সমস্থম হুদা: কেরালার বক্ষ চিরে ভারতের দিগন্তে এক রূহানি ইনকিলাবের মহাকাব্য

আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা পবিত্র কোরান শারীফে ইরশাদ করেনঃ

 يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ

(মহান আল্লাহ তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে ইলম বা প্রজ্ঞা দান করা হয়েছে, তাঁদের মর্যাদা বহুগুণ বুলন্দ করে দেবেন। — সূরা আল-মুজাদালাহ: ১১)

আল্লাহর রাসুল প্রিয়নাবী মুহাম্মাদ বলেছেনঃ

 مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا سَهَّلَ اللَّهُ لَهُ بِهِ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ

(যে ব্যক্তি জ্ঞান অন্বেষণের পবিত্র পথে পদচারণা করে, মহান আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সুগম করে দেন। — সহিহ মুসলিম)

মহাকালের অনন্ত প্রবাহে কিছু দিন কেবল দিনপঞ্জিকার শুষ্ক অঙ্ক হয়ে থাকে না; বরং সেগুলো হয়ে ওঠে ইতিহাসের একেকটি স্পন্দিত হৃদয়, উম্মাহর আত্মজাগরণের অনির্বচনীয় মাইলফলক। জুনের পঁচিশ ও ছাব্বিশ তারিখ—এই দু’টি দিন ভারতীয় উপমহাদেশের, বিশেষ করে কেরালার মুসলিম উম্মাহর জন্য কেবল দু’টি তারিখ নয়, বরং এক সুবিশাল রূহানি ইনকিলাব ও বুদ্ধিবৃত্তিক নবজাগরণের স্মারক। পঁচিশে জুন দারুল হুদা ইসলামিক ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠা দিবস এবং ছাব্বিশে জুন সমস্থ কেরালা জমিয়তুল উলামার প্রতিষ্ঠা দিবস। কালপরিক্রমায় এই দু’টি প্রতিষ্ঠানের জন্মলগ্ন যেন একই ঐশী সুতোয় গাঁথা, যার মূল সুর হলো ঈমান ও ইলমের এক অপূর্ব মোহনা তৈরি করা। এ বছরের আমাদের স্লোগান বা মর্মবাণী হলো— ‘সমস্থম হুদা’ (Samastham Huda)। এই গভীর তাৎপর্যমণ্ডিত বাক্যটির অর্থ হলো— ‘সবকিছুই সুন্দর, সবকিছুই হিদায়াতপ্রাপ্ত এবং ঐশী রহমতে ধন্য’। এক পরম নির্ভরতা ও তাওয়াক্কুলের সুর অনুরণিত হচ্ছে এই বাণীতে, যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, এই দীর্ঘ পথচলায় আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের খাস রহমত ও বরকত ছায়ার মতো আমাদের সঙ্গী ছিল।

১৯৮৬ সালে যে ক্ষুদ্র অথচ ঐকান্তিক বীজটি রোপিত হয়েছিল, তা আজ মহীরুহে পরিণত হয়ে তার ৪২তম বছরে পদার্পণ করেছে। দারুল হুদা ইসলামিক ইউনিভার্সিটি আজ কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের নাম নয়, এটি একটি জীবন্ত দর্শন, একটি প্রবহমান নদী, যা তার অমৃত বারিধারায় তৃষ্ণার্ত আত্মাকে সিক্ত করে চলেছে। এই সুবিশাল শিক্ষাবিপ্লব, এই রূহানি রেনেসাঁ কখনোই সম্ভব হতো না, যদি না এর নেপথ্যে আমাদের মহান পূর্বসূরি, প্রতিষ্ঠাতা পিতাদের নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ ও কুরবানি থাকত। ডক্টর ইউ. বাপুত্তি হাজি, সি. এইচ. আইদারুস মুসলিয়ার, এম. এম. বশীর মুসলিয়ার এবং তাঁদের সমমনা অসংখ্য মুখলিস আলেমে দ্বীন ও সমাজদরদী ব্যক্তিত্ব নিজেদের ঘাম, মেধা ও রক্তের বিনিময়ে এই ইমারতের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। তাঁদের অন্তর ছিল ইখলাসে পরিপূর্ণ, আর দৃষ্টি ছিল সুদূরপ্রসারী। তাঁরা কেবল একটি শিক্ষালয় গড়তে চাননি, তাঁরা চেয়েছিলেন এমন এক আলোকবর্তিকা প্রজ্বালন করতে, যার প্রদীপ্ত শিখা যুগ যুগ ধরে অজ্ঞতার অমানিশা দূর করবে।

আজ কেরালার মুসলিম সমাজ যে উন্নত জীবনযাত্রা, আর্থসামাজিক স্থিতিশীলতা এবং দ্বীনি ও দুনিয়াবি শিক্ষার এক অপূর্ব সমন্বিত শিখরে অবস্থান করছে, তা একদিনে বা জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় অর্জিত হয়নি। এটি হলো সমস্থ কেরালা জমিয়তুল উলামা এবং দারুল হুদা—এই দুই মহান শক্তির যুগপৎ মেহনত ও নিরলস অবদানের এক চূড়ান্ত ফসল। ঔপনিবেশিক শক্তির নিষ্পেষণ ও তৎপরবর্তী রাজনৈতিক ও সামাজিক অবদমনের ফলে কেরালার মুসলিম সমাজ যখন এক গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল, তখন ১৯২৬ সালে ‘সমস্থ’-এর আত্মপ্রকাশ ঘটে উম্মাহর আকিদা ও ঐতিহ্য রক্ষার এক মজবুত ঢাল হিসেবে। সমস্থ কেরালা জমিয়তুল উলামা মক্তব শিক্ষার মাধ্যমে প্রতিটি মুসলিম শিশুর অন্তরে ঈমানের বীজ বপন করেছিল। কিন্তু যুগ ও কালের আবর্তনে কেবল প্রাথমিক শিক্ষাই যথেষ্ট ছিল না; প্রয়োজন ছিল এমন এক উচ্চতর ইসলামী বিদ্যাপীঠের, যা সমকালীন বিশ্বের চ্যালেঞ্জগুলোকে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে। আর সেই ঐতিহাসিক প্রয়োজনেরই এক ঐশী প্রতিষেধক হিসেবে ১৯৮৬ সালে আবির্ভূত হয় দারুল হুদা।

সমস্থ এবং দারুল হুদা কেরালার মুসলিম সমাজকে বুঝিয়েছে যে, ইসলাম বৈরাগ্যের ধর্ম নয়। আখেরাতের মুক্তির পাশাপাশি দুনিয়ার বুকে এক মর্যাদাপূর্ণ, ইনসাফভিত্তিক ও প্রগতিশীল জীবনযাপন করা মুমিনের অধিকার। তাঁরা এমন এক শিক্ষাব্যবস্থার প্রবর্তন করলেন, যেখানে একজন তালিবুল ইলম বা শিক্ষার্থী একইসঙ্গে কুরআন-হাদিস, ফিকহ-তাফসিরের গভীর পাণ্ডিত্যের অধিকারী হবে, আবার পাশাপাশি আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সমাজবিজ্ঞান ও ভাষায় সমানভাবে পারদর্শী হবে। আজ কেরালার মুসলিমরা যে ভারতের অন্যান্য প্রান্তের তুলনায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও সামাজিক ঐক্যের দিক থেকে এতটা অগ্রসর, তার পেছনের মূল কারিগর হলো এই দুই প্রতিষ্ঠান। তাঁরা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ইসলামী আদব ও আখলাকের যে সুবাস ছড়িয়ে দিয়েছেন, তা সমাজকে অপরাধমুক্ত, সংবেদনশীল ও মানবিক করে তুলেছে।

কিন্তু দারুল হুদার স্বপ্নদ্রষ্টারা কেবল কেরালার ভৌগোলিক সীমানার মধ্যেই নিজেদের আবদ্ধ রাখতে চাননি। ইসলামের সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের মহান আদর্শ—যা কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখনীতে বারবার মূর্ত হয়ে উঠেছে—তাঁদের অন্তরে সদা জাগ্রত ছিল। উম্মাহর প্রতি এক গভীর দায়বদ্ধতা থেকে, ভারতের অন্যান্য পশ্চাৎপদ ও সুবিধাবঞ্চিত রাজ্যের মুসলিমদের দিকে তাঁরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। আজ দারুল হুদার শাখা-প্রশাখা ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে বিহার, আসাম, অন্ধ্রপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, কাশ্মীর, মহারাষ্ট্র এবং কর্ণাটকের মতো রাজ্যগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে। এই অভূতপূর্ব সম্প্রসারণ কেবল ইট-পাথরের ভবন নির্মাণ নয়; এটি হলো মানুষের হৃদয়ে আস্থার এক মজবুত ইমারত গড়ে তোলা। কেরালার উলামায়ে কেরাম ও সাধারণ মানুষের অকৃত্রিম ত্যাগ, নিরলস পরিশ্রম এবং সর্বভারতীয় মুসলিমদের প্রতি তাঁদের অকৃত্রিম ভালোবাসার কারণেই আজ এই বিস্তৃতি সম্ভব হয়েছে।

এই বিস্তৃতির পেছনের আবেগ, সংগ্রাম ও অন্তহীন ত্যাগের কথা বলতে গেলে শ্রদ্ধেয় আশরাফ হুদাওয়ী সাহেবের একটি সাম্প্রতিক কথপোকথন স্বতঃস্ফূর্তভাবে হৃদয়ের ক্যানভাসে ভেসে ওঠে। তাঁর কথাগুলো কেবল কিছু শব্দমালা নয়, বরং দারুল হুদার অন্তরাত্মার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তিনি বলেন:

"আজ আমার এক বন্ধুর সাথে কথা হচ্ছিল, যে গত ৪-৫ বছর ধরে দারুল হুদার দৈনন্দিন আর্থিক বিষয়াবলির সাথে খুব ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, 'কী অবস্থা? সব চলছে কেমন?'

আমি তাকে এভাবেই জিজ্ঞেস করেছিলাম, কারণ সে দারুল হুদার উত্থান, এর ভেতরের লড়াই এবং প্রতিদিনের সংগ্রাম সম্পর্কে খুব ভালোভাবে অবগত। সে এমন একজন অফিস স্টাফ, যে প্রতিষ্ঠানটির চরম আর্থিক সংকট ও প্রতিকূলতার দিনগুলো নিজের চোখে দেখেছে এবং অন্তর দিয়ে অনুভব করেছে।

সে উত্তরে বলল, 'কোনো রকমে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা বিহারেও একটি নতুন ক্যাম্পাসের কাজ শুরু করছি। আমরা সবাই শাফি হাজি সাহেবকে বারবার বলেছিলাম, 'দয়া করে এখন নতুন করে আর কিছু শুরু করবেন না। আগে যেগুলোর কাজ চলছে, সেগুলোকে একটু স্থিতিশীল হতে দিন। এখন আবার নতুন আরেকটির কী প্রয়োজন?' সত্যি বলতে, আমি নিজেও তার সাথে একমত ছিলাম। কিন্তু পরক্ষণেই আমার বিবেক আমাকে দংশন করল এবং মন বলে উঠল: শ্রদ্ধেয় শাফি হাজি সাহেব কবে থেকে এই ধরনের হিসাব-নিকাশ ও যুক্তিনির্ভর উপদেশ শোনা শুরু করেছেন?'

যখন আসাম ক্যাম্পাসের কাজ শুরু হয়েছিল, যখন অন্ধ্রপ্রদেশের ক্যাম্পাসের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়া হয়েছিল, যখন বাংলার মাটিতে দারুল হুদার অফ-ক্যাম্পাসের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের আলোচনা চলছিল—সেই প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি সন্ধিক্ষণে তিনি হয়তো অনেকের কাছ থেকেই ঠিক একই রকমের সাবধানবাণী ও উপদেশ শুনেছিলেন।

যদি তিনি সেদিন সেই সতর্কবাণী বা আর্থিক হিসাব-নিকাশের যুক্তিতে কান দিতেন, তবে আজ বাংলার বুকে সেই অপরূপ সুন্দর, আধ্যাত্মিক স্নিগ্ধতায় ঘেরা ক্যাম্পাসটি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারত না। আসামের বুকে দারুল হুদা ক্যাম্পাসটি আজ হাজার হাজার নিরাশ্রয়, হতভাগ্য ও আশাহীন শিশুর জন্য জ্ঞানের এক বিশাল বিস্ময় হয়ে উঠত না। মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক আর হাঙ্গালের প্রান্তরে ইলমের যে প্রদীপগুলো আজ মিটিমিটি করে জ্বলছে, তা হয়তো চিরতরে নিভেই থাকত।

দারুল হুদা তার এই ঐতিহাসিক ও মহাকাব্যিক পথচলা অব্যাহত রেখেছে এক অদম্য, অবিচল সংকল্পের ওপর ভর করে—যে সংকল্প বারবার সহকর্মীদের স্নেহমাখা চোখের জল, অগণিত সাবধানবাণী, লাভ-ক্ষতির জাগতিক হিসাব এবং অজস্র নিষেধাজ্ঞাকে পরম ভালোবাসার সাথে অগ্রাহ্য করেছে।

আজ বাংলার বুকে পরিচালিত দারুল হুদার অফ-ক্যাম্পাসে মহিলা বিভাগের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলো। সেখানে আসন সংখ্যা মাত্র ৮০টি। কিন্তু জানেন? সেই ৮০টি আসনের বিপরীতে পরীক্ষা দিতে এসেছে ৪০০ জন ছাত্রী!

জ্ঞানের আলো ও শিক্ষার অক্ষরের জন্য যখন এতগুলো শিক্ষার্থী আমাদের সামনে ভিখারির মতো হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন দারুল হুদার নেতৃত্ব নিজেদের সীমাবদ্ধতার কারণে সবাইকে সুযোগ দিতে না পারার এক নিদারুণ অসহায়ত্বে ভোগে সত্য, কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতার ভয়ে তারা থমকে দাঁড়াতে পারে না। চরম প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এক বুক সাহস নিয়ে তাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতেই হয়।

একটি গোটা সমাজ, একটি আস্ত সম্প্রদায় আজ আমাদের দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে আছে। যে প্রজন্ম সারাদিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে মাঠে-ঘাটে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটে, যাদের কাছে পড়াশোনা, বই-খাতা বা স্কুলের স্বপ্নটাও কখনো ধরা দেয় না—সেই প্রজন্মের সন্তানেরা যখন আজ আমাদের দরজায় এসে কড়া নাড়ছে, আমাদের কানের কাছে এসে জ্ঞানের জন্য আকুতি জানাচ্ছে—তখন আমরা কীভাবে তাদের সেই ডাক না শুনে থাকতে পারি? কীভাবে আমরা মুখ ফিরিয়ে নিতে পারি?

দারুল হুদা আজ এক বিশাল, প্রায় অকল্পনীয় দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে। আজ দারুল হুদা মানে কেবল মাঞ্জেরির বুকে দাঁড়িয়ে থাকা সেই চার তলা ভবনটি নয়। হিদায়াত নগরের মাটিতে গভীরভাবে শিকড় গেড়ে, তার ডালপালা আজ আসাম, অন্ধ্রপ্রদেশ, বাংলা, বিহার, কাশ্মীর, মহারাষ্ট্র এবং ভারতীয় উপমহাদেশের প্রায় প্রতিটি কোণায় ছড়িয়ে পড়েছে এবং সম্প্রসারিত হয়েছে—দারুল হুদা আজ নিছক কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম নয়, এটি পরিণত হয়েছে এক মহান সংস্কৃতির, এক রূহানি আন্দোলনের অপর নামে।

আগামীকাল, পানাক্কাদ ভালিয়া তাঙ্গাল বিহারের বুকে দারুল হুদার নতুন ক্যাম্পাসের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে যাচ্ছেন। পানাক্কাদ সাঈয়িদ পরিবার দারুল হুদা নামক এই বিশাল মহীরুহের প্রতিটি ডালপালার এক অতন্দ্র প্রহরী ও আধ্যাত্মিক অভিভাবক হিসেবে যুগ যুগ ধরে দাঁড়িয়ে আছে। দারুল হুদা কি পানাক্কাদ পরিবারের, নাকি পানাক্কাদ পরিবার দারুল হুদার—এই দু’টিকে আলাদা করে দেখা একপ্রকার অসম্ভব। এই সম্মানিত সাঈয়িদ পরিবারটি পাহাড়ের মতো অবিচল দৃঢ়তায় দারুল হুদার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। এটি কেবল মুখের কথা বা স্তুতিবাক্য নয়; এটি আত্মার সাথে আত্মার এক জীবন্ত সম্পর্ক।

এই সম্পর্কের গভীরতা বোঝাতে একটি বাস্তব ঘটনার উল্লেখ করা প্রয়োজন। পানাক্কাদ পরিবারের তরুণ তাঙ্গুট্টি, যিনি নিজেও দারুল হুদার একজন প্রাক্তন ছাত্র (অ্যালামনাই), তাকে একবার দারুল হুদার প্রাক্তন ছাত্রদের সংগঠন 'হাদিয়া'-এর একটি প্রোগ্রামে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। প্রোগ্রাম শেষে তিনি যখন গাড়িতে উঠছিলেন, তখন আয়োজকরা অত্যন্ত বিনয় ও পীড়াপীড়ির সাথে তার হাতে একটি উপহারের প্যাকেট তুলে দেন। আয়োজকদের আন্তরিক জোরাজুরিতে তিনি সেটি গ্রহণ করতে বাধ্য হন। কিছুক্ষণ পর, তিনি সেই প্যাকেটটি হাতে নিয়ে আবার ফিরে আসেন। যখন তিনি বাড়ি পৌঁছান, তখন তার পিতা তাকে জিজ্ঞেস করেন, 'তোমার হাতে ওটা কিসের প্যাকেট?' তিনি উত্তর দেন, 'এটি হাদিয়া থেকে দেওয়া হয়েছে।' তখন তার পিতা এক ঐতিহাসিক ও হৃদয়স্পর্শী কথা বলেন:

'যখনই দারুল হুদা তোমাকে ডাকবে, তুমি অবশ্যই সেখানে যাবে। কিন্তু যখন তুমি সেখান থেকে ফিরে আসবে, তারা যদি তোমাকে কিছু দেয়ও, তবে আজ থেকে আর কখনো তা গ্রহণ করবে না। এখন তুমি যা পেয়েছ, তা এখনই গিয়ে ফেরত দিয়ে এসো।'

'দারুল হুদাকে কেবল দেবে। সেখান থেকে কোনো কিছু নেবে না।'—জনজীবনে পা রাখতে যাওয়া একজন তরুণের প্রতি তার পিতার এই উপদেশের মধ্যেই নিহিত ছিল ইখলাস ও ত্যাগের এক বিশাল দর্শন। সেই মহান পিতা ছিলেন পানাক্কাদ আব্বাস আলী শিহাব তাঙ্গাল। আর সেই প্রিয় পুত্রটি হলেন পানাক্কাদ সাদিক আলী শিহাব তাঙ্গাল।

আপনাকে দারুল হুদাকে কেবল দিতে হবে। সেখান থেকে কোনো পার্থিব বস্তু গ্রহণ করা যাবে না। দারুল হুদা এবং পানাক্কাদ পরিবারের মধ্যকার সম্পর্কের যে এক দুর্ভেদ্য আধ্যাত্মিক চুম্বকত্ব, তা এই কয়টি শব্দের মাঝেই পরিপূর্ণরূপে বিধৃত রয়েছে।"

আশরাফ হুদাওয়ী সাহেবের এই দীর্ঘ ও আবেগঘন বর্ণনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, দারুল হুদা কেবল ইট-সিমেন্টের তৈরি কোনো ইমারত নয়; এটি হলো অশ্রু, ঘাম, রক্ত এবং চরম ইখলাসের এক অনিন্দ্যসুন্দর স্থাপত্য। দারুল হুদার স্থপতি, শ্রদ্ধেয় বাপুত্তি হাজি সাহেবের অন্তরে যে সুগভীর উদ্বেগ ও হাহাকার ছিল, তিনি প্রায়ই আক্ষেপ করে বলতেন: "আমাদের তো পানাক্কাদ পরিবারের মতো আধ্যাত্মিক রাহবার ও সন্তানরা আছেন, কিন্তু কেরালার বাইরে ভারতের অন্যান্য প্রান্তে আমাদের যে মুসলিম ভাইয়েরা অজ্ঞতা ও দারিদ্রে নিপতিত, তাদের কে আছে?"

বাপুত্তি হাজি সাহেবের সেই বেদনাবিধুর আক্ষেপের, সেই দরদমাখা কান্নার এক ঐশী প্রতিষেধক হিসেবেই আজ দারুল হুদা সামনের দিকে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে। বাংলার সবুজ প্রান্তর থেকে শুরু করে কাশ্মীরের বরফঢাকা উপত্যকা, আসামের চা-বাগান থেকে শুরু করে বিহারের শুষ্ক সমভূমি—সর্বত্র দারুল হুদা আজ এক মুক্তির পয়গাম নিয়ে হাজির হয়েছে।

দারুল হুদার এই পথচলা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই 'অবারিত বিশ্বজনীনতার' ধারণাকে যেন ইসলামী আদলে মূর্ত করে তুলেছে, যেখানে শিক্ষার কোনো সীমানা নেই, জ্ঞানের আলো সবার জন্য উন্মুক্ত। আবার একইসাথে, এটি কাজী নজরুল ইসলামের সেই 'সাম্যবাদী ও বিদ্রোহী' আত্মার প্রতিফলন, যা সমাজের সব ধরনের অসাম্য, বঞ্চনা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে উম্মাহকে এক সুদৃঢ় ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করতে চায়। দারুল হুদা প্রমাণ করেছে যে, ইসলাম কেবল মসজিদে আবদ্ধ কোনো ধর্ম নয়; বরং এটি সমাজ গড়ার, মানুষ গড়ার এবং একটি ইনসাফভিত্তিক বিশ্ব নির্মাণের সর্বশ্রেষ্ঠ হাতিয়ার।

আজকের এই পবিত্র দিনে, যখন আমরা সমস্থ কেরালা জমিয়তুল উলামা এবং দারুল হুদার প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদ্‌যাপন করছি, তখন আমাদের কেবল অতীত নিয়ে গর্ব করলেই চলবে না। আমাদের সামনে এক বিশাল ভবিষ্যৎ অপেক্ষমাণ। উম্মাহর হাজারো সন্তান আজ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে হিদায়াতের এক চিলতে আলোর আশায়। "সমস্থম হুদা"—সবকিছুই কল্যাণকর, সবকিছুই নির্দেশিত। এই ঐশী নির্দেশনার ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে, সকল ভয় ও জাগতিক হিসাব-নিকাশকে পেছনে ফেলে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

আসুন, আমরা অন্তত আমাদের অন্তর, প্রার্থনা এবং রূহানি সমর্থন দিয়ে দারুল হুদার এই ঐতিহাসিক ও আত্মত্যাগী যাত্রার অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী হই। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের এই পথচলাকে কবুল করুন এবং দারুল হুদাকে কিয়ামত পর্যন্ত উম্মাহর হিদায়াতের এক নিরবচ্ছিন্ন আলোকবর্তিকা হিসেবে কবুল করে নিন। আমিন।

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter