দিল্লির রাজপথে ‘Jantar Mantar 2.0’—ভোটাধিকার, ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে উত্তাল ভারত, ইসলামের দৃষ্টিতে আমানতদারি ও জবাবদিহির শিক্ষা
ভূমিকা: যখন রাজপথ হয়ে ওঠে জনমতের ভাষা
একটি ভোট, একটি নাগরিকের অধিকার, আর একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা—এই তিনটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। গণতন্ত্রে নির্বাচন কেবল সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নয়; এটি জনগণের মতামত প্রকাশ, প্রতিনিধি নির্বাচনের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি প্রত্যাশার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু যখন নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন সেই প্রশ্ন শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের আলোচনাকেও সামনে নিয়ে আসে।
২০২৬ সালের ১০ অক্টোবর দিল্লির যন্তর মন্তরকে কেন্দ্র করে ‘Jantar Mantar 2.0’ নামে একটি প্রতিবাদ কর্মসূচি সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় উঠে আসে। Cockroach Janta Party (CJP) মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করে এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা Special Intensive Revision (SIR) নিয়ে আপত্তি জানায়। পুলিশ কর্মসূচির অনুমতি দেয়নি বলে সংবাদে প্রকাশিত হয় এবং রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা ও যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রতিবাদকারীদের অভিযোগ ও দাবিগুলোকে অবশ্যই যাচাইযোগ্য তথ্য, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য এবং প্রামাণ্য নথির ভিত্তিতে বিচার করা প্রয়োজন।
এই ঘটনাকে ঘিরে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি নাগরিকের আস্থা কীভাবে বজায় থাকবে? আর সেই প্রশ্নের সঙ্গে ইসলামের ন্যায়বিচার, আমানতদারি ও জবাবদিহির শিক্ষার সম্পর্ক কোথায়?
১. ‘Jantar Mantar 2.0’: প্রতিবাদের পেছনে কী রয়েছে?
দিল্লির যন্তর মন্তর দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক দাবিদাওয়া প্রকাশের পরিচিত স্থান। সেখানে বিভিন্ন সময়ে নাগরিক অধিকার, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, কর্মসংস্থান ও অন্যান্য জনস্বার্থের বিষয় নিয়ে প্রতিবাদ হয়েছে।
‘Jantar Mantar 2.0’ নামের সাম্প্রতিক কর্মসূচির কেন্দ্রে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, ভোটার তালিকার সংশোধন এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি। CJP-র পক্ষ থেকে নির্বাচনী তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে। তবে কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হওয়া এবং সেটি প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। নিরপেক্ষ অনুসন্ধান, নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এসব দাবির সত্যতা মূল্যায়ন করা সম্ভব।
একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে উত্থাপিত অভিযোগের বিচারও হওয়া উচিত তথ্যের ভিত্তিতে, অনুমান বা রাজনৈতিক আবেগের ভিত্তিতে নয়।
এখানে প্রতিবাদের পাশাপাশি আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—প্রতিবাদকারীদের দাবি, প্রশাসনের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাখ্যা জনসাধারণের সামনে স্বচ্ছভাবে তুলে ধরা।
২. ভোটাধিকার: কেবল রাজনৈতিক অধিকার নয়, নাগরিক মর্যাদার প্রশ্ন
ভোট দেওয়া একজন নাগরিকের গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ভোটার তালিকায় যোগ্য নাগরিকের নাম অন্তর্ভুক্ত থাকা এবং ভুল তথ্য সংশোধনের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য হতে পারে তালিকাকে নির্ভুল ও হালনাগাদ রাখা। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের সময় যোগ্য নাগরিক যেন অন্যায়ভাবে অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করাও জরুরি। কোনো নাগরিকের নাম বাদ পড়লে বা তথ্য ভুল থাকলে তাঁকে কারণ জানার এবং প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী সংশোধনের সুযোগ পাওয়ার ব্যবস্থা থাকা দরকার।
অন্যদিকে, নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণ করতে হলে নির্দিষ্ট তথ্য, নথি ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন। আবেগপূর্ণ বক্তব্য বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো দাবি নিজে থেকেই প্রমাণ হয়ে যায় না। সুতরাং ভোটাধিকার রক্ষার প্রশ্নে দুটি দায়িত্ব সমান গুরুত্বপূর্ণ—যোগ্য নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত রাখা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নির্ভুলতা বজায় রাখা।
৩. ইসলামের দৃষ্টিতে আমানত: ক্ষমতা নয়, দায়িত্ব
ইসলামে আমানত একটি বিস্তৃত নৈতিক ধারণা। মানুষের সম্পদ, অর্পিত দায়িত্ব, প্রতিশ্রুতি এবং অন্যের অধিকার—সব ক্ষেত্রেই আমানতদারির প্রশ্ন জড়িত। জনসাধারণের দায়িত্ব পালনও এই নৈতিক আলোচনার বাইরে নয়।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন:
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُمْ بَيْنَ النَّاسِ أَنْ تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ
অর্থ: নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা যেন আমানত তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দাও। আর যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়বিচারের সঙ্গে বিচার করবে।
এই আয়াতের শিক্ষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে আমানত যথাযথভাবে আদায় করার নির্দেশের সঙ্গে ন্যায়বিচারের নির্দেশও যুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পক্ষপাত, ব্যক্তিগত স্বার্থ কিংবা প্রভাবের পরিবর্তে ন্যায়কে গুরুত্ব দিতে হবে।
জনজীবনে এই নীতির প্রয়োগ বলতে বোঝায়—যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যে দায়িত্ব পেয়েছে, তাকে সেই দায়িত্ব সততা ও ন্যায়ের সঙ্গে পালন করতে হবে। একইভাবে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তার বিচারও হতে হবে ন্যায়সংগত পদ্ধতিতে। এই আয়াত কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষের পক্ষে বা বিপক্ষে রায় দেয় না; বরং প্রত্যেকের জন্য একটি নৈতিক মানদণ্ড স্থাপন করে।
৪. ন্যায়বিচার নিজের পক্ষের বিরুদ্ধেও
ন্যায়বিচার তখনই প্রকৃত অর্থে প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন তা নিজের পছন্দ, স্বার্থ ও পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে। কোনো বিষয় নিজের অনুকূলে গেলে সেটিকে সত্য এবং প্রতিকূলে গেলে সেটিকে মিথ্যা বলে ধরে নেওয়া ন্যায়বিচারের নীতি নয়।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَىٰ أَنْفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ
অর্থ: হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়বিচারে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো, আল্লাহর উদ্দেশ্যে সাক্ষ্যদাতা হও—যদিও তা তোমাদের নিজেদের, পিতা-মাতা অথবা নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে যায়।
এই আয়াত মানুষকে এমন এক নৈতিক অবস্থানে দাঁড় করায়, যেখানে সত্যের প্রতি আনুগত্য ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও স্বার্থের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক বিতর্কেও এই নীতি প্রাসঙ্গিক। কোনো দল বা নেতা নিজের পছন্দের হলে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা প্রশ্ন উপেক্ষা করা এবং অপছন্দের হলে প্রমাণ ছাড়াই দোষী সাব্যস্ত করা—দুটিই ন্যায়সংগত মনোভাবের পরিপন্থী।
অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রমাণ চাইতে হবে, প্রমাণ পাওয়া গেলে তার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করতে হবে এবং ভুল প্রমাণিত হলে তা স্বীকার করার মানসিকতাও রাখতে হবে। ন্যায়বিচারের প্রতি এই অঙ্গীকারই জনজীবনে আস্থা গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
৫. নেতৃত্বের দায়িত্ব ও জবাবদিহি: রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর শিক্ষা
ইসলামে নেতৃত্বকে কেবল মর্যাদা, ক্ষমতা কিংবা সুবিধা লাভের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয় না। নেতৃত্বের সঙ্গে জড়িত থাকে দায়িত্ব, মানুষের অধিকার রক্ষা এবং নিজের কাজের জন্য জবাবদিহি করার বাধ্যবাধকতা।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ
অর্থ: তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল অভিভাবক এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।
এই হাদিসের মূল শিক্ষা হলো, প্রত্যেক দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন স্তরের দায়িত্বশীল মানুষের ক্ষেত্রেও এই নৈতিক শিক্ষা প্রাসঙ্গিক। তবে এই হাদিসকে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। বরং এটি একটি সাধারণ নৈতিক নীতি শেখায়—দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে জবাবদিহিও অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।
জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত তাদের কাজের ব্যাখ্যা দেওয়া, প্রাসঙ্গিক তথ্য প্রকাশ করা এবং বৈধ অভিযোগের নিরপেক্ষ পর্যালোচনার সুযোগ নিশ্চিত করা। অন্যদিকে, নাগরিকদেরও যাচাই না করে অভিযোগ ছড়ানো থেকে বিরত থাকা উচিত।
৬. প্রতিবাদের অধিকার ও শান্তিপূর্ণ আচরণের গুরুত্ব
গণতান্ত্রিক সমাজে শান্তিপূর্ণভাবে মতামত প্রকাশ ও দাবি জানানো নাগরিক অংশগ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপ। কোনো সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত থাকলে নাগরিকেরা প্রযোজ্য আইন ও নিয়মের মধ্যে থেকে প্রতিবাদ, আবেদন, আলোচনা এবং আইনি প্রতিকার চাইতে পারেন।
কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা ও পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ। হুমকি, ব্যক্তিগত অপমান, গুজব কিংবা সহিংসতা কোনো দাবিকে ন্যায়সংগত প্রমাণ করে না। একইভাবে, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্ব পালনের সময় প্রশাসনের আচরণও হওয়া উচিত আইনসম্মত, প্রয়োজনীয় ও সংযত।
ইসলাম মানুষকে ন্যায়ের পক্ষে থাকার শিক্ষা দেয়, কিন্তু সেই ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় সত্য, সংযম ও মানুষের মর্যাদা বিসর্জন দেওয়ার অনুমতি দেয় না।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَىٰ أَلَّا تَعْدِلُوا ۚ اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَىٰ
অর্থ: কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার না করতে প্ররোচিত করে। তোমরা ন্যায়বিচার করো; এটাই তাকওয়ার অধিকতর নিকটবর্তী।
এই আয়াতের শিক্ষা হলো, বিরোধী মত বা প্রতিপক্ষের প্রতি অসন্তোষ থাকলেও ন্যায়ের সীমা অতিক্রম করা যাবে না। প্রতিবাদকারী, প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতা এবং সাধারণ নাগরিক—সবার ক্ষেত্রেই এই নীতি সমানভাবে প্রযোজ্য।
৭. গণতন্ত্রে স্বচ্ছতা ও মানুষের আস্থার গুরুত্ব
একটি নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা শুধু ভোটগ্রহণের দিনের ওপর নির্ভর করে না। ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা, সংশোধনের আবেদন বিবেচনা করা, নির্বাচনী নিয়ম প্রয়োগ করা এবং অভিযোগের নিষ্পত্তি—এসব ধাপের স্বচ্ছতাও গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা উপেক্ষা করা বা যাচাই ছাড়াই সত্য বলে ঘোষণা করা—কোনোটিই সমস্যার সমাধান নয়। প্রয়োজন হলো তথ্য প্রকাশ, নিরপেক্ষ অনুসন্ধান, যথাযথ ব্যাখ্যা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কার্যকর প্রতিকার।
মানুষ যখন দেখে যে তাদের প্রশ্ন শোনা হচ্ছে, অভিযোগের মূল্যায়ন হচ্ছে এবং সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তি রয়েছে, তখন প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা বজায় রাখার সুযোগ বাড়ে। এই প্রসঙ্গে ইসলামের আমানতদারি ও ন্যায়বিচারের শিক্ষা একটি নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। জনস্বার্থের দায়িত্ব পালনকারীদের সততা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নাগরিকদেরও সত্য যাচাই করে মত প্রকাশ করা জরুরি।
৮. সোশ্যাল মিডিয়া, গুজব ও সত্য যাচাইয়ের দায়িত্ব
বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক প্রতিবাদের ছবি, ভিডিও ও বক্তব্য দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে মানুষ দ্রুত ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারে। কিন্তু অসম্পূর্ণ ভিডিও, পুরোনো ছবি, ভুল ক্যাপশন কিংবা যাচাইহীন দাবি জনমনে বিভ্রান্তিও সৃষ্টি করতে পারে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا
অর্থ: হে মুমিনগণ! কোনো পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে এলে তোমরা তা যাচাই করে নাও।
এই আয়াতের শিক্ষা সংবাদ গ্রহণ ও প্রচারের ক্ষেত্রে সতর্কতার গুরুত্ব তুলে ধরে। কোনো খবর আমাদের রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত পছন্দের সঙ্গে মিলে গেলেই সেটিকে যাচাই ছাড়া ছড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়।
সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা শুধু সাংবাদিকদের নয়; সংবাদ পাঠক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারকারী এবং জনমত গঠনে অংশ নেওয়া প্রত্যেক মানুষেরই দায়িত্ব।
৯. ইসলামি নৈতিকতা ও নাগরিক দায়িত্ব: উভয়েরই প্রয়োজন
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা শুধু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব নয়; নাগরিকদের আচরণও একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখে।
রাষ্ট্রের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের উচিত আইনসম্মতভাবে কাজ করা, মানুষের অধিকারকে সম্মান করা এবং বৈধ অভিযোগের জবাব দেওয়া। নাগরিকদের উচিত নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা, প্রয়োজনীয় নথি ও তথ্য সংরক্ষণ করা, প্রযোজ্য আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা এবং যাচাইহীন অভিযোগ থেকে বিরত থাকা।
সাংবাদিকদের দায়িত্ব হলো তথ্য ও মতামতের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা। রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর উচিত তাদের দাবি ও প্রমাণ স্পষ্টভাবে তুলে ধরা। আর সাধারণ মানুষের উচিত কোনো পক্ষের বক্তব্য অন্ধভাবে গ্রহণ না করে যুক্তি ও তথ্যের ভিত্তিতে বিষয়টি বিচার করা।
ইসলামের নৈতিক শিক্ষা এই দায়িত্বগুলো পালনে সততা, আমানতদারি, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। এসব মূল্যবোধ কোনো একটি রাজনৈতিক মতের সম্পত্তি নয়; এগুলো মানুষের সামগ্রিক নৈতিক জীবনের অংশ।
১০. উপসংহার: প্রতিবাদের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা
দিল্লির ‘Jantar Mantar 2.0’ প্রতিবাদকে ঘিরে ভোটাধিকার, নির্বাচনী স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক জবাবদিহির যে প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে, সেগুলো তথ্য ও যুক্তির ভিত্তিতে আলোচনার দাবি রাখে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য শোনা এবং আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় সমস্যার সমাধান খোঁজা—এগুলোই দায়িত্বশীল গণতান্ত্রিক আচরণের অংশ।
ইসলামের শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমানত রক্ষা করতে হবে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সততার পরিচয় দিতে হবে। এই নীতিগুলো কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, সামাজিক জীবন এবং জনস্বার্থের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক।
কোনো প্রতিবাদকে বিচার করার সময় শুধু স্লোগান নয়, তার দাবির ভিত্তি ও প্রমাণও দেখতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা করার সময় শুধু আবেগ নয়, তথ্যও বিবেচনা করতে হবে। আর কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে ন্যায়সংগত অনুসন্ধান ও যথাযথ প্রক্রিয়ার গুরুত্ব ভুলে যাওয়া চলবে না।
একটি সুস্থ সমাজ গড়ে ওঠে তখনই, যখন ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্ব, অধিকারের সঙ্গে কর্তব্য এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে সত্যের প্রতি আনুগত্য বজায় থাকে।