ছাইয়ের নিচে চাপা পড়া জ্ঞান: ইসলামী বিশ্বের হারিয়ে যাওয়া গ্রন্থাগারসমূহের ইতিহাস

আজকের যুগের শিক্ষার্থীরা যেন হাতের মুঠোয় থাকা ডিজিটাল স্ক্রিনের নেশায় বুঁদ হয়ে আছে। ক্লাসরুমেও তারা বইয়ের চেয়ে টিভি বা প্রজেক্টরের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকতে বেশি আগ্রহী, যেন জ্ঞান অর্জনের চেয়ে চোখ-ধাঁধানো ছবির প্রতি লোভই তাদের কাছে বড়। অথচ ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, একসময় মানুষের এই আকাঙ্ক্ষা ছিল ঠিক তার উল্টো—বইয়ের প্রতি এক অতৃপ্ত তৃষ্ণা।

ইসলামী সভ্যতার স্বর্ণযুগের সবচেয়ে বড় শক্তি কোনো বিশাল সেনাবাহিনী বা অফুরন্ত ধনসম্পদ ছিল না; তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল বইয়ের প্রতি তীব্র ভালোবাসা। অষ্টম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত দামেস্ক, বাগদাদ, কায়রো থেকে শুরু করে স্পেনের কর্ডোবা পর্যন্ত প্রতিটি বড় শহরে গড়ে উঠেছিল বিশাল বিশাল গ্রন্থাগার। বাগদাদের বিখ্যাত "বাইতুল হিকমাহ" বা জ্ঞানের ঘর ছিল সেই যুগের সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র, যেখানে গ্রিক, ফার্সি, ভারতীয় ও সিরীয় ভাষার হাজার হাজার পাণ্ডুলিপি অনূদিত হতো আরবিতে। সে যুগে বইয়ের ওজন মেপে স্বর্ণ দিয়ে অনুবাদকদের পারিশ্রমিক দেওয়া হতো—একটি বইয়ের মূল্য পরিমাপ করা হতো তার পাতার ভারে নয়, তার জ্ঞানের ভারে।

কর্ডোবার খলিফাদের ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারে চার লক্ষেরও বেশি পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত ছিল বলে ইতিহাসবিদরা উল্লেখ করেছেন, যেখানে সমসাময়িক ইউরোপের অনেক রাজদরবারেও হাতে গোনা কয়েকশ বই ছিল। বাগদাদের রাস্তায় তখন শতাধিক বইয়ের দোকান ছিল, যেখানে সাধারণ মানুষও পাণ্ডুলিপি কেনাবেচা করত—যেন বই ছিল সেকালের সবচেয়ে মূল্যবান পণ্য। পণ্ডিতরা রাতভর মোমবাতির আলোয় পাণ্ডুলিপি নকল করতেন, দূরদেশে ভ্রমণ করতেন কেবল একটি বিরল বই সংগ্রহের আশায়।  কিন্তু ইতিহাসের এক নির্মম ট্র্যাজেডি হলো, মানবজাতির শ্রেষ্ঠ এই জ্ঞানভাণ্ডারগুলোর বেশির ভাগই আজ আর টিকে নেই। বহিরাগত আক্রমণ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ধর্মীয় কট্টরবাদ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এই গ্রন্থাগারগুলো চিরতরে হারিয়ে গেছে। ইসলামী বিশ্বের হারিয়ে যাওয়া সেই বিস্মৃত গ্রন্থাগারগুলোর ইতিহাস কেবল মুসলমানদের নয়, বরং সমগ্র মানব সভ্যতার এক অপূরণীয় ক্ষতির দলিল।

এই তুলনা থেকেই প্রশ্ন জাগে—জ্ঞানের প্রতি সেই যে গভীর আগ্রহ ও শ্রদ্ধা মুসলিম সভ্যতাকে বিশ্বসভ্যতার শীর্ষে নিয়ে গিয়েছিল, আজকের প্রজন্ম কি তার ছিটেফোঁটাও ধরে রাখতে পেরেছে, নাকি ক্ষণস্থায়ী স্ক্রিনের চাকচিক্যে হারিয়ে ফেলেছে সেই আসল সম্পদ?

বাগদাদের বায়তুল হিকমাহ

ইসলামী বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং প্রভাবশালী বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র ছিল বাগদাদের বায়তুল হিকমাহ। আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদ এটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং খলিফা আল-মামুনের সময় এটি চরম উৎকর্ষ লাভ করে। এটি কেবল একটি পাঠাগার ছিল না; এটি ছিল একাধারে একটি বিশ্ববিদ্যালয়, অনুবাদ কেন্দ্র এবং মানমন্দির। গ্রিক, পারস্য, ভারতীয় এবং সিরিয় ভাষার শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান ও দর্শনের বইগুলো এখানে আরবিতে অনুবাদ করা হতো।

১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে হালাকু খানের নেতৃত্বে মঙ্গোল বাহিনীর বাগদাদ আক্রমণের মধ্য দিয়ে এই গ্রন্থাগারের সলিল সমাধি ঘটে। মঙ্গোলরা লাখ লাখ অমূল্য গ্রন্থ টাইগ্রিস নদীতে ছুঁড়ে ফেলেছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, বইয়ের কালিতে নদীর পানি কালো হয়ে গিয়েছিল এবং ঘোড়াগুলো সেই বইয়ের স্তূপের ওপর দিয়ে নদী পার হয়েছিল। এর মাধ্যমে কেবল বাগদাদ নয়, বরং পুরো মানবজাতির কয়েক শতাব্দীর বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রমাণ চিরতরে মুছে যায়।

কর্ডোবার রাজকীয় গ্রন্থাগার

স্পেনে উমাইয়া খলিফা আল-হাকাম দ্বিতীয় দশম শতাব্দীতে কর্ডোবার রাজকীয় গ্রন্থাগারটি গড়ে তোলেন। বলা হয়, এই গ্রন্থাগারে প্রায় ৪ লক্ষেরও বেশি বই ছিল, যা তৎকালীন সমগ্র ইউরোপের সমস্ত পাঠাগারের সম্মিলিত বইয়ের চেয়েও বেশি। শুধু এই গ্রন্থাগারের ক্যাটালগ বা সূচিপত্রই ছিল ৪৪ খণ্ডের!

এই গ্রন্থাগারের পতন শুরু হয় অভ্যন্তরীণ কট্টরবাদের হাত ধরে। আল-হাকামের মৃত্যুর পর রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করেন উজির আল-মানসুর। রক্ষণশীল আলেমদের সমর্থন পাওয়ার জন্য তিনি এই গ্রন্থাগারের সমস্ত দর্শন, বিজ্ঞান ও যুক্তিশাস্ত্রের বই বের করে পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেন।

যেটুকু অবশিষ্ট ছিল, তা চূড়ান্তভাবে ধ্বংস হয় ১৪৯২ সালে রিকনকোয়েস্তা বা খ্রিস্টানদের স্পেন বিজয়ের পর। ১৪৯৯ সালে কার্ডিনাল জিমেনেস ডি সিসনেরোস গ্রানাডার পাবলিক স্কয়ারে লাখ লাখ আরবি ভাষার বই (গণিত, বিজ্ঞান, চিকিৎসা ও সাহিত্য) পুড়িয়ে ছাই করে দেন। ইউরোপীয় রেনেসাঁর আঁতুড়ঘর হওয়া সত্ত্বেও আন্দালুসিয়ার নিজস্ব জ্ঞানভাণ্ডার এভাবেই ধ্বংস হয়ে যায়।

৩. কায়রোর দার আল-হিকমাহ বা দার আল-ইলম

ফাতেমীয় খলিফা আল-হাকিম বি-আমরিল্লাহ ১০০৪ খ্রিস্টাব্দে কায়রোতে দার আল-হিকমাহ প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল বাগদাদের বায়তুল হিকমাহর এক শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী। এখানে প্রায় ১৬ লক্ষ বই ছিল বলে ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেছেন, যার মধ্যে শুধু গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যারই হাজার হাজার দুর্লভ পাণ্ডুলিপি ছিল।

এই গ্রন্থাগারটি মূলত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে ধ্বংস হয়। ফাতেমীয়দের শাসনামলে মিশরে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। কোষাগার শূন্য হয়ে পড়লে সৈন্যরা বেতন হিসেবে এই গ্রন্থাগারের বই লুট করে। মূল্যবান চামড়ার বাঁধাই করা বই ছিঁড়ে তারা জুতো তৈরি করেছিল। পরবর্তীতে ১১৭১ সালে সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবি যখন মিশর জয় করে ফাতেমীয় শাসন ব্যবস্থার পতন ঘটান, তখন তিনি ফাতেমীয় মতবাদের প্রভাব দূর করার জন্য এই বিশাল পাঠাগারের অবশিষ্ট বইগুলো বিক্রি করে দেন এবং অনেক বই অযত্নে নষ্ট হয়ে যায়। কায়রোর বাইরে বাতাসের তোড়ে বইয়ের পাতা উড়ে গিয়ে পাহাড়ের মতো স্তূপ তৈরি হয়েছিল, যাকে স্থানীয়রা বলত তিলুল আল-কুতুব।

ত্রিপোলির গ্রন্থাগার

লেবাননের ত্রিপোলিতে বনু আম্মার রাজবংশ একাদশ শতাব্দীতে একটি বিশাল গ্রন্থাগার গড়ে তুলেছিল। ঐতিহাসিকদের মতে, এটি ছিল তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গ্রন্থাগার, যেখানে প্রায় ৩০ লক্ষ বই সংরক্ষিত ছিল (সংখ্যাটি অতিশয়োক্তি হতে পারে, তবে সংগ্রহটি যে বিশাল ছিল তা সর্বজনস্বীকৃত)। এখানে শত শত লিপিকার দিনরাত শুধু বই নকল করার কাজে নিযুক্ত থাকতেন।

১১০৯ সালে প্রথম ক্রুসেডের সময় ক্রুসেডাররা যখন ত্রিপোলি দখল করে, তখন তারা এই গ্রন্থাগারটি সম্পূর্ণ পুড়িয়ে দেয়। একজন ক্রুসেডার ধর্মযাজক একটি কক্ষে কেবল কোরআন দেখতে পেয়ে সিদ্ধান্তে আসেন যে পুরো পাঠাগারটিতেই শুধু কোরআন আছে, এবং এই ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে তিনি পুরো জ্ঞানকেন্দ্রে আগুন ধরিয়ে দেন।

আলামুত দুর্গের গ্রন্থাগার

পারস্যের দুর্গম পাহাড়ে শিয়া ইসমাইলি সম্প্রদায়ের একটি উপদল হাসান-ই-সাবাহর নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিল। তাদের আলামুত দুর্গে একটি অসাধারণ গ্রন্থাগার ছিল, যেখানে জ্যোতির্বিদ্যা, আলকেমি এবং দর্শনের অমূল্য গ্রন্থ সংরক্ষিত ছিল।

১২৫৬ সালে মঙ্গোল বীর হালাকু খান যখন আলামুত দুর্গ দখল করেন, তখন তিনি এই গ্রন্থাগার ধ্বংস করার নির্দেশ দেন। তবে ভাগ্যক্রমে বিখ্যাত বিজ্ঞানী ও দার্শনিক নাসিরুদ্দিন আল-তুসি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি হালাকু খানকে বুঝিয়ে বিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিদ্যার মহামূল্যবান বইগুলো রক্ষা করেন, কিন্তু ইসমাইলি ধর্মতত্ত্ব ও দর্শনের বাকি সমস্ত বই আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

কেন এই ক্ষতি অপূরণীয়?

গ্রন্থাগারগুলোর এই ধ্বংসযজ্ঞ কেবল কিছু কাগজের স্তূপের বিনাশ ছিল না, এটি ছিল এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক গণহত্যা।

১. বিজ্ঞানের ধারাবাহিকতা ছিন্ন হওয়া: গ্রিক ও ভারতীয় দর্শনের সাথে ইসলামি বিজ্ঞানীদের যে মিথস্ক্রিয়া তৈরি হয়েছিল, তার অনেক গবেষণাপত্র চিরতরে হারিয়ে যায়। ফলে পরবর্তী প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের শূন্য থেকে শুরু করতে হয়।

২. মুক্তচিন্তার কবর রচনা: ধ্বংস হওয়া বইগুলোর একটা বড় অংশ ছিল দর্শন, যুক্তিবিদ্যা ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের। এই বইগুলো হারিয়ে যাওয়ার পর মুসলিম বিশ্বে তাকলিদ বা অন্ধ অনুকরণের সংস্কৃতি খুব সহজেই জেঁকে বসতে সক্ষম হয়।

৩. সাংস্কৃতিক শূন্যতা: শত শত বছরের সাহিত্য, কবিতা এবং সমাজতাত্ত্বিক রেকর্ড হারিয়ে যাওয়ার ফলে ইসলামী সভ্যতার নিজস্ব ইতিহাসের অনেক অধ্যায় চিরকালের জন্য অন্ধকারেই রয়ে গেছে।

উপসংহার

বিখ্যাত জার্মান কবি হাইনরিখ হাইনে একসময় বলেছিলেন, "যেখানে তারা বই পোড়ায়, শেষ পর্যন্ত তারা সেখানে মানুষও পোড়ায়।" ইসলামী বিশ্বের হারিয়ে যাওয়া গ্রন্থাগারগুলোর ইতিহাস এই উক্তির এক বেদনাবিধুর প্রমাণ। মঙ্গোল বা ক্রুসেডারদের তরবারি যতটা না ক্ষতি করেছিল, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি ক্ষতি হয়েছিল এই গ্রন্থাগারগুলো পুড়িয়ে ফেলার মাধ্যমে। জ্ঞান ও বিজ্ঞানের যে নেতৃত্ব মুসলিমরা হারিয়েছে, তার বীজ রোপিত হয়েছিল বাগদাদ, কর্ডোবা আর ত্রিপোলির সেই ভস্মীভূত পাঠাগারগুলোর ছাইয়ের নিচেই।

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter