ইসলামী সভ্যতায় বিজ্ঞান, দর্শন ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা: একটি পূর্ণাঙ্গ তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
ভূমিকা
আধুনিক জ্ঞানতাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক আলোচনায় প্রায়শই ধর্ম এবং বিজ্ঞানকে দুটি পরস্পরবিরোধী ধারা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এই আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি দাবি করে যে, বৈজ্ঞানিক ও বস্তুগত উন্নতির জন্য সমাজকে ধর্মীয় অনুশাসন থেকে মুক্ত হতে হবে। তবে ইসলামী দর্শনের ইতিহাস, এর মূল পাঠ এবং দীর্ঘ চৌদ্দশত বছরের সভ্যতার বিকাশ বিশ্লেষণ করলে সম্পূর্ণ বিপরীত এক সত্য উন্মোচিত হয়। ইসলামে জ্ঞান এবং চারপাশের সৃষ্টিজগতকে বুদ্ধি ও যুক্তির সাহায্যে বোঝার প্রচেষ্টাকে কেবল উৎসাহিতই করা হয়নি, বরং একে বিশ্বাসের একটি অপরিহার্য অংশ এবং পরম ইবাদত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ইসলামী দর্শনে ঐশী বাণী এবং মহাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা আল্লাহর নিদর্শন পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। এই প্রবন্ধে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে জ্ঞান, বিজ্ঞান এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার বিভিন্ন দিক ও এর ঐতিহাসিক প্রভাব বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
প্রথম ঐশী বাণী ও লিখন পদ্ধতির বৈপ্লবিক আহ্বান
ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অলৌকিক মোড় হলো এর প্রথম বাণীর অবতরণ। মক্কার হেরা গুহায় যখন দীর্ঘ ধ্যানমগ্নতার পর মানবজাতির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আধ্যাত্মিক ও সামাজিক অবিপ্লবের সূচনা ঘটছিল, তখন মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানবজাতির উদ্দেশ্যে প্রথম যে নির্দেশটি জারি করেছিলেন, তা কোনো উপাসনা, আচার-অনুষ্ঠান বা আইনের বিবরণ ছিল না। সেটি ছিল একটি সম্পূর্ণ জ্ঞানভিত্তিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক আদেশ।
اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ. خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ. اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ .الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ .عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَم ْ
“পাঠ করো তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্তপিন্ড থেকে। পাঠ করো, আর তোমার প্রতিপালক মহিমান্বিত, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে এমন বিষয়, যা সে জানত না।” (সূরা আল-আলাক, আয়াত: ১-৫)
এই আদিমতম বাণীতেই কলম শব্দের ব্যবহার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কলম হলো জ্ঞান সংরক্ষণ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নির্ভুলভাবে পৌঁছে দেওয়ার প্রধান মাধ্যম। ইসলাম তার যাত্রার শুরুতেই অনুসারীদের পড়ার এবং লেখার প্রতি আহ্বান জানিয়ে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের সূচনা করেছিল। এখানে মানুষের সৃষ্টিতত্ত্বের আদি স্তর এবং শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে কলমের কথা উল্লেখ করে এটি স্পষ্ট করা হয়েছে যে, জ্ঞান অর্জন যখন স্রষ্টার পরিচয়ের সাথে যুক্ত হয়, তখন তা মানুষের অন্তরে আলোতে রূপান্তরিত হয়। এই ঘোষণার মাধ্যমে মানবজাতিকে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন রহস্য উন্মোচন, আবিষ্কার ও গবেষণার প্রতি এক চিরন্তন অনুপ্রেরণা দেওয়া হয়েছে।
জ্ঞান অর্জনের ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা ও এর সমাজতাত্ত্বিক প্রভাব
ইসলামে জ্ঞানার্জনকে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী, শ্রেণী বা লিঙ্গের একচেটিয়া অধিকার হিসেবে রাখা হয়নি। প্রাচীন অনেক সভ্যতায় যেখানে জ্ঞানকে কেবল পুরোহিত বা উচ্চবিত্তের মাঝে সীমাবদ্ধ রাখা হতো, ইসলাম সেখানে জ্ঞানার্জনকে একটি সর্বজনীন ও বাধ্যতামূলক নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে ঘোষণা করেছে।
طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ
“জ্ঞান অন্বেষণ করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরজ (বাধ্যতামূলক)।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং: ২২৪)
ইসলামী আইনবিদ ও দার্শনিকগণ এই জ্ঞানের পরিধিকে কেবল শুষ্ক ধর্মীয় বিধি-বিধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। সমাজকে টিকিয়ে রাখার জন্য, মানবজাতির কল্যাণ সাধনের জন্য এবং রাষ্ট্রের প্রগতির জন্য প্রয়োজনীয় যেকোনো উপকারী জ্ঞান অর্জন করাও এই বাধ্যবাধকতার অন্তর্ভুক্ত। চিকিৎসাবিজ্ঞান, গণিত, পদার্থবিদ্যা, প্রকৌশল, কৃষি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার জ্ঞান অর্জনকে ইসলামে সমষ্টিগত দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়েছে। যদি সমাজের একদল মানুষ এই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি চর্চায় লিপ্ত না হয়, তবে পুরো সমাজকে অবহেলার জন্য জবাবদিহি করতে হবে। সুতরাং, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধন ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতেই একটি পুণ্যময় কাজ।
মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণ ও আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ভিত্তি
আধুনিক বিজ্ঞান দাঁড়িয়ে আছে মূলত পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং যুক্তিবাদের ওপর। পবিত্র কুরআন মানুষকে অবিকল এই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বনের নির্দেশ দেয়। কুরআন কোনো বিজ্ঞানের টেক্সটবুক নয়, এটি হেদায়েতের কিতাব; তবে এই হেদায়েতের অন্যতম প্রধান পথ হলো মহাবিশ্বের সৃষ্টিশৈলী নিয়ে নিয়মতান্ত্রিক গবেষণা করা।
إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضِ وَاخْتِلافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لآيَاتٍ لِّأُولِي الأَلْبَابِ.الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَى جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلاً سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ.
“নিশ্চয়ই আকাশমন্ডল ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের আবর্তনের মধ্যে বিবেকবানদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। যারা দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশমন্ডল ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা করে এবং বলে—হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি এগুলো নিরর্থক সৃষ্টি করোনি। তুমি পবিত্র, তুমি আমাদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।” (সূরা আলে عمران, আয়াত: ১৯০-১৯১)
এই আয়াতে গভীর চিন্তা-ভাবনা বা গবেষণাকে সরাসরি বিশ্বাসের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে, একজন বিজ্ঞানী যখন ল্যাবরেটরিতে কোনো নতুন তত্ত্ব আবিষ্কার করেন, মাইক্রোস্কোপের নিচে নতুন কোনো কোষ পর্যবেক্ষণ করেন কিংবা টেলিস্কোপ দিয়ে দূরবর্তী গ্যালাক্সি খোঁজেন, তিনি মূলত আল্লাহর নিখুঁত সৃষ্টির প্রকৌশলই প্রত্যক্ষ করেন। এই নিয়মতান্ত্রিক চিন্তা বা গবেষণা একজন বিশ্বাসীর অন্তরে স্রষ্টার প্রতি ভক্তি ও কৃতজ্ঞতা বহু গুণ বাড়িয়ে দেয় এবং অন্ধ অনুকরণের পরিবর্তে যুক্তিভিত্তিক বিশ্বাসের পথ তৈরি করে।
মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ও আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান
কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময় মানুষ মহাবিশ্ব সম্পর্কে যা জানত, তার চেয়ে অনেক উন্নত ও নিখুঁত বৈজ্ঞানিক ধারণার ইঙ্গিত কুরআনে পাওয়া যায়, যা আধুনিক বিজ্ঞান কেবল গত শতাব্দীতে প্রমাণ করতে পেরেছে।
وَالسَّمَاءَ بَنَيْنَاهَا بِأَيْدٍ وَإِنَّا لَمُوسِعُونَ
“আমি পরম ক্ষমতাবলে আকাশমন্ডল নির্মাণ করেছি এবং আমি অবশ্যই এর সম্প্রসারণকারী।” (সূরা আজ-জারিয়াত, আয়াত: ৪৭)
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেন যে এই মহাবিশ্ব স্থির নয়, বরং গ্যালাক্সিগুলো একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, অর্থাৎ মহাবিশ্ব প্রতিনিয়ত সম্প্রসারিত হচ্ছে। আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগে যখন জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে মানুষের ধারণা ছিল অত্যন্ত প্রাথমিক এবং পৃথিবী কেন্দ্রিক, তখন মরুভূমির বুকে অবতীর্ণ কিতাবে এই সম্প্রসারণের স্পষ্ট ঘোষণা এর ঐশী উৎসের এক বড় প্রমাণ। এই ধরনের আয়াতগুলো মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের আকাশ পর্যবেক্ষণ ও নিখুঁত পঞ্জিকা তৈরিতে গভীরভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
ভ্রূণতত্ত্ব এবং মানব সৃষ্টির পর্যায়সমূহ
কুরআনে মানুষের জন্ম এবং মাতৃগর্ভে ভ্রূণের ক্রমান্বয়িক বৃদ্ধির যে বিবরণ দেওয়া হয়েছে, তা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের দীর্ঘকাল ধরে বিস্মিত করে আসছে।
ثُمَّ خَلَقْنَا النُّطْفَةَ عَلَقَةً فَخَلَقْنَا الْعَلَقَةَ مُضْغَةً فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَامًا فَكَسَوْنَا الْعِظَامَ لَحْمًا ثُمَّ أَنشَأْنَاهُ خَلْقًا آخَرَ ۚ فَتَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ
“এরপর আমি শুক্রবিন্দুকে জমাট রক্তে পরিণত করি, অতঃপর জমাট রক্তকে মাংসপিন্ডে পরিণত করি, এরপর মাংসপিন্ডকে অস্থিপঞ্জরে পরিণত করি এবং অস্থিপঞ্জরকে মাংস দ্বারা আবৃত করি; অবশেষে তাকে এক নতুন সৃষ্টিরূপে গড়ে তুলি। অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত মহিমাময়!” (সূরা আল-মু'মিনুন, আয়াত: ১৪)
আধুনিক আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও শক্তিশালী অণুবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কারের পর চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা মানব ভ্রূণের যে সমস্ত স্তর চিহ্নিত করেছেন, তা কুরআনের এই বিবরণের সাথে হুবহু মিলে যায়। বিশেষ করে 'আলাক' (যা জোকের মতো জরায়ুর দেয়ালে ঝুলে থাকে) এবং 'মুদগাহ' (চিবানো মাংসের মতো অবয়ব) শব্দগুলোর ব্যবহার হুবহু আধুনিক ভ্রূণতত্ত্বের স্তরের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। প্রাচীন যুগে কোনো বাহ্যিক যন্ত্রপাতি ছাড়া মানুষের পক্ষে জীবন সৃষ্টির এই আণুবীক্ষণিক স্তরগুলোর এমন নিখুঁত ও ধারাবাহিক বর্ণনা দেওয়া অসম্ভব ছিল, যা প্রমাণ করে যে ঐশী জ্ঞান ও বিজ্ঞান কখনো সাংঘর্ষিক নয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞান ও মানবদেহের সুরক্ষা
ইসলাম মানবদেহের সুস্থতা, পরিচ্ছন্নতা এবং জীবন রক্ষার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছে। রোগাক্রান্ত হলে তা কেবল ভাগ্যের লিখন বলে হাত গুটিয়ে বসে থাকার সুযোগ ইসলামে নেই, বরং সক্রিয়ভাবে এর প্রতিকার ও ওষুধ খোঁজা আবশ্যক।
تَدَاوَوْا فَإِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ لَمْ يَضَعْ دَاءً إِلَّا وَضَعَ لَهُ دَوَاءً غَيْرَ دَاءٍ وَاحِدٍ الْهَرَمُ
“তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো, কারণ আল্লাহ তাআলা এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি যার প্রতিষেধক তিনি তৈরি করেননি, কেবল একটি রোগ ছাড়া; আর তা হলো বার্ধক্য।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ৩৮৫৫)
এই একটি ঘোষণা মুসলিম সমাজকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে গবেষণার জন্য এক অভূতপূর্ব অনুপ্রেরণা দিয়েছিল। এর ফলেই ইসলামী স্বর্ণযুগে পৃথিবীর প্রথম সুসংগঠিত এবং আধুনিক হাসপাতাল বা 'বিমারিস্তান' গড়ে ওঠে। সেখানে রোগীদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা, পথ্য ও ওষুধ সরবরাহ করা হতো। ইবনে সিনা তার বিখ্যাত গ্রন্থে এবং আল-রাজি গুটিবসন্ত ও হামের ওপর প্রথম বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রদান করে আধুনিক চিকিৎসা শাস্ত্রের অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধন করেছিলেন, যা পরবর্তীকালে ইউরোপের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রধান ভিত্তি হিসেবে গৃহীত হয়।
গণিত, বীজগণিত ও আলোকবিজ্ঞানে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি
ইসলামী সভ্যতায় গাণিতিক ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের চর্চা কেবল তাত্ত্বিক ছিল না, বরং এর পেছনে ছিল গভীর ব্যবহারিক প্রয়োজন। বিশাল সাম্রাজ্যের ভূমি জরিপ, কর নির্ধারণ, দূরপাল্লার বাণিজ্য এবং ইসলামের উত্তরাধিকার আইনের গাণিতিক সমাধানের লক্ষ্যেই মুসলিম গণিতবিদগণ গবেষণায় মন দিয়েছিলেন। মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খোয়ারিজমি তার বীজগণিতীয় সূত্রের মাধ্যমে আধুনিক গণিতের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন, যা থেকে আজকের কম্পিউটার বিজ্ঞানের মূল ভিত্তি 'অ্যালগরিদম' শব্দের সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে, হাসান ইবনে আল-হাইথাম আলোকবিজ্ঞানের প্রাচীন ভুল তত্ত্বগুলো সংশোধন করে প্রমাণ করেন যে আলো বস্তু থেকে প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে আসে। তিনি নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সত্য প্রমাণের ধারা প্রবর্তন করেন, যা আজ বিশ্বজুড়ে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃত।
পরিবেশগত ভারসাম্য ও প্রকৃতির অধিকার
আধুনিক পুঁজিবাদী ও ভোগবাদী বিজ্ঞানের একটি বড় ক্ষতিকর দিক হলো প্রকৃতির ওপর মানুষের নির্মম অত্যাচার, যার ফলে আজ বৈশ্বিক উষ্ণতা, বায়ু দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছে। ইসলাম মানুষকে প্রকৃতির স্বেচ্ছাচারী মালিক মনে করে না, বরং তাকে পৃথিবীর একজন অভিভাবক বা ট্রাস্টি হিসেবে দায়িত্ব দেয়।
يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا ۚ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ
“তোমরা আহার করো ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।” (সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ৩১)
এই অপচয় বা 'ইসরাফ' কেবল খাদ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, এটি পানি, জ্বালানি এবং প্রকৃতির সকল সম্পদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। গাছ লাগানো এবং পশুপাখির প্রতি দয়া প্রদর্শনকে ইসলামে চলমান পুণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন যাতে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট না করে এবং জলজ বা স্থলজ জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি না করে, ইসলাম তার জন্য এই নৈতিক ও আইনি সীমানা নির্ধারণ করে দেয়।
নৈতিকতা ও বিজ্ঞানের সমন্বয়: মানবতার মুক্তি
বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় দুঃখজনক পরিস্থিতি হলো নৈতিকতাহীন বিজ্ঞানের রাজত্ব। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানুষকে পারমাণবিক বোমা, রাসায়নিক অস্ত্র এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো অসীম ক্ষমতা দিয়েছে, কিন্তু তার ভেতরে সঠিক মানবিক মূল্যবোধ তৈরি করতে পারেনি। ফলে মহাশক্তিশালী প্রযুক্তি আজ মানবতার ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসলাম বিজ্ঞানকে একাকী বা লাগামহীনভাবে ছেড়ে দেয় না, বরং তাকে উচ্চতর নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার ফ্রেমে আবদ্ধ করে।
وَلَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ بَعْدَ إِصْلَاحِهَا
দুনিয়াহতে শান্তি স্থাপনের পর তোমরা তাতে বিপর্যয় সৃষ্টি করোনি।” (সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ৫৬)
ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, যে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার মানুষের ধ্বংস ডেকে আনে, সমাজকে কলুষিত করে বা নৈতিক স্খলন ঘটায়, তা কঠোরভাবে বর্জনীয়। বিজ্ঞানের একমাত্র উদ্দেশ্য হতে হবে মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করা, রোগমুক্তি দেওয়া এবং সমাজকে নিরাপদ করা। যখন একজন বিজ্ঞানী এই পবিত্র ও কল্যাণকামী মানসিকতা নিয়ে গবেষণাগারে দিন-রাত পরিশ্রম করেন, তখন তার ল্যাবরেটরির প্রতিটি মুহূর্ত একটি মহান ইবাদতে পরিণত হয়।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, ইসলামী দর্শনে বিজ্ঞান এবং বিশ্বাস একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরস্পরের পরম বন্ধু ও পরিপূরক। বিজ্ঞান মানুষকে দেখায় যে ঈশ্বরের সৃষ্টিজগত কীভাবে কাজ করছে, আর বিশ্বাস মানুষকে উত্তর দেয় যে কেন এই সৃষ্টিজগতের অস্তিত্ব রয়েছে এবং এর পেছনে কার পরম বুদ্ধিমত্তা কাজ করছে। জ্ঞানহীন বিশ্বাস যেমন মানুষকে কুসংস্কার ও অন্ধত্বের দিকে নিয়ে যায়, তেমনি বিশ্বাসহীন বিজ্ঞান মানুষকে অহংকারী এবং এক আত্মঘাতী ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। বর্তমান যুগের সবচেয়ে বড় দাবি হলো, আমরা একহাতে পবিত্র কুরআনের শাশ্বত হেদায়েত এবং অন্যহাতে আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকবর্তিকা নিয়ে এক নতুন, প্রগতিশীল, ভারসাম্যপূর্ণ ও মানবিক পৃথিবী গড়ে তুলব।