সভ্যতার আলো তৈরিতে একজন মুসলিম নারী: আল-কারাওইন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাস

ভূমিকা: ইতিহাসের এক অনন্য আলোকবর্তিকা

নবম শতাব্দীতে, যখন ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ছিল অন্ধকারের রাজত্ব এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আলো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ছিল, তখন উত্তর আফ্রিকার মরক্কোয় এক অভাবনীয় বিপ্লব ঘটেছিল। সেই বিপ্লবের নেপথ্যের কারিগর ছিলেন একজন মহীয়সী নারী-ফাতিমা আল-ফিহরি। বর্তমান বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয় বলতে আমরা যে প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত রূপটি দেখি, তার প্রথম সফল বীজটি বপন করেছিলেন তিনি। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম এবং ত্যাগের ফসল ‘আল-কারাওইন বিশ্ববিদ্যালয়’ আজ এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে জ্ঞানচর্চার এক চিরন্তন কেন্দ্র হিসেবে টিকে রয়েছে। এই প্রবন্ধটি কেবল একজন নারীর ইতিহাস নয়, বরং এটি ইসলামে জ্ঞানচর্চার গুরুত্ব, নারী নেতৃত্ব এবং বিশ্ব সভ্যতার ভিত্তি গড়ে ওঠার এক প্রামাণ্য দলিল।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: কাইরাওয়ান থেকে ফেস শহরের উত্থান

ফাতিমা আল-ফিহরির জীবনের গল্পটি বুঝতে হলে আমাদের তৎকালীন সমাজ ও ভৌগোলিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে তাকাতে হবে। আনুমানিক ৮০০ খ্রিস্টাব্দে তিউনিসিয়ার কাইরাওয়ান (Kairouan) শহরে এক সম্ভ্রান্ত ও ধনী পরিবারে ফাতিমার জন্ম হয়। তাঁর পিতা মোহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ আল-ফিহরি ছিলেন একজন অত্যন্ত সফল এবং দূরদর্শী ব্যবসায়ী। কাইরাওয়ান তখন ছিল ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির অন্যতম বড় কেন্দ্র।

নবম শতাব্দীর শুরুর দিকে, মরক্কোর তৎকালীন শাসক দ্বিতীয় ইদ্রিসের আমন্ত্রণে এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে বহু পরিবার তিউনিসিয়া থেকে মরক্কোর 'ফেস' (Fez) শহরে স্থানান্তরিত হতে শুরু করে। মোহাম্মদ আল-ফিহরিও তাঁর পরিবার নিয়ে ফেস শহরে চলে আসেন। ফেস নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই শহরটি তখন দ্রুত একটি বড় বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছিল।

নতুন এই শহরে এসে ফাতিমার পিতা কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তাঁর ব্যবসার পরিধি আরও বাড়িয়ে তোলেন এবং ফেস শহরের অন্যতম শীর্ষ ধনী ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। ফাতিমা এবং তাঁর বোন মরিয়ম এমন একটি পারিবারিক পরিবেশে বড় হয়েছিলেন যেখানে একদিকে যেমন ছিল প্রাচুর্য, অন্যদিকে ছিল গভীর ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার মেলবন্ধন। পিতা মোহাম্মদ আল-ফিহরি তাঁর কন্যাদের কেবল গৃহস্থালির কাজে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং তৎকালীন সমাজব্যবস্থার সেরা শিক্ষা ও চিন্তার স্বাধীনতার সুযোগ করে দিয়েছিলেন।

জীবন বদলে দেওয়া ট্র্যাজেডি এবং এক মহৎ সংকল্প

জীবন সবসময় একরকম থাকে না। ফাতিমা আল-ফিহরির জীবনেও এক চরম বিপর্যয় নেমে আসে, যখন খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে তাঁর পিতা, স্বামী এবং একমাত্র ভাই মৃত্যুবরণ করেন। এই ধারাবাহিক শোক ফাতিমা এবং তাঁর বোন মরিয়মকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারত, কিন্তু তাঁরা ভেঙে পড়েননি।

পিতার মৃত্যুর পর দুই বোন এক বিশাল এবং অকল্পনীয় সম্পত্তির একক উত্তরাধিকারী হন। তৎকালীন সমাজে এত বিপুল পরিমাণ অর্থের মালিক হওয়া একজন নারীর জন্য ছিল এক বিশাল ক্ষমতা। সাধারণ নিয়মে যে কেউ এই অর্থ নিজের বাকি জীবন অত্যন্ত বিলাসবহুলভাবে কাটানোর জন্য ব্যবহার করতে পারত। কিন্তু ফাতিমা ও মরিয়মের চিন্তাধারা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁরা ভাবছিলেন কীভাবে এই অর্থকে এমন একটি কাজে লাগানো যায়, যা চিরকাল মানুষের উপকারে আসবে এবং যা মৃত্যুর পরও তাঁদের পরিবারের জন্য একটি সদকা-এ-জারিয়া (চিরস্থায়ী পুণ্য) হিসেবে জারি থাকবে।

ফেস শহরে তখন অভিবাসীদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছিল, যার ফলে স্থানীয় মসজিদগুলোতে উপাসনা এবং শিক্ষার জন্য জায়গা সংকুলান হচ্ছিল না। এই সামাজিক সমস্যাটি ফাতিমা এবং মরিয়মকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। দুই বোন মিলে সিদ্ধান্ত নেন যে তাঁরা তাঁদের সমস্ত সম্পদ ফেস শহরের মানুষের আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নের জন্য উৎসর্গ করবেন। বোন মরিয়ম ফেস শহরের আন্দালুসীয় অংশের মানুষের জন্য 'আল-আন্দালুস মসজিদ' নির্মাণের দায়িত্ব নেন, আর ফাতিমা হাত দেন এমন এক প্রজেক্টে, যা পরবর্তীতে বিশ্ব ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

আল-কারাওইন প্রতিষ্ঠা: নির্মাণযজ্ঞ ও ফাতিমার আত্মত্যাগ

৮৫৯ খ্রিস্টাব্দের ২ নভেম্বর (রমজান মাস), ফাতিমা আল-ফিহরি আল-কারাওইন মসজিদ ও শিক্ষাকেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এই বিশাল নির্মাণকাজের পেছনে তাঁর যে নিষ্ঠা ও আধ্যাত্মিক সংযম ছিল, তা ইতিহাসের এক বিরল ঘটনা।

ঐতিহাসিক নিষ্ঠা ও রোজা পালন: ইতিহাসবিদ ইবনে আবি জার তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, আল-কারাওইন নির্মাণের প্রথম দিন থেকে শুরু করে কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত-দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় ফাতিমা আল-ফিহরি প্রতিদিন রোজা রেখেছিলেন। তিনি মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেছিলেন যেন এই কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয় এবং এটি যেন মানুষের কল্যাণে আসে।

সততা ও পবিত্রতা: ফাতিমা এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন যে, নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত প্রতিটি ইট, পাথর এবং বালু যেন তাঁর নিজের কেনা জমি থেকেই সংগ্রহ করা হয়। তিনি অন্য কারও জমিতে বা কোনো বিতর্কিত উপায়ে প্রাপ্ত নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করতে চাননি, যাতে এই প্রতিষ্ঠানের পবিত্রতা সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ থাকে।

স্থাপত্যশৈলী: শুরুতে এটি একটি সাধারণ মসজিদ হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও, ফাতিমার মূল পরিকল্পনা ছিল এটিকে একটি সার্বিক জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা। সময়ের সাথে সাথে এর পরিধি বাড়তে থাকে এবং এটি উত্তর আফ্রিকার অন্যতম বৃহত্তম স্থাপত্য হিসেবে রূপ নেয়।

গিনেস বুক ও ইউনেস্কোর স্বীকৃতি: বিশ্বের প্রথম এবং প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, আল-কারাওইনের আগেও তো পৃথিবীতে তক্ষশীলা বা নালন্দার মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল, তাহলে আল-কারাওইনকে কেন ‘বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়’ বলা হয়?

এখানেই লুকিয়ে আছে এক বড় অ্যাকাডেমিক পার্থক্য। প্রাচীন যুগের প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল মূলত ধর্মীয় আশ্রম বা রাজকীয় একাডেমি, যেখানে ডিগ্রি প্রদানের কোনো আধুনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছিল না। কিন্তু আল-কারাওইন ছিল ইতিহাসের প্রথম প্রতিষ্ঠান যা নিচের বৈশিষ্ট্যগুলো নিশ্চিত করেছিল:

ডিগ্রি প্রদান পদ্ধতি: আল-কারাওইনই প্রথম শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা শেষে প্রাতিষ্ঠানিক সনদ বা ডিগ্রি (যাকে আরবীতে 'ইজাজাহ' বলা হতো) প্রদান করা শুরু করে। এই ইজাজাহ বা ডিগ্রি না পাওয়া পর্যন্ত কেউ শিক্ষকতা বা নির্দিষ্ট পেশায় যুক্ত হতে পারত না।

ভিন্ন ভিন্ন অনুষদ: এখানে কেবল একটি বিষয়ে পড়ানো হতো না। এটি ছিল বহু বিষয়ের একটি সমন্বিত রূপ (Universal Study), যা থেকে 'ইউনিভার্সিটি' শব্দের উৎপত্তি।

নিরবচ্ছিন্ন কার্যকাল: বিশ্বের অনেক প্রাচীন প্রতিষ্ঠান যুদ্ধের কারণে বা রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু আল-কারাওইন ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু করে আজ ২০২৬ সাল পর্যন্ত-এক হাজার একশত সাতষট্টি (১১৬৭) বছর ধরে একটি দিনও বন্ধ হয়নি।

এই অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণেই ইউনেস্কো (UNESCO) এবং গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস (Guinness World Records) আল-কারাওইনকে বিশ্বের প্রাচীনতম এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু থাকা প্রথম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে। এটি ইউরোপের বিখ্যাত বোলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (১০৮৮ খ্রি.) বা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় (১০৯৬ খ্রি.) প্রতিষ্ঠারও প্রায় আড়াই শ বছর আগের কীর্তি।

শিক্ষাব্যবস্থা ও পাঠ্যক্রম: কেবল ধর্ম নয়, বিজ্ঞানেরও চারণভূমি

আল-কারাওইন বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর উদার ও প্রগতিশীল পাঠ্যক্রম। অনেকেই মনে করেন এটি কেবল একটি সাধারণ ইসলামিক মাদ্রাসা ছিল, কিন্তু ঐতিহাসিক তথ্য প্রমাণ করে যে এটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞান ও কলা অনুষদ সমৃদ্ধ আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়।

এখানে একদিকে যেমন পবিত্র কুরআন, তাফসির, হাদিস শাস্ত্র এবং ইসলামী আইন বা ফিকহ বিষয়ের ওপর উচ্চতর গবেষণা হতো, ঠিক তেমনি অন্যদিকে আরবী ব্যাকরণ, সাহিত্য, ইতিহাস, যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনের মতো কলা অনুষদের বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বের সাথে পড়ানো হতো। এর পাশাপাশি বিজ্ঞান ও গণিত চর্চায় এই প্রতিষ্ঠানটি মধ্যযুগে অনন্য নজির স্থাপন করেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বীজগণিত, জ্যোতির্বিদ্যা (Astronomy), চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং রসায়নের মতো অত্যন্ত জটিল ও বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলো নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণা করতেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব গ্রন্থাগারটি (Library) ছিল মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক বৈজ্ঞানিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ। সেখানে হাজার হাজার দুর্লভ এবং হাতে লেখা প্রাচীন পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত ছিল। সমাজবিজ্ঞানের জনক ইবনে খালদুনের মূল ডায়েরি থেকে শুরু করে পবিত্র কুরআনের প্রাচীনতম কিছু কপি আজও বিশ্বের নামী-দামী গবেষকদের এই বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে আকর্ষণ করে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারটি (Library) ছিল মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ। সেখানে হাজার হাজার দুর্লভ ও হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত ছিল, যার মধ্যে ইবনে খালদুনের মূল ডায়েরি এবং পবিত্র কুরআনের প্রাচীনতম কিছু কপি আজও গবেষকদের টানে।

বিশ্ব সভ্যতায় প্রভাব: অমুসলিম স্কলারদের মিলনমেলা

আল-কারাওইন বিশ্ববিদ্যালয় কেবল মুসলমানদের জন্য উন্মুক্ত ছিল না। এর দরজা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য উন্মুক্ত ছিল এবং এটি মধ্যযুগে ইউরোপ ও মুসলিম বিশ্বের মধ্যে একটি চমৎকার বুদ্ধিবৃত্তিক সেতু হিসেবে কাজ করেছিল। এই প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা করা বা যুক্ত থাকা কিছু বিশ্ববিখ্যাত ব্যক্তিত্বের পরিচয় নিচে দেওয়া হলো:

ইবনে খালদুন: আধুনিক সমাজবিজ্ঞান (Sociology) এবং ইতিহাস দর্শনের জনক আল-কারাওইনে শিক্ষকতা ও গবেষণা করেছেন।

আল-ইদ্রিসি: মধ্যযুগের অন্যতম সেরা ভূগোলবিদ, যাঁর তৈরি করা পৃথিবীর মানচিত্র ইউরোপীয়দের বিশ্ব জয় করতে সাহায্য করেছিল, তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন।

ইবনে রুশদ (Averroes): প্রখ্যাত দার্শনিক ও চিকিৎসাবিদ, যাঁর দর্শন ইউরোপের রেনেসাঁ বা পুনর্জাগরণে সরাসরি ভূমিকা রেখেছিল।

পোপ দ্বিতীয় সিলভেস্টার (Pope Sylvester II): খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের এই সর্বোচ্চ ধর্মগুরু আল-কারাওইনে পড়াশোনা করেন। তিনি এখান থেকেই ‘অ্যারাবিক নিউমারেলস’ বা আরবি সংখ্যা পদ্ধতি (০, ১, ২, ৩...) এবং শূন্যের (০) ব্যবহার শেখেন। পরবর্তীতে তিনি এটি পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে দেন, যা আধুনিক গণিত ও বিজ্ঞান চর্চাকে সহজ করে তোলে।

মাইমোনাইডস (Maimonides): মধ্যযুগের বিখ্যাত ইহুদি দার্শনিক ও তোরাহ বিশেষজ্ঞ ফেস শহরে থাকাকালীন আল-কারাওইনের পণ্ডিতদের অধীনে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন।

আধুনিক যুগের শিক্ষাব্যবস্থায় আল-কারাওইনের উত্তরাধিকার (Legacy)

আমরা আজ আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বা ঐতিহ্য দেখতে পাই, তার অনেক কিছুই সরাসরি আল-কারাওইন এবং তৎকালীন ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ধার করা। যেমন:

অ্যাকাডেমিক গাউন বা সমাবর্তন পোশাক: সমাবর্তনের সময় শিক্ষার্থীরা যে কালো রঙের গাউন বা ঢিলেঢালা পোশাক পরে, তা মূলত আরব উপদ্বীপ ও উত্তর আফ্রিকার পণ্ডিতদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক 'আবায়া' থেকে এসেছে।

চেয়ার বা প্রফেসরের পদ: কোনো বিষয়ে প্রধান শিক্ষককে ‘চেয়ার’ বা ‘বিভাগীয় প্রধান’ বলা হয়। আল-কারাওইনে শিক্ষকেরা একটি নির্দিষ্ট কাঠের চেয়ারে (কুরসি) বসে স্তম্ভের পাশে দাঁড়িয়ে লেকচার দিতেন এবং শিক্ষার্থীরা চারপাশে গোল হয়ে বসত। সেখান থেকেই প্রফেসরের চেয়ারের ধারণা এসেছে।

বৃত্তি বা স্কলারশিপ: আল-কারাওইন ছিল সম্পূর্ণ অলাভজনক। ধনী ব্যক্তিদের দান এবং ওয়াকফ (Waqf) সম্পত্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের থাকা, খাওয়া ও বইপত্রের খরচ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বহন করা হতো, যা আধুনিক শিক্ষা বৃত্তির আদি রূপ।

উপসংহার: নারী জাগরণ ও ইসলামে জ্ঞানের মর্যাদা

ফাতিমা আল-ফিহরি ৮৮০ খ্রিস্টাব্দের দিকে এই নশ্বর পৃথিবী ত্যাগ করেন। কিন্তু তিনি যে জ্ঞান এবং সভ্যতার প্রদীপ জ্বালিয়ে গেছেন, তা আজও নিভে যায়নি।

বর্তমান যুগে দাঁড়িয়ে যখন নারী শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং অধিকার নিয়ে বিশ্বজুড়ে নানা বিতর্ক ও আলোচনা হয়, তখন আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগের একজন মুসলিম নারীর এই কীর্তি আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। ইসলাম যে শুরু থেকেই জ্ঞান অর্জনকে নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য বাধ্যতামূলক করেছে, ফাতিমার জীবন তার সবচেয়ে বড় বাস্তব উদাহরণ। তিনি তাঁর ধন-সম্পদ কোনো অলঙ্কার বা প্রাসাদে রূপান্তর করেননি, বরং তা দিয়ে মানুষের মগজ ও মননকে আলোকিত করার ব্যবস্থা করেছেন।

ফাতিমা আল-ফিহরি কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেননি, বরং তিনি বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন। সভ্যতার আলো তৈরিতে একজন সাধারণ মানুষের অসাধারণ দূরদর্শিতার এই গল্প পৃথিবীর ইতিহাসে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে এবং আগামী প্রজন্মের নারীদের জন্য এটি এক চিরন্তন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter