BRICS 2026-এর নতুন ভূরাজনীতি: মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের জন্য কী নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে?

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বর্তমান বিশ্ব এক অভাবনীয় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে যে ব্রিকস (BRICS) জোট শুধুমাত্র ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত এবং চীনকে নিয়ে গঠিত হয়েছিল (পরবর্তীতে ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা যুক্ত হয়), তা আজ একটি বিশাল বৈশ্বিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। বিশ্ব রাজনীতির এই সন্ধিক্ষণে, ব্রিকস জোটের সাম্প্রতিক সম্প্রসারণ ভারতের জন্য কেবল একটি কূটনৈতিক বিজয় নয়, বরং সমগ্র মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্ক আরও নিবিড় করার এক অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি করেছে।

ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন (Strategic Autonomy), জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে এই 'নতুন ব্রিকস' কীভাবে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে, তা বুঝতে হলে এই জোটের নতুন সদস্যপদ, অর্থনৈতিক সমীকরণ, এবং কৌশলগত বিনিয়োগের দিকগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

ব্রিকসের সম্প্রসারণ এবং মুসলিম বিশ্বের অন্তর্ভুক্তি

প্রতিষ্ঠালগ্নে ব্রিকস ছিল মূলত উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর একটি প্ল্যাটফর্ম, যার মূল লক্ষ্য ছিল পশ্চিমা বিশ্ব নিয়ন্ত্রিত আর্থিক ব্যবস্থার একটি বিকল্প তৈরি করা। কিন্তু ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠিত ১৫তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে এই জোটের সম্প্রসারণের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE) আনুষ্ঠানিকভাবে এই জোটে যোগদান করে। এরপর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়া ব্রিকসের পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ লাভ করে।

এই সম্প্রসারণ প্রক্রিয়ায় সৌদি আরবের অবস্থানটি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। ২০২৪ এবং ২০২৫ সাল জুড়ে ব্রিকসের প্রাতিষ্ঠানিক ওয়েবসাইট এবং আয়োজক দেশগুলো সৌদি আরবকে তাদের দাপ্তরিক সদস্য হিসেবে উল্লেখ করলেও, সৌদি আরবের সরকারি সূত্রগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিকসে যোগদানের বিষয়টি বারবার এড়িয়ে গেছে। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত ১৭তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনেও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ একটি "আমন্ত্রিত দেশ" হিসেবেই অংশগ্রহণ করেন। তা সত্ত্বেও, ব্রিকসের কার্যক্রমে সৌদি আরবের ধারাবাহিক অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে এই জোটের প্রতি তাদের গভীর আগ্রহ রয়েছে।

২০২৬ সালে যখন ভারত ব্রিকসের সভাপতিত্ব গ্রহণ করে, তখন এই জোট ১১টি দেশের একটি শক্তিশালী ব্লকে পরিণত হয়েছে। এই জোট বর্তমানে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৯.৫ শতাংশ (প্রায় ৩.৯ বিলিয়ন মানুষ), বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় ২৬ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং তারা মধ্যপ্রাচ্য বা পশ্চিম এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। ভারতের দীর্ঘদিনের 'লুক ওয়েস্ট' (Look West) বা 'থিঙ্ক ওয়েস্ট' (Think West) নীতির সাথে ব্রিকসের এই সম্প্রসারণ সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা ভারতকে মুসলিম বিশ্বের সাথে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

ভারত ও মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যের নতুন সমীকরণ

ব্রিকসের নতুন সদস্য দেশগুলোর সাথে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ক অত্যন্ত মজবুত। বিশেষ করে গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল (GCC) বা উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে ভারতের বাণিজ্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অভাবনীয় উচ্চতায় পৌঁছেছে। ভারতের জন্য এই দেশগুলো কেবল জ্বালানির উৎস নয়, বরং বিশাল একটি রপ্তানি বাজার।

সংযুক্ত আরব আমিরাত বর্তমানে ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একটি সফল উদাহরণ। ২০২২ সালে ভারত ও ইউএই-এর মধ্যে 'কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট' (CEPA) স্বাক্ষরিত হওয়ার পর দুই দেশের বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, দুই দেশের বাণিজ্য প্রায় ৮৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং ২০৩২ সালের মধ্যে তা ২০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া, ২০২৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ভারত এবং গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল (GCC)-এর মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (FTA) আলোচনা আনুষ্ঠানিকভাবে পুনরায় শুরু হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত ও জিসিসি ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৭৮.৫৬ বিলিয়ন ডলার, যা ভারতের মোট বৈশ্বিক বাণিজ্যের ১৫.৪২ শতাংশ। এই চুক্তির ফলে ভারতের ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য, টেক্সটাইল এবং রত্ন-গহনা রপ্তানি আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আসিয়ান (ASEAN) অঞ্চলে ইন্দোনেশিয়া ভারতের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২৮.১৫ বিলিয়ন ডলার। ইন্দোনেশিয়া থেকে ভারত বিপুল পরিমাণে কয়লা এবং পাম অয়েল আমদানি করে, এবং বিনিময়ে মোটর গাড়ি, মহিষের মাংস এবং পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম রপ্তানি করে। ব্রিকসে ইন্দোনেশিয়ার অন্তর্ভুক্তি দুই দেশের এই বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করবে।

অন্যদিকে, মিশরের সাথে ভারতের কৌশলগত অংশীদারিত্ব নতুন রূপ পেয়েছে। মিশর ভারতের জন্য ইউরোপ ও আফ্রিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। দুই দেশ আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ১২ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। মিশরের সুয়েজ খাল ইকোনমিক জোনে (SCZone) ভারতীয় কোম্পানিগুলো বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করছে, যা প্রমাণ করে যে ভারত মিশরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক হাব হিসেবে বিবেচনা করছে।

দেশ বা জোট

ভারতের সাথে বাণিজ্যের পরিমাণ

ভারতের মূল আমদানিকৃত পণ্য

ভারতের মূল রপ্তানিকৃত পণ্য

গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল (GCC)

১৭৮.৫৬ বিলিয়ন ডলার (২০২৪-২৫)

অপরিশোধিত তেল, এলএনজি, পেট্রোকেমিক্যাল, সোনা

ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য, চাল, টেক্সটাইল, যন্ত্রপাতি, গহনা

সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE)

প্রায় ৮৮ বিলিয়ন ডলার (২০২৫)

পেট্রোলিয়াম, খনিজ জ্বালানি, মূল্যবান ধাতু

পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম, গহনা, টেলিযোগাযোগ সামগ্রী

ইন্দোনেশিয়া

২৮.১৫ বিলিয়ন ডলার (২০২৪-২৫)

কয়লা, পাম অয়েল, ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী

মোটর গাড়ি, মহিষের মাংস, বিশেষায়িত জাহাজ

মিশর

৬.৫ বিলিয়ন ডলার (২০২৫-২৬)

খনিজ তেল, অজৈব রাসায়নিক, সাইট্রাস ফল

পেট্রোলিয়াম পণ্য, ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য, মাংস



জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কৌশলগত বিনিয়োগ

ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি অপরিহার্য শর্ত। ব্রিকস জোটে সৌদি আরব, ইউএই এবং ইরানের মতো জ্বালানি সমৃদ্ধ দেশগুলোর উপস্থিতি ভারতের জন্য একটি বড় স্বস্তির বিষয়। মধ্যপ্রাচ্য ভারতের প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এবং ৪৭ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাসের জোগান দেয়।

যদিও কাতার ব্রিকসের পূর্ণাঙ্গ সদস্য নয়, তবে জিসিসি এবং মুসলিম বিশ্বের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তাদের সাথে ভারতের সম্পর্ক উল্লেখযোগ্য। ২০২৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ভারত কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি কাতারএনার্জি-এর সাথে ৭৮ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তির আওতায় ২০২৮ সাল থেকে ২০৪৮ সাল পর্যন্ত কাতার প্রতি বছর ৭.৫ মিলিয়ন টন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) ভারতে সরবরাহ করবে। মজার বিষয় হলো, পুরোনো চুক্তির তুলনায় নতুন এই চুক্তিতে পরিবহন খরচ বাবদ ভারতের প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হবে, কারণ কাতার নিজেই জাহাজ ভাড়ার খরচ বহন করবে (Delivered Ex-Ship বা DES ভিত্তিতে)। ভারতের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি বা গ্রিন এনার্জি লক্ষ্যের জন্য এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার আরেকটি বড় দিক হলো 'স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ' (SPR) বা কৌশলগত তেল মজুত। বৈশ্বিক তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে যেন দেশে জ্বালানি সংকট না হয়, সেজন্য ভারত এই মজুত গড়ে তুলছে। এই উদ্যোগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি অ্যাডনক (ADNOC) ভারতের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। ইউএই ভারতের এই রিজার্ভে বিনিয়োগ করেছে এবং সম্প্রতি তারা ভারতের ভূগর্ভস্থ ভাণ্ডারে প্রায় ৩০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল মজুত করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছে।

এছাড়া, মিশরের সুয়েজ খাল অঞ্চলটি নবায়নযোগ্য শক্তির একটি কেন্দ্র হয়ে উঠছে। রিনিউ পাওয়ার, একমি এবং ওসিয়র-এর মতো ভারতীয় কোম্পানিগুলো মিশরে গ্রিন হাইড্রোজেন প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এটি প্রমাণ করে যে ভারত ও মুসলিম দেশগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক এখন আর কেবল তেল কেনা-বেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ভবিষ্যতের সবুজ জ্বালানি অংশীদারিত্বে রূপান্তরিত হচ্ছে।

যোগাযোগ ব্যবস্থা: চাবাহার বন্দর এবং আইএনএসটিসি (INSTC)

বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে প্রথাগত বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফিলিস্তিনের গাজা অঞ্চলে চলমান সংঘাত এবং লোহিত সাগরে (Red Sea) হুথি বিদ্রোহীদের হামলার কারণে পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে অনেক দীর্ঘ পথ ঘুরে গন্তব্যে পৌঁছাতে হচ্ছে। এই অস্থিরতার কারণে ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ ইকোনমিক করিডোর (IMEC) প্রকল্পটি সাময়িকভাবে থমকে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে ব্রিকসের নতুন সদস্য ইরানের মাধ্যমে একটি বিকল্প বাণিজ্য পথের প্রয়োজনীয়তা বহুগুণ বেড়ে গেছে।

ইরানের চাবাহার বন্দর ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে একটি ট্রাম্প কার্ড। ২০২৪ সালের ১৩ মে ভারত ও ইরান চাবাহার বন্দরের শহীদ বেহেশতি টার্মিনাল পরিচালনার জন্য একটি ঐতিহাসিক ১০ বছর মেয়াদী চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির অধীনে ইন্ডিয়া পোর্টস গ্লোবাল লিমিটেড (IPGL) এই বন্দরটি পরিচালনা করবে এবং ভারত সেখানে ১২০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ২৫০ মিলিয়ন ডলারের ক্রেডিট লাইন বা ঋণ সহায়তা প্রদান করবে।

এই বন্দরটি ভারতের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? কারণ চাবাহার বন্দরের মাধ্যমে ভারত চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি আফগানিস্তান এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে পণ্য পাঠাতে সক্ষম হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই চাবাহার বন্দরকে ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডোর (INSTC)-এর সাথে যুক্ত করা হচ্ছে। INSTC হলো ৭,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি বহুমুখী পরিবহন ব্যবস্থা যা ভারত, ইরান, রাশিয়া এবং উত্তর ইউরোপকে যুক্ত করেছে। চাবাহার বন্দর দিয়ে পণ্য ইরানে প্রবেশ করে রেল ও সড়কপথে কাস্পিয়ান সাগর হয়ে রাশিয়ায় পৌঁছাবে। এর ফলে সুয়েজ খালের তুলনায় পণ্য পরিবহনের সময় ৪০ শতাংশ এবং খরচ ৩০ শতাংশ কমে যাবে। এই রুটের মাধ্যমে ইউরেশিয়ার ১৭০ বিলিয়ন ডলারের বাজারে ভারতের প্রবেশাধিকার অনেক সহজ হবে, যা ভারতের রপ্তানি বাণিজ্যকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

রেমিট্যান্স, স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য এবং ডি-ডলারাইজেশন বিতর্ক

ভারতের অর্থনীতিতে প্রবাসী ভারতীয়দের পাঠানো আয়ের (রেমিট্যান্স) ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক রেমিট্যান্স প্রাপ্তিতে ভারত তার শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। ২০২৪ সালে ভারত প্রায় ১২৪ বিলিয়ন ডলার থেকে ১৩৭ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স গ্রহণ করেছে, যা বৈশ্বিক মোট রেমিট্যান্সের ১৪.৩ শতাংশ। এই আয়ের একটি বিশাল অংশ আসে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে, যেখানে প্রায় এক কোটির কাছাকাছি ভারতীয় বসবাস ও কাজ করেন।

এই বিপুল পরিমাণ আর্থিক লেনদেনকে সহজ এবং সাশ্রয়ী করতে ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশ দুটি তাদের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য মার্কিন ডলারের বদলে নিজস্ব মুদ্রায় (রুপী ও দিরহামে) করার জন্য চুক্তি করেছে। এর পাশাপাশি ভারতের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা 'ইউনিফাইড পেমেন্টস ইন্টারফেস' (UPI) এবং ইউএই-এর 'AANI' সিস্টেমের মধ্যে আন্তঃসংযোগ স্থাপনের কাজ চলছে। এর ফলে প্রবাসী ভারতীয়রা খুব সহজেই এবং কম খরচে দেশে টাকা পাঠাতে পারবেন।

ব্রিকসের পরিমণ্ডলে 'ডি-ডলারাইজেশন' বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের আধিপত্য কমানোর বিষয়টি নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই জোরালো আলোচনা চলছে। বিশেষ করে রাশিয়া এবং চীন একটি অভিন্ন 'ব্রিকস মুদ্রা' চালুর পক্ষে মত দিয়ে আসছিল। তবে ভারত এই বিষয়ে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও দূরদর্শী অবস্থান গ্রহণ করেছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, ব্রিকসের নিজস্ব কোনো অভিন্ন মুদ্রা (BRICS Currency) চালুর কোনো প্রস্তাব এই মুহূর্তে ভারতের এজেন্ডায় নেই এবং ভারত মার্কিন ডলারকে দুর্বল করার কোনো নীতি গ্রহণ করেনি।

আমেরিকার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন হুমকি দিয়েছিলেন যে, ব্রিকস দেশগুলো যদি ডলারের বিকল্প কোনো মুদ্রা তৈরি করে তবে তাদের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে, তখন ভারতের এই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান পশ্চিমাদের কাছেও প্রশংসিত হয়। ভারতের মূল লক্ষ্য ডলারকে হটিয়ে দেওয়া নয়, বরং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য (Local Currency Settlement) বৃদ্ধি করা। ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়ালের মতে, স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের ফলে লেনদেনের খরচ কমে আসে এবং দেশীয় মুদ্রা শক্তিশালী হয়, যা আখেরে ব্রিকস সদস্য দেশগুলোর সাধারণ মানুষের উপকারে আসবে।

নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (NDB) এবং ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে মেলবন্ধন

উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবকাঠামো খাতে ঋণ প্রদানের জন্য ব্রিকস দেশগুলো ২০১৪ সালে 'নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক' (NDB) প্রতিষ্ঠা করেছিল, যা ২০১৫ সাল থেকে কাজ শুরু করে। এই ব্যাংকটি মূলত বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফ-এর মতো পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বিকল্প হিসেবে তৈরি হয়েছিল। সম্প্রতি এই ব্যাংক তাদের সদস্যপদ সম্প্রসারণ করেছে। ব্রিকসের মূল সদস্যদের বাইরে বাংলাদেশ, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিশর, উরুগুয়ে এবং আলজেরিয়া (২০২৪ সালে) NDB-তে যুক্ত হয়েছে।

মুসলিম দেশগুলোর এই অংশগ্রহণের ফলে NDB-এর মূলধনের ভিত্তি যেমন মজবুত হয়েছে, তেমনি ইসলামী অর্থায়ন বা 'ইসলামিক ফাইন্যান্স'-এর সাথে ব্রিকসের একটি মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে চীনের সাংহাইয়ে NDB-এর প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফ এবং জেদ্দা-ভিত্তিক ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (IsDB)-এর প্রেসিডেন্ট ড. মুহাম্মদ আল জাসের-এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতার জন্য একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল বিশ্বের এই দুটি প্রধান আর্থিক প্রতিষ্ঠান একসাথে কাজ করার অর্থ হলো, আগামী দিনে ভারত সহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর বড় বড় অবকাঠামোগত প্রকল্পে অর্থায়নের ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমে আসবে।

প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন

অর্থনীতি ও বাণিজ্যের পাশাপাশি মুসলিম দেশগুলোর সাথে ভারতের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতাও অভাবনীয় মাত্রায় বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের ভারত সফরকালে দুই দেশের মধ্যে একটি 'লেটার অফ ইন্টেন্ট' (Letter of Intent) স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে একটি 'কৌশলগত প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বে' (Strategic Defence Partnership) উন্নীত করা। এই কাঠামোর অধীনে প্রতিরক্ষা শিল্পে যৌথ উৎপাদন, সামরিক মহড়া, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং সাইবার প্রতিরক্ষার মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে ভারত ও ইউএই একসাথে কাজ করবে।

লোহিত সাগর এবং পশ্চিম ভারত মহাসাগরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামুদ্রিক নিরাপত্তার ঝুঁকি চরম আকার ধারণ করেছে। হুথি বিদ্রোহীদের রকেট হামলা এবং জলদস্যুতার কারণে যখন ওই রুটে বৈশ্বিক বাণিজ্য হুমকির মুখে পড়েছিল, তখন ভারতীয় নৌবাহিনী সেখানে ১০টিরও বেশি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা প্রদান করেছে। ভারতের এই সক্রিয় ভূমিকা আরব দেশগুলোর কাছে প্রমাণ করেছে যে ভারত কেবল একটি বাণিজ্যিক অংশীদার নয়, বরং এই অঞ্চলের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও একটি নির্ভরযোগ্য শক্তি।

ভারতের এই কূটনীতি তার 'কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন' (Strategic Autonomy) নীতির একটি নিখুঁত উদাহরণ। ভারত একদিকে যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইউএই-কে নিয়ে গঠিত 'I2U2' জোটে কাজ করছে, ঠিক তেমনি ব্রিকসের মাধ্যমে ইরান, রাশিয়া এবং আরব দেশগুলোর সাথেও সমান্তরালভাবে সুসম্পর্ক বজায় রাখছে। ভারত কখনো চায় না যে ব্রিকস একটি 'পশ্চিমা-বিরোধী' জোটে পরিণত হোক। বরং ভারতের লক্ষ্য হলো ব্রিকসকে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলা যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর কণ্ঠস্বরকে বৈশ্বিক দরবারে জোরালো করবে।

উপসংহার

ব্রিকস জোটের সম্প্রসারণ এবং এর ফলে মুসলিম বিশ্বের উদীয়মান শক্তিগুলোর সাথে ভারতের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি ভারতের দীর্ঘমেয়াদী পররাষ্ট্রনীতির একটি সুচিন্তিত পদক্ষেপ। ব্রিকসের কাঠামোর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরান, মিশর, ইথিওপিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার উপস্থিতি ভারতের সামনে বাণিজ্যের বহুমুখীকরণ, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং নতুন সাপ্লাই চেইন তৈরির এক বিশাল দরজা খুলে দিয়েছে।

চাবাহার বন্দরের মাধ্যমে মধ্য এশিয়ায় প্রবেশ, ইউএই ও জিসিসির সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, সুয়েজ খালে গ্রিন এনার্জিতে বিনিয়োগ এবং নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্যের প্রসার—এই সবকিছুই প্রমাণ করে যে ভারত মুসলিম বিশ্বের সাথে তার সম্পর্ককে কেবল তেল কেনা-বেচার গণ্ডি থেকে বের করে একটি সুদূরপ্রসারী কৌশলগত অংশীদারিত্বে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছে। ভারত যদি তার এই ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি এবং 'সবার আগে মানবতা' (Humanity First) নীতি বজায় রেখে চলতে পারে, তবে আগামী দিনে বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতের অবস্থান আরও সুসংহত হবে। সঠিক কৌশল এবং অর্থনৈতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে ভারত এই নতুন ও সম্প্রসারিত ব্রিকস থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করতে সক্ষম হবে, যা দেশের সার্বিক প্রবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter