নূহ (আ.)-এর কিশতির রহস্য আরও গভীর: আরারাত পর্বতের কাছে নতুন অনুসন্ধানে উঠে আসছে নানা তথ্য
তুরস্কের আরারাত পর্বতের কাছে নৌকার মতো দেখতে একটি ভূতাত্ত্বিক গঠন নিয়ে নতুন করে গবেষণা শুরু হয়েছে। ৬০ ফুটেরও বেশি গভীর পর্যন্ত খনন, মাটির নমুনা সংগ্রহ এবং আশপাশে মাটির পাত্রের ভগ্নাংশ আবিষ্কার—নূহ (আ.)-এর কিশতি নিয়ে দীর্ঘদিনের রহস্যে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা।
নূহ (আ.)-এর কিশতি নিয়ে শতাব্দীপ্রাচীন রহস্য আবারও আলোচনায় এসেছে। তুরস্কের পূর্বাঞ্চলে আরারাত পর্বতের কাছে একটি অস্বাভাবিক ভূতাত্ত্বিক গঠনকে কেন্দ্র করে গবেষকরা নতুন করে অনুসন্ধান চালাচ্ছেন। মাটির নমুনা সংগ্রহ, গভীর পর্যন্ত খনন এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের অনুসন্ধানের মাধ্যমে তাঁরা গঠনটির প্রকৃত উৎস সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
গবেষণার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো দুরুপিনার ফরমেশন (Durupınar Formation)। ১৯৫৯ সালে শনাক্ত হওয়া এই ভূতাত্ত্বিক গঠনটির আকৃতি অনেকের কাছে নৌকার মতো মনে হয়েছে। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরেই কিছু গবেষক ও ধর্মীয় আগ্রহী ব্যক্তি এটিকে নূহ (আ.)-এর কিশতির সম্ভাব্য অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করে আসছেন।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এখনও পর্যন্ত এই গঠনটিকে নূহ (আ.)-এর কিশতি হিসেবে নিশ্চিত করা যায়নি। সাম্প্রতিক খনন ও নমুনা সংগ্রহ গবেষণার নতুন ধাপ মাত্র। সংগৃহীত উপাদানের পরীক্ষাগারভিত্তিক বিশ্লেষণের ফলই নির্ধারণ করতে সাহায্য করবে, এখানে প্রাচীন মানবনির্মিত কাঠামোর কোনো প্রমাণ রয়েছে কি না।
৬০ ফুটেরও বেশি গভীরে খনন
নূহ (আ.)-এর কিশতি অনুসন্ধান প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত গবেষকরা দুরুপিনার ফরমেশনের নিচে ৬০ ফুটেরও বেশি, অর্থাৎ প্রায় ১৮ মিটার গভীর পর্যন্ত খনন করেছেন বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ভূগর্ভে কী ধরনের উপাদান রয়েছে, তা বোঝাই এই অনুসন্ধানের অন্যতম উদ্দেশ্য।
গবেষকরা গঠনটির ভেতরে ও বাইরের বিভিন্ন স্থান থেকে শত শত মাটির নমুনা সংগ্রহ করেছেন। ২০২৬ সালের গবেষণা অভিযান নিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে প্রায় এক হাজার নমুনা সংগ্রহের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্পের ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জোনসের বক্তব্য অনুযায়ী, খননের সময় গবেষকরা মূলত মাটির সন্ধান পেয়েছেন; শক্ত চুনাপাথর বা অন্য কোনো কঠিন শিলাস্তর নয়। সংগৃহীত নমুনায় পচে যাওয়া কাঠ, জৈব পদার্থ কিংবা প্রাচীন কাঠামোর কোনো চিহ্ন রয়েছে কি না, তা পরীক্ষার মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে খননের সময় শক্ত শিলার পরিবর্তে মাটি পাওয়া যাওয়াই যে সেখানে প্রাচীন কোনো নৌযান রয়েছে, তার প্রমাণ নয়। গঠনটির প্রকৃতি বুঝতে ভূতাত্ত্বিক পরীক্ষা ও পরীক্ষাগারের বিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মাটিতে কার্বনের পরিমাণ বেশি?
সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে আলোচনায় এসেছে গঠনটির ভেতর থেকে সংগ্রহ করা মাটিতে কার্বনের পরিমাণের পার্থক্য।
গবেষকদের দাবি অনুযায়ী, গঠনটির ভেতরের মাটির নমুনায় আশপাশের এলাকার নমুনার তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি কার্বন পাওয়া গেছে। এই পার্থক্য মাটিতে জৈব পদার্থের উপস্থিতি নির্দেশ করতে পারে। এর মধ্যে পচে যাওয়া উদ্ভিদজাত উপাদান বা কাঠের অবশেষও থাকতে পারে।
গবেষকদের কাছে এই তথ্য আরও পরীক্ষার একটি কারণ তৈরি করেছে। যদি জৈব পদার্থের উৎস নির্ধারণ করা যায় এবং সেগুলোর বয়স নির্ভরযোগ্যভাবে জানা সম্ভব হয়, তাহলে গঠনটির ইতিহাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
তবে মাটিতে কার্বনের পরিমাণ বেশি থাকলেই সেখানে কাঠের তৈরি প্রাচীন নৌযান ছিল, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। প্রাকৃতিকভাবেও মাটিতে জৈব পদার্থ থাকতে পারে। তাই এর উৎস ও বয়স নির্ধারণের জন্য বিস্তারিত পরীক্ষার প্রয়োজন।
আশপাশে মাটির পাত্রের ভগ্নাংশ
২০২৬ সালের অনুসন্ধানে দুরুপিনার ফরমেশনের আশপাশের এলাকায় মাটির পাত্রের কিছু ভগ্নাংশও পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষকদের ধারণা, এই ভগ্নাংশগুলি ওই অঞ্চলে প্রাচীন মানববসতির ইতিহাস বুঝতে সাহায্য করতে পারে। তবে এগুলোর সুনির্দিষ্ট বয়স এখনও নিশ্চিতভাবে নির্ধারিত হয়েছে বলে জানা যায়নি।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে: মাটির পাত্রের ভগ্নাংশগুলি নৌকার মতো দেখতে গঠনটির আশপাশে পাওয়া গেছে, গঠনটির ভেতরে নয়। ফলে এগুলি ওই অঞ্চলে অতীতে মানুষের উপস্থিতির সম্ভাবনা নির্দেশ করলেও নূহ (আ.)-এর কিশতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণ করে না।
ভগ্নাংশগুলির বয়স, নির্মাণপদ্ধতি এবং প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব নির্ধারণের জন্য আরও পরীক্ষা প্রয়োজন। তবু এই আবিষ্কার অনুসন্ধানে নতুন প্রত্নতাত্ত্বিক প্রশ্ন যুক্ত করেছে।
কেন আরারাত পর্বতকে ঘিরে এই রহস্য?
পবিত্র কুরআন ও বাইবেলে নূহ (আ.)-এর কিশতি ও মহাপ্লাবনের বিবরণ রয়েছে। বাইবেলের আদিপুস্তকের বর্ণনা অনুযায়ী, মহাপ্লাবনের পর কিশতিটি আরারাতের পর্বতমালায় এসে স্থির হয়।
এই বর্ণনাকে কেন্দ্র করে বহু শতাব্দী ধরে গবেষক, অভিযাত্রী এবং ধর্মীয় অনুসন্ধানীরা কিশতির সম্ভাব্য অবস্থান খুঁজে আসছেন।
দুরুপিনার ফরমেশন এই অনুসন্ধানের অন্যতম আলোচিত স্থান হয়ে ওঠে, কারণ ওপর থেকে দেখলে এর দীর্ঘায়িত আকৃতি অনেকটা নৌকার মতো মনে হয়। ১৯৫৯ সালে গঠনটি শনাক্ত হওয়ার পর থেকেই এটি নিয়ে আগ্রহ বাড়তে থাকে।
আধুনিক গবেষণায় আকাশ থেকে তোলা ছবি, ভূগর্ভস্থ কাঠামো শনাক্ত করার রাডার প্রযুক্তি এবং অন্যান্য ভূ-পদার্থবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু গবেষক ভূগর্ভে শনাক্ত হওয়া অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যকে সম্ভাব্য অভ্যন্তরীণ কক্ষ বা কাঠামোগত অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
তবে এসব ব্যাখ্যা এখনও অনুমাননির্ভর। রাডারে ভূগর্ভস্থ বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করা গেলেও সেগুলি মানুষের তৈরি কি না, কিংবা কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক বস্তুর অংশ কি না, তা শুধু রাডারের তথ্য দিয়ে নিশ্চিত করা যায় না।
সাম্প্রতিক খনন ও নমুনা সংগ্রহের উদ্দেশ্য হলো—এ ধরনের দাবিকে বাস্তব উপাদানের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা।
বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক এখনও অব্যাহত
দুরুপিনার ফরমেশন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ভূতাত্ত্বিকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। ১৯৯৬ সালে Journal of Geoscience Education-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় গঠনটিকে নূহ (আ.)-এর কিশতি নয়, বরং প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক কাঠামো হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল।
এই মূল্যায়ন বর্তমান গবেষণার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো গঠনের আকৃতি নৌকার মতো হওয়া, মাটিতে কার্বনের পরিমাণের পার্থক্য কিংবা ভূগর্ভে অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য শনাক্ত হওয়া—কোনোটিই এককভাবে মানবনির্মিত প্রাচীন নৌযানের প্রমাণ নয়।
দুরুপিনার ফরমেশনকে নূহ (আ.)-এর কিশতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে গবেষকদের এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ দিতে হবে, যা দেখাবে যে গঠনটি প্রাকৃতিক নয়, বরং মানুষের তৈরি। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট উপাদানগুলির প্রাচীনত্ব এবং সেগুলির সঙ্গে প্রস্তাবিত ঐতিহাসিক ঘটনার সম্পর্কও বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করতে হবে।
বর্তমান অনুসন্ধানে সংগৃহীত নমুনাগুলি এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে সাহায্য করতে পারে। তবে গঠনটি মানুষের তৈরি, প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট, নাকি অন্য কোনো কারণে এমন আকৃতি পেয়েছে—তা এখনও নিশ্চিত নয়।
এবার কী হবে?
২০২৬ সালের মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানের পর এখন সংগৃহীত নমুনাগুলির পরীক্ষাগারভিত্তিক বিশ্লেষণের দিকে নজর রয়েছে। গবেষকরা মাটির উপাদান, জৈব পদার্থ এবং সম্ভাব্য প্রাচীন অবশেষ পরীক্ষা করে গঠনটির বয়স ও উৎপত্তি সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করবেন।
২০২৬–২০২৭ সালের শীতকালীন সময়ে গবেষণার পরবর্তী ধাপ নিয়ে কাজ এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার কথাও প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৭ সালে এই গবেষণা থেকে আরও বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রকাশিত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই পরীক্ষাগুলি গঠনটির ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস বুঝতে সাহায্য করতে পারে। মাটির অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যগুলির প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা রয়েছে, নাকি সেগুলি আরও প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের দাবি রাখে—সেটিও স্পষ্ট হতে পারে।
তবে পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হওয়ার আগে নূহ (আ.)-এর কিশতি আবিষ্কারের দাবি নিশ্চিতভাবে করা যায় না।
উপসংহার: প্রাচীন রহস্যের নতুন অধ্যায়
আরারাত পর্বতের কাছে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে গভীর খনন, নতুন মাটির নমুনা এবং প্রত্নতাত্ত্বিক প্রশ্নের মাধ্যমে নূহ (আ.)-এর কিশতি অনুসন্ধানে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। গঠনটির ভেতরের মাটিতে তুলনামূলক বেশি কার্বন, আশপাশে মাটির পাত্রের ভগ্নাংশ এবং ৬০ ফুটেরও বেশি গভীর থেকে সংগৃহীত উপাদান—সবকিছুই গবেষকদের সামনে নতুন অনুসন্ধানের সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে আকর্ষণীয় তথ্য আর চূড়ান্ত প্রমাণ এক বিষয় নয়। এখনও পর্যন্ত কোনও আবিষ্কারই নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করেনি যে দুরুপিনার ফরমেশন নূহ (আ.)-এর কিশতি।
আপাতত স্থানটি একটি চলমান বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দু। পরীক্ষাগারের ফলাফল এর উৎপত্তি ও ইতিহাস সম্পর্কে আরও আলোকপাত করতে পারে।
নূহ (আ.)-এর কিশতির সঙ্গে এই গঠনের আদৌ কোনও সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনও অমীমাংসিত। নতুন গবেষণা ভূতত্ত্ব ও প্রত্নতত্ত্বের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে, কিন্তু কিশতির রহস্যের চূড়ান্ত সমাধান এখনও অধরা।