পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-এর প্রকোপ: এক বিশ্লেষণমূলক নিবন্ধ
সম্প্রতি সিজেপি ও অনান্য বিরোধী দলগুলির নেতৃত্বে মূখ্য নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে জোড়কদমে আন্দোলনে চলছে। কেন তা বলার কিছু নেই। তবে সত্যিই কি এবারের এসআইআর এক চক্রান্তমূলক ষড়যন্ত্র না বাস্তবেই এটি ছিল আইনসঙ্গত, নৈতিক ও পরিশুদ্ধ? এই প্রশ্নের প্রতুত্তরও বলার প্রয়োজন নেই বলে মনে করি যেহেতু এই নিয়ে সম্প্রতি ইন্ডিয়ান এক্সপ্র্র্রেস যে তথ্য তুলে ধরেছে সেটিই যথেষ্ট। তবে এই প্রবন্ধে এসআইআর-এর অন্যন্য এক দিক তুলে ধরা হয়েছে যুক্তিসঙ্গত ও কিছু বাস্তব চিত্রের মাধ্যমে। পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-এর প্রকোপ কতটা পড়েছে সেই দিক বিশ্লেষণ এই নিবন্ধের সাহায্যে তুলে ধরা হল।
এটি বাস্তব যে এসআইআর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে এক অনন্য ও ঐতিহাসিক চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। এইবার বিজেপি কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনেই জয়লাভ করেনি বরং তার চেয়ে বাড়িয়ে ২০৭-এ গিয়ে দাঁড়িয়েছে যা বিগত বিধানসভার চেয়ে ১৩০টি বেশি। অপরদিকে তৃণমূলকে একের পর এক পরাজয় দেখতে হয়েছে। কিন্তু জয়ের রহস্যের নেপথ্যে এমন কী রয়েছে যে পুরোনো চিত্রটা একেবারে উলটে দিয়েছে? অনেকের মতে এই রহস্যের মূল কারণ মুসলিমদের ভোট বিভাজন এবং এসআইআর। স্বাধীনতার পর থেকেই অদ্যাবধি এসআইআর হয়েছে বেশ কয়েকবার। তবে এইবারের এসআইআর ছিল একেবারেই আলাদা যা পুরো দেশবাসীকে হতাশায় ফেলে দিয়েছে। এর প্রভাব নির্বাচনে অবশ্যই পড়েছে কিন্তু কতটা এবং কীভাবে সেটাই দেখার বিষয়। আদৌ কি এসআইআর সরকার বদলে দেওয়ায় দায়ী না অন্য কিছু?
তৃণমূল সহ অনান্য বিরোধী দলরা গোড়া থেকেই বলে আসছিল বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের সমন্বয়ে এসআইআর তাদের হারানোর এক চক্রান্ত। যেহেতু আগাগোড়াই বিজেপি কায়মনোবাক্যে এসআইআরকে মেনে নিয়েছে ও জ্ঞানেশ কুমারের ভূয়সী প্রশংসা করে চলেছে। সুতরাং, বিজেপি এখন কোনো না কোনো ভাবে, এসআইআর যে একটি কারণ, তা এড়ানোর চেষ্টা করবে ও করছেও। প্রথমত, যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে বিজেপির সঙ্গে তৃণমূলের ভোট শতাংশের পার্থক্য ৫% অনুযায়ী ৩১ লক্ষ সংখ্যাটি ২৭ লক্ষের চেয়ে বেশি। দ্বিতীয়ত, অনেকের নাম ভোটার তালিকায় ঢুকলেও তারা যে সকলে তৃণমূলকেই ভোট দিত এই নিশ্চয়তা নেই। তৃতীয়ত, তালিকা থেকে বাদ পড়া প্রত্যেক ভোটারই ভোট দিতে আসতেন এরও কোনো নিশ্চয়তা নেই। বৈধভাবে নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যেও ভোটদানের হার কখনোই শতভাগ হয় না। চতুর্থত, এসআইআর বাতিলের প্রতিটি ঘটনাই অন্যায়, বেআইনি বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়। পঞ্চমত, মুছে ফেলা ভোটার তালিকার ওপর রায় চাপিয়ে দেওয়ার অর্থ হলো, কার্যত এটাই বলা যে, যারা ভোট দিয়েছেন, সেই লক্ষ লক্ষ মানুষ যারা লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন, নিজেদের ভোটার আইডি কার্ড দেখিয়েছিলেন এবং বোতাম টিপেছিলেন, তারা ভুল করেছেন।
এই পাঁচটি যুক্তির মধ্যে নিচের চারটি কিছুটা সঠিক হলেও প্রথম যুক্তিটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটা কোনো বিশ্লেষণ নয়; এটা পাটিগণিতের ভাষায় মোড়া এক ধরনের পক্ষসমর্থন। যেহেতু, বিজেপি এইবার মোট ৪৫.৮৪% ভোট পেয়েছে এবং ৪০.৮০% পেয়েছে তৃণমূল। অর্থাৎ, বিজেপি তৃণমূলের থেকে ৫.০৪% ভোট বেশি পেয়েছে যা প্রায় ৩১লক্ষ ভোট এবং অপরদিকে এসআইআর বিচারাধীনে বাদ গিয়েছে ২৭ লক্ষ ভোটার। সুতরাং, এই সংখ্যা দেখে জনসাধারণের মনে হবে যে বিজেপি এসআইআর এর ফলে তেমন কিছু সুবিধা পায়নি কিন্তু তা কতটা সত্য। সেটা দেখার পূর্বে এই যুক্তি তুলে ধরা ঠিক হবে কি সেটাও দেখার বিষয়। যেহেতু সকল আসনের ভোট শেয়ার শতাংশ যে প্রত্যেকটি আসনেরও সেই পরিমাণ তা কিন্তু কখনোই নয়। আর এমনটিই যদি হতো তবে শতাংশ অনুযায়ী বিজেপিকে কেবল ১৩৪টি আসনে ও তৃণমূলকে ১১৯টি আসনে জয়লাভ করার কথা ছিল। কিন্তু এমনটা হয় না। ভোট শেয়ারের শতাংশ দ্বারা নয় বরং এক একটি আসন জয়ের সংখ্যা গড়ে তোলে একটি সরকার। এমনও অনেক আসন রয়েছে যেগুলিতে হাজারো নাম বাদ যাওয়ার পরেও তৃণমূল জয়লাভ করেছে। অতএব, যদি সরকার গড়ে তুলতে এসআইআর-এর ভূমিকা জানতে হয় তবে প্রতিটি আসনের পরিস্থিতি ও প্রসঙ্গ দেখে বলা উচিত।
তবে আসনগুলির প্রসঙ্গ দেখার পূর্বে এই যুক্তিগুলির সমাধা করা যাক। প্রথমত, নির্বাচনে সম্ভাবনা ও সমষ্টির চেয়ে প্রক্রিয়াটিই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, 'যৌক্তিক অসঙ্গতির' মাধ্যমে তথ্য মুছে ফেলার প্রক্রিয়া এবং আপিল বিচারাধীন থাকা এই পদ্ধতির অত্যন্ত গুরুতর ত্রুটি, যা সমগ্র উদ্যোগটিকে অকার্যকর করার জন্য যথেষ্ট। তৃতীয়ত, অবশ্যই ফলাফল মেনে না নেওয়াটা যারা ভোট দিয়েছেন তাদের প্রতি অবমাননা, কিন্তু অন্তত ২৭ লক্ষ মানুষ যে ভোটাধিকারের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন দীর্ঘক্ষণ ধরে, এই সত্যটি স্বীকার না করে ফলাফল মেনে নেওয়াটাও সমানভাবে অবমাননাকর। তাও আবার এমন দরিদ্র জনসাধারণ যাদের কাছে না আছে যথাযথ জ্ঞান, না আছে সময়, না আছে পয়সা, না আছে মিডিয়া, না আছে কিছু। কিন্তু এটুকু জানে যে তারা ভারতের একজন সুনাগরিক। চতুর্থত, তাছাড়া প্রত্যেক যোগ্য ভোটার ভোট দেবেন না, একথা বলাটা এই ২৭ লক্ষ ব্যক্তির পাশাপাশি অন্যদের (বাকি ৯০ লক্ষ) প্রতিও অবমাননার শামিল, যারা তাদের প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে স্বল্প সময়ের নোটিশে আপিল করতে বা নথি সংগ্রহ করতে পারেননি, যে নোটিশগুলো হয়তো জারিও করা হয়নি। পঞ্চমত, ফলাফলে কোনো পরিবর্তন না আনলেও, একজন ব্যক্তিকেও তার ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা মানে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অধিকার হরণ করা। এই অধিকার যেন একজন ব্যক্তির কাছ থেকেও কেড়ে নেওয়া না হয়, তা নিশ্চিত করা ছিল নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব, এবং তা করতে ব্যর্থ হলে মাননীয় সুপ্রিম কোর্টের দায়িত্ব। আর এখানেই ব্যবস্থাটি ব্যর্থ হয়েছে। সুতরাং, সংক্ষেপে বলা যায় পরিসংখ্যান একত্রিত করার অজুহাত খুঁজে অথবা এই ত্রুটিগুলোকে ধামাচাপা দিয়ে একটি সম্পূর্ণ ত্রুটিপূর্ণ ও একপেশে প্রচেষ্টাকে ঢাকার চেষ্টা আমাদের করা উচিত নয়।
এবারে নজর দেওয়া যাক আসনগুলির দিকে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অনুযায়ী, ৪৯টি আসন এমন রয়েছে যেখানে জয়ের ব্যবধান ছিল 'এসআইআর ডিলিশন'-এর চেয়ে কম। এগুলিতে এসআইআর ডিলিশন এবং জয়ের ব্যবধান ১০,০০০ উপরে ছিল। যার মধ্যে ২৬টি(৫৩%) আসন পেয়েছে বিজেপি, তৃণমূল পেয়েছে ২১টি(৪২%) এবং কংগ্রেস পেয়েছে ২টি(৪%)। উদাহরণস্বরুপ, জঙ্গিপুর একটি মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকা সেখানে টিএমসি বিজেপির কাছে ১০,৫৪২ ভোটে পরাজিত হন। কিন্তু এই আসনে এসআইআর-এ নাম কাটা গিয়েছে ৩৬৫৮১ ভোটার। অন্য একটি দৃষ্টান্ত হল উত্তর দিনাজপুরের করণদিঘি। এখানে বিজেপি জয়লাভ করেছে ১৯৮৬৯ ভোটে কিন্তু এসআইআরে নাম ডিলিট হয়েছে ৩১৫৬২টি।
এছাড়াও ইংরেজি নিউজ পোর্টাল স্ক্রল-এর একটি তথ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিজেপি এমন ১০৫টি আসনে জয়লাভ করেছে, যেখানে এসআইআর-এ যতজন ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তার সংখ্যা বিজেপির জয়ের ব্যবধানের চেয়েও বেশি। এর মধ্যে ৮৬টি এমন আসন রয়েছে যা বিজেপি এর আগে কখনো জেতেনি। এই বিশ্লেষণটি নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত ফলাফল এবং কলকাতা ভিত্তিক পাবলিক পলিসি রিসার্চ সংস্থা সবর ইনস্টিটিউট-এর তথ্যের ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। অতএব, এটি স্পষ্ট যে সম্পূর্ণ আসনে না হলেও এসআইআর অবশ্যই বিজেপিকে জয়ী হতে সাহায্য করেছে। এর বিপক্ষে হয়তো এমনও কথা উঠবে যে এসআইআর কখনোই জেতার কারণ হতে পারেনা। বরং তৃণমূলের অপশাসন, দূর্নীতির জন্যই এমনটা হয়েছে। আর যদি এসআইআর বিজেপিকে সাহায্য করেছে তো এমনও তো বেশ কয়েকটি আসন রয়েছে যেগুলিতে এসআইআর তৃণমূলকে সহায়তা করেছে। এর প্রতুত্তরে বলা যায়, এসআইআর তো কখনোই এক মাত্র কারণ হয়ে উঠতে পারেনা তা অবশ্যই। আর এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তৃণমূল কিছু এলাকায় জয়ী হলেও তুলনায় এসআইআর বিজেপির জয়ী হতে প্রভাব ফেলেছে অত্যাধিক বেশি। সব আসনে না হলেও কিছু আসনে অবশ্যই এমনটি হয়েছে। আর কথা শুধু কয়েকটি আসন নয় বরং গনতন্ত্রে একটি আসন মানেই যাথার্থ সংখ্যাগিরষ্ঠ মানুষের কন্ঠস্বর, ক্ষমতা, মান ও মর্যদার অধিকার। একটি আসনের জন্যই কোনো বিল আটকানো যায় কিংবা পাস করানো যায়। সুতরাং, গনতান্ত্রিক দেশে একটি বৈধ ভোটারের ভোট হরণ করা মানে পুরো গণতন্ত্রকে রাজতন্ত্র গড়ে তোলার সমতুল্য। এখন দেখার বিষয়, ২৭ লক্ষ বিচারাধীন নাগরিকের কী হয়। যারা কেবল এক সুষ্ঠ সমাজে শান্তিময় জীবন অতিবাহিত করতে চায়। কিন্তু তা কি বুঝবে নির্বাচন কমিশন!
সাহাদাত আলম, প্রাবন্ধিক, ইংরেজি বিভাগ
দারুল হুদা ইসলামিক ইউনিভার্সিটি, বেঙ্গল ক্যাম্পাস
মুরারই, বীরভূম, 731219
sahadatalam427@gmail.com , 8327415185