যে বই ইসলামকে নতুন চোখে দেখতে শেখায়: আলিজা ইজেতবেগোভিচের Islam Between East and West পুস্তকের পর্যালোচনা

কিছু বই পড়ার পর মনে হয়, আমরা যা জানতাম সেটা আসলে অর্ধেক গল্প ছিল। আলিজা ইজেতবেগোভিচের “Islam Between East and West” বইটা আমার কাছে ঠিক এমনই একটা অভিজ্ঞতা। প্রথম কয়েক পাতা পড়েই বুঝতে পারলাম, এটা কোনো সাধারণ ধর্মীয় বই না, বরং একজন মানুষের গভীর চিন্তাভাবনার ফসল—যিনি জেলখানায় বসে জীবন, ধর্ম আর সভ্যতা নিয়ে ভেবেছেন।

লেখক সম্বন্ধে

আলিজা ইজেতবেগোভিচকে বেশিরভাগ মানুষ চেনেন বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে। কিন্তু রাজনীতিবিদ হওয়ার আগে তিনি ছিলেন একজন চিন্তাশীল মানুষ, একজন লেখক। কমিউনিস্ট যুগোস্লাভিয়ায় থাকার সময় ধর্ম নিয়ে কথা বলাটাই ছিল বিপজ্জনক। এই কারণে তাঁকে জেলেও যেতে হয়েছিল। কিন্তু মজার বিষয় হলো, জেলের ভেতরে বসেই তিনি এমন কিছু লিখেছেন যা পরে ইসলামী চিন্তাজগতে একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিয়েছে। একজন মানুষ যখন সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতেও নিজের চিন্তাচর্চা থামান না, তখন তাঁর লেখার প্রতি একটা আলাদা শ্রদ্ধা তৈরি হয়। আমার কাছে এটাই সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে—একজন বন্দি মানুষের কলম থেকে বেরিয়ে আসা এত গভীর একটা কাজ।

বইয়ের দৃষ্টিভঙ্গি

এই বইয়ের মূল কথাটা হলো, পৃথিবীতে দুইটা বড় ধরনের সভ্যতা আছে। একদিকে প্রাচ্য বা পূর্বের সভ্যতা, যেখানে ধর্ম আর আধ্যাত্মিকতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, কিন্তু বাস্তব জগতের দিকে তেমন নজর দেওয়া হয় না। অন্যদিকে পাশ্চাত্য বা পশ্চিমের সভ্যতা, যেখানে বিজ্ঞান আর যুক্তি দিয়ে সব কিছু মাপা হয়, কিন্তু আত্মা বা অন্তরের জগৎটাকে অবহেলা করা হয়। ইজেতবেগোভিচ বলছেন, ইসলাম এই দুই দিকের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। ইসলাম শুধু আত্মার কথা বলে না, আবার শুধু বিজ্ঞান আর যুক্তির কথাও বলে না। এটা দুইটাকেই একসাথে ধরে রাখতে চায়। মানুষকে তিনি একটা দ্বৈত সত্তা হিসেবে দেখেছেন—শরীরের দিক থেকে আমরা এই পৃথিবীর অংশ, কিন্তু আত্মার দিক থেকে আমরা এর চেয়ে বড় কিছুর সাথে যুক্ত।

এই জায়গাটা পড়ে আমার নিজের জীবনের একটা অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে গেল। আমরা প্রায়ই দেখি, কেউ খুব বেশি ধর্মকর্মে ব্যস্ত থাকলে বাস্তব জীবনের দায়িত্ব থেকে দূরে সরে যায়। আবার কেউ শুধু পড়াশোনা আর ক্যারিয়ার নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে যায় যে মনের শান্তি বলতে কিছু থাকে না। ইজেতবেগোভিচ যেন ঠিক এই দুই দিকের মাঝখানে দাঁড়িয়ে একটা ভারসাম্যের কথা বলছেন। বইটা পড়তে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে, এটা শুধু ধর্মতত্ত্ব না, এটা আসলে জীবনযাপনের একটা দর্শন।

কেন এই নামকরণ, কেন East and West

বইয়ের নাম নিয়ে প্রথমে আমার মনে প্রশ্ন জেগেছিল—শুধু “ইসলাম নিয়ে বই” না লিখে “East and West” শব্দ দুটো কেন আনা হলো? পড়তে পড়তে বুঝলাম, এটাই আসলে বইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। ইজেতবেগোভিচ চাননি ইসলামকে শুধু একটা আঞ্চলিক বা ঐতিহ্যগত ধর্ম হিসেবে দেখাতে। তিনি দেখাতে চেয়েছেন, ইসলাম আসলে একটা বৈশ্বিক উত্তর—পৃথিবীর দুই ধরনের সভ্যতার সমস্যার সমাধান। প্রাচ্য যে সমস্যায় ভুগছে, আর পাশ্চাত্য যে সমস্যায় ভুগছে, দুটোরই একটা মধ্যপথ হিসেবে তিনি ইসলামকে হাজির করেছেন। এই কারণেই নামটা এত অর্থবহ। এটা কোনো একটা এলাকার গল্প না, এটা পুরো পৃথিবীর সভ্যতাগত সংকটের একটা আলোচনা।

ইসলামকে কীভাবে নতুন করে ভাবতে শেখায়

আমরা অনেকেই ছোটবেলা থেকে ধর্মকে শুধু নিয়মকানুনের একটা তালিকা হিসেবে শিখি—কী করা যাবে, কী করা যাবে না। কিন্তু এই বই পড়ার পর ইসলামকে অন্যভাবে দেখতে শুরু করলাম। ইজেতবেগোভিচ ইসলামকে দেখিয়েছেন একটা চিন্তার কাঠামো হিসেবে, যেটা মানুষের মন, বিজ্ঞান, শিল্পকলা, নৈতিকতা—সবকিছুর সাথে কথা বলতে পারে। তিনি সৃষ্টিতত্ত্ব আর বিবর্তনবাদ নিয়ে যে আলোচনা করেছেন, সেটা পড়ে মনে হয়েছে, ধর্ম আর বিজ্ঞানকে একে অপরের শত্রু বানিয়ে দেখার দরকার নেই। তিনি দস্তয়েভস্কির মতো লেখকদের কথাও এনেছেন, দেখিয়েছেন কীভাবে আধুনিক পশ্চিমা সমাজ আধ্যাত্মিক দিক থেকে খালি হয়ে যাচ্ছে। এভাবে তিনি ইসলামকে একটা জীবন্ত, চিন্তাশীল বিকল্প হিসেবে হাজির করেছেন, যেটা আজকের দুনিয়ার প্রশ্নগুলোর সাথেও কথা বলতে পারে।

এই বইটা পড়ার সময় আমার মনে হয়েছিল, এটা যেন একজন মানুষ নিজের সাথে তর্ক করছেন, নিজের বিশ্বাসকে যুক্তি দিয়ে যাচাই করছেন। এটা একরকম স্বস্তির বিষয়ও ছিল, কারণ প্রশ্ন করাটাকে তিনি খারাপ কিছু মনে করেননি, বরং প্রশ্ন করার মধ্য দিয়েই বিশ্বাসকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছেন।

এই আইডিয়াটা কতটা ঠিক, কতটা ভুল

তবে সব কিছু যে একেবারে নিখুঁত, তা বলা যাবে না। বইটা পড়তে গিয়ে আমার কয়েক জায়গায় মনে হয়েছে, প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যকে এভাবে দুই ভাগে ভাগ করে দেখাটা একটু সরলীকরণ হয়ে গেছে। বাস্তবে প্রাচ্যের ভেতরেও অনেক রকম চিন্তা আছে, পাশ্চাত্যের ভেতরেও অনেক রকম দর্শন আছে। সবাইকে এক কাতারে ফেলে বিচার করা কঠিন। এছাড়া বইয়ের ভাষা মাঝেমধ্যে বেশ ভারী, দার্শনিক পরিভাষায় ঠাসা। যাদের দর্শনের সাথে তেমন পরিচয় নেই, তাদের জন্য কিছু অংশ বুঝতে একটু সময় লাগতে পারে।

কিন্তু এই সীমাবদ্ধতাগুলো থাকা সত্ত্বেও, মূল আইডিয়াটা—যে মানুষের ভেতর শরীর আর আত্মা দুটোই আছে, আর একটা সুস্থ সভ্যতা এই দুটোকেই গুরুত্ব দেয়—এটা আমার কাছে খুবই বাস্তব আর গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। আজকের দিনে আমরা দেখি, মানুষ হয় শুধু টাকা-পয়সা, ক্যারিয়ার, প্রযুক্তি নিয়ে ব্যস্ত, নয়তো একেবারে বাস্তবতা থেকে দূরে সরে গিয়ে শুধু আধ্যাত্মিকতায় ডুবে থাকে। এই দুইয়ের মাঝে একটা ভারসাম্য খুঁজে বের করাটাই আসল চ্যালেঞ্জ, আর এই বই সেই চ্যালেঞ্জের একটা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করে।

উপসংহার

শেষ পর্যন্ত বলতে গেলে, “Islam Between East and West” শুধু ধর্ম নিয়ে লেখা একটা বই না। এটা মানুষ, সভ্যতা, বিজ্ঞান আর বিশ্বাসের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে একটা গভীর অনুসন্ধান। ইজেতবেগোভিচ কোনো সহজ উত্তর দেননি, বরং পাঠককে ভাবতে বাধ্য করেছেন। বইটা পড়ে সহজ কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না, বরং নতুন নতুন প্রশ্ন মাথায় আসে। আর আমার মনে হয়, একটা ভালো বইয়ের এটাই সবচেয়ে বড় গুণ—এটা উত্তর দেওয়ার চেয়ে বেশি প্রশ্ন তুলে দেয়।

আমার দৃষ্টিভঙ্গি এবং কেন সবার পড়া উচিত

আমার কাছে এই বইটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে কারণ এটা ধর্মকে একটা বদ্ধ জিনিস হিসেবে না দেখিয়ে, একটা জীবন্ত চিন্তার জগৎ হিসেবে দেখিয়েছে। যারা ধর্ম আর আধুনিকতা—এই দুটোকে একসাথে বোঝার চেষ্টা করছেন, তাদের জন্য এই বই একটা ভালো শুরু হতে পারে। বিশেষ করে যারা নিজের বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন করেন, কিন্তু সেই প্রশ্নের জন্য অপরাধবোধে ভোগেন, তাদের জন্য এই বই একটা স্বস্তির জায়গা তৈরি করে দিতে পারে। আজকের দুনিয়ায় যখন মানুষ একদিকে প্রযুক্তির প্রতি বেশি ঝুঁকছে, অন্যদিকে নিজের পরিচয় খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে, তখন ইজেতবেগোভিচের এই ভারসাম্যের কথাটা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক মনে হয়। এই কারণেই আমি মনে করি, এই বইটা শুধু ধর্মপ্রাণ মানুষের জন্য না, বরং যে কেউ নিজের জীবন আর বিশ্বাস নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে চান, তাদের সবার জন্যই এটা একবার পড়া উচিত বা আবশ্যিক!!

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter