস্তব উদাহরণ। এতে শিশুর প্রতি ভালোবাসা, যত্ন ও অভিভাবকত্ব দেওয়া হয়, কিন্তু তার জৈবিক বংশ ও পরিচয় রক্ষা করা হয়। কুরআনে বলা হয়েছে—

فَادْعُوهُمْ لِآبَائِهِمْ ذَلِكُمْ أَقْسَطُ عِندَ اللَّهِ
“তাদেরকে তাদের পিতাদের নামে ডাকো—এটাই আল্লাহর কাছে অধিক ন্যায়সংগত।” (সূরা আল-আহযাব ৫)

অনেক মুসলিম রাষ্ট্র যেমন মরক্কো, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া এই কাফালাহ্ প্রথাকে আইনি কাঠামোর মধ্যে এনে সামাজিক কল্যাণমূলক উদ্যোগে পরিণত করেছে। এটি প্রমাণ করে যে ইসলামি কাফালাহ্ মানবতার এমন একটি মডেল, যেখানে আইনি ন্যায্যতা ও নৈতিক দয়া একত্রে কাজ করে।

ইসলাম দত্তক গ্রহণকে কেবল দান নয়, বরং সামাজিক সংস্কারের একটি রূপ হিসেবে দেখতে আহ্বান জানায়—যেখানে ভালোবাসা, ন্যায় ও দায়িত্ব একত্রে মিশে শিশুর জীবন ও সমাজ উভয়কেই আলোকিত করে।

উপসংহার

কাফালাহ্ ইসলামের মানবিক নৈতিকতার সর্বোচ্চ প্রতিফলন। এটি শুধুমাত্র দয়ার কাজ নয়, বরং এমন এক নৈতিক দায়িত্ব যা রহমাহ্ (সহানুভূতি), আদল (ন্যায়) ও মাস’উলিয়্যাহ ইজতিমাইয়্যাহ (সামাজিক দায়িত্ব) —এই তিন মূলনীতির সম্মিলন ঘটায়। এতিম ও পরিত্যক্ত শিশুর যত্নের মাধ্যমে মুসলমানরা আল্লাহর প্রতি আত্মিক কর্তব্য পালন করার পাশাপাশি সমাজের সবচেয়ে দুর্বল সদস্যদের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।

কুরআন ও সুন্নাহ্ উভয়ই এতিমের অধিকার সংরক্ষণ ও তত্ত্বাবধানের নৈতিক কাঠামো তৈরি করেছে। রাসূলুল্লাহ দেখিয়েছেন—সত্যিকারের করুণা সবসময় ন্যায়ের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ হতে হবে। কাফালাহ্ সেই ভারসাম্যের বাস্তব প্রকাশ, যা শিশুর পরিচয় অক্ষুণ্ণ রেখে তাকে স্নেহ ও সুরক্ষা প্রদান করে।

আজকের এই মানবিক সংকটপূর্ণ যুগে, যখন যুদ্ধ ও অবহেলায় লক্ষ লক্ষ শিশু আশ্রয়হীন, তখন কাফালাহ্ প্রথার চেতনা আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। এটি শুধু ব্যক্তিগত কর্তব্য নয়; বরং সমাজের সম্মিলিত নৈতিক দায়িত্ব। কুরআন বলে—

وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَى حُبِّهِ مِسْكِينًا وَيَتِيمًا وَأَسِيرًا
“তারা নিজেরা ভালোবাসা সত্ত্বেও খাদ্য দান করে অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দীদের, [বলতে থাকে] আমরা তোমাদের খাওয়াই কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য; তোমাদের থেকে আমরা কোনো প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতা চাই না।” (সূরা আল-ইনসান ৮–৯)

অতএব, কাফালাহ্ ইসলামি মানবিক চেতনার মূল সুর—যা ব্যক্তিগত ভালোবাসাকে সামাজিক দায়িত্বে রূপ দেয়, এবং আল্লাহর রহমতকে বাস্তব মানবসেবায় রূপান্তরিত করে। এটি এমন এক কর্মনীতি, যা শিশুর জীবন বদলায়, সমাজকে পুনর্জাগরিত করে, এবং মানবতাকে ন্যায় ও করুণার পথে ফিরিয়ে আনে।

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter